ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

উচ্চারণের বিপরীতে

রাজনীতিতে ছদ্মবেশ ও কৌশল

রাজনীতিতে ছদ্মবেশ ও কৌশল
×

মাহবুব আজীজ

মাহবুব আজীজ

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:০২ | আপডেট: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১১:৩৭

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে দেশ যখন নির্বাচনমুখী বলে মনে হচ্ছে, ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচন সম্পন্ন করবার ব্যাপারে সরকার ঘোষিতভাবে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ; ঠিক সেই সময় পাঁচ দফা দাবিতে জামায়াতসহ আরও কয়েকটি দলের জোটবদ্ধ আন্দোলন রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের বার্তা দিচ্ছে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে শুরু থেকেই জামায়াত অংশ নিয়ে আসছে। সংবিধান, নির্বাচন ও সংস্কার প্রশ্নে আলোচনা এখনও চলমান; এর মধ্যেই আচমকা আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করে দলটি। জামায়াতের দাবির মধ্যে রয়েছে জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে আগামী নির্বাচন, সংসদের নিম্ন ও উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতি, জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ। জামায়াতের পাশাপাশি একই দাবিতে কর্মসূচি পালন করছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি। 

সম্প্রতি ডাকসু ও জাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের প্রার্থীদের বিপুল বিজয় মূল সংগঠন জামায়াতে ইসলামীর আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছে; অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকার শুরু থেকেই জামায়াতকে যথেষ্ট জায়গা দিচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টা যখনই রাজনৈতিক বৈঠক করেন, অলিখিত নিয়মই হয়ে উঠেছে– বিএনপি ও এনসিপির পাশাপাশি জামায়াতও উপস্থিত থাকে। জাতিসংঘ সম্মেলন উপলক্ষে সফরেও এই তিন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ রয়েছেন। খোদ বিএনপির নেতারা অভিযোগ করছেন, বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রশাসনের নানা উচ্চ পদে জামায়াতপন্থি নিয়োগ দিয়েছে বর্তমান সরকার। সব মিলিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে জামায়াত সবচেয়ে স্বস্তিকর ও সুবিধাজনক সময় পার করছে। 

রাজপথে আন্দোলনের পাশাপাশি নির্বাচনের জোর প্রস্তুতিও নিচ্ছে জামায়াত। ৩০০ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী ঠিক করার খবরও প্রকাশ পেয়েছে। এমন ধারণাও রয়েছে, আসলে জামায়াত আন্দোলনের নামে অন্য দলগুলোকে ব্যস্ত রেখে কৌশলে নিজেদের ভোটের প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে।  

২.
সন্দেহ নেই, জামায়াতে ইসলামী কৌশলী রাজনৈতিক দল; তৃলমূল পর্যায়ে নিবিড় রাজনৈতিক কর্মসূচি বছরের পর বছর চালিয়ে যাচ্ছে নিরবচ্ছিন্নভাবে। ঐতিহাসিকভাবে দলটির রাজনৈতিক অবস্থান অবশ্য বরাবরই বিতর্কিত।

যুদ্ধাপরাধী রাজনৈতিক দল হিসেবে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামী পরবর্তী বিভিন্ন সময় বড় দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সঙ্গে নানা সময়ে কৌশলগত অভিন্ন অবস্থান গ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান সংহত করে। আশির দশকে এরশাদের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে তিন জোটের একটিতে অবস্থান নেয় জামায়াত এবং গণআন্দোলনে ভূমিকা রাখে। ’৯৬ সালে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটভুক্ত আন্দোলন করে। ২০০১ সালের নির্বাচনে চারদলীয় জোটের শরিক হিসেবে বিএনপি সরকারের অংশ হয় তারা। আওয়ামী লীগ শাসনামলে মানবতাবিরোধী ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে জামায়াতের কয়েক নেতার বিচার হয়। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা সরকারের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে তাদের নিয়ে আসে।

৩.
মুক্তিযুদ্ধের অমীমাংসিত প্রেক্ষাপট চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-উত্তর রাজনীতিতে আবারও নতুন প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধে নিজেদের নেতৃত্ব ও অবদানের কথা আওয়ামী লীগ সরকার ১৬ বছর প্রচার করেছে, তবে মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যয় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা আদৌ তারা করেনি। অলঙ্ঘনীয় সত্য, বাহাত্তরের সংবিধানের মূল স্তম্ভ তৈরি হয় পাকিস্তানের ধর্মভিত্তিক রাজনীতির করুণ পরিণতিতে। ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগ হলেও ভিন্ন দুই জাতি কেবল ধর্মের ভিত্তিতে এক হতে ব্যর্থ হয়; পশ্চিম পাকিস্তানিদের নিরন্তর শোষণ ও বঞ্চনা পূর্ব পাকিস্তানে বিদ্রোহের সূচনা করে। মুক্তিযুদ্ধোত্তর সংবিধানের চার মূলস্তম্ভ তাই মুক্তিযুদ্ধজাত– গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ। এর কোনোটিতেই আস্থা রাখেনি আওয়ামী লীগ। পরবর্তী সময়ে বহু কাটছাঁটের পর সংবিধান থেকে শেষ পর্যন্ত ধর্মনিরপেক্ষতা ধারণাটিই পরিত্যক্ত হতে বসেছে।

সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পথ প্রশস্ত করে দেশের সংবিধান সংশোধন করে বিএনপি। আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনাও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির নিয়মিত পরিচর্যা করেন; এক পর্যায়ে তিনি ‘কওমি জননী’ হিসেবে আবির্ভূত হন। 

তবে বহুল কথিত সেই কথাটিই হয়তো সঠিক। রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। সম্প্রতি একাধারে রাজনীতির মাঠে ও আলোচনার টেবিলে জামায়াতের সরব উপস্থিতি সেই সত্যই আরেকবার জানিয়ে দেয়। একদার রাজনীতির মাঠের সঙ্গী– আওয়ামী লীগ, ১৪ দল ও জাতীয় পার্টিকে রাজনীতি ও নির্বাচন থেকে নিষিদ্ধ করবার প্রধান উদ্যোগী তারা। 

জামায়াত ও ইসলামী দলগুলো ইসলামী শাসন ও শরিয়া আইনের পক্ষে বরাবর কথা বলে এসেছে। আজকাল অবশ্য শরিয়া আইন প্রসঙ্গে তারা কথা বলছে না। এমনকি জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবির সম্প্রতি ডাকসু ও জাকসু নির্বাচনে অন্য ধর্মের প্রার্থী যেমন মনোনয়ন দিয়েছে; তেমনি হিজাব বা বোরকা ছাড়া নারী প্রার্থীও ছিলেন। ডাকসুতে বোরকা-নেকাবহীন নারী প্রার্থী পাশে নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছেন ভিপি-জিএস প্রার্থীরা। ছাত্রশিবিরের লিখিত গঠনতন্ত্রের সঙ্গে তাদের এই অবস্থান সাংঘর্ষিক। ইসলামী শরিয়া আইন সম্পর্কে জামায়াত-শিবিরের নীরবতা বা নারী-পুরুষের এই পারস্পরিক সহাবস্থান আপাতভাবে দলটির পরিবর্তন ও প্রগতিবাদী চিন্তার প্রতিফলন মনে হতে পারে। তবে এসব তাদের সুস্পষ্ট পরিবর্তিত অবস্থান কিনা, তা পরিষ্কার নয়। রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী গোরস্তানে বিজয়ের পরদিন ডাকসু ভিপি ও নেতৃবৃন্দ মোনাজাত করেছেন; তারপরও এ প্রসঙ্গে তাদের রাজনৈতিক বক্তব্য দৃশ্যমান নয়। 

রাজনীতিতে কৌশল নিশ্চয় খারাপ কিছু নয়; বরং বুদ্ধিমত্তার অংশ। তবে তা ছদ্মাবরণে হলে জাতি ও রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। সাম্প্রদায়িক রাজনীতি মানে সাম্প্রদায়িক রাজনীতিই; যদি কোনো দল এই রাজনীতির চর্চা করে, তাকে তা ঘোষণা দিয়েই করা উচিত। জামায়াত ও তার সঙ্গী ইসলামিক দলগুলোকেও পরিষ্কার করতে হবে তাদের রাজনীতির মূল অভীষ্ট সম্পর্কে। ছদ্মকৌশল মানুষকে বিভ্রান্ত করে। এর পরিণতি দেশের জন্য সুখকর নয়। 

মাহবুব আজীজ: উপসম্পাদক, সমকাল; সাহিত্যিক
[email protected]

আরও পড়ুন

×