কর্মসংস্থান
বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকদের বেকারত্ব ঘুচানোর টেকসই উপায়
শেখ নাহিদ নিয়াজী
শেখ নাহিদ নিয়াজী
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:১৭
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো গত সপ্তাহে সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপে ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে; প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহীন ব্যক্তিদের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে কম, ১.২৫ শতাংশ। সর্বোচ্চ বেকারত্বের হার বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারীদের মধ্যে ১৩.৫৪ শতাংশ। ওদিকে বর্তমানে দেশে প্রতি তিনজন বেকারের একজন স্নাতক। অর্থাৎ দেশে প্রায় ৯ লাখ উচ্চশিক্ষিত বেকার রয়েছে, যা মাত্র আট বছর আগের সংখ্যার দ্বিগুণ। এই চিত্র সত্যিই উদ্বেগজনক! প্রশ্ন উঠেছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি তাহলে ডিগ্রিধারী উচ্চশিক্ষিত বেকার তৈরি করতে থাকবে?
যা হোক, এ বছর ফেব্রুয়ারি মাসে রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে ‘রিকমেন্ডেশনস বাই দ্য টাস্কফোর্স অন রিস্ট্র্যাটেজাইজিং দ্য ইকোনমি’ শীর্ষক এক সম্মেলনে শিক্ষিত বেকারত্ব নিয়ে সাম্প্রতিক তথ্য শেয়ার করা হয়। ‘শিক্ষা, তরুণদের বেকারত্ব ও তরুণদের উন্নয়ন’ অধিবেশনে দেখানো হয়, উচ্চশিক্ষিত বেকারদের ৬২ শতাংশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী। আবার সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে অনেকে সরকারি চাকরির জন্য স্বেচ্ছায় তিন-চার বছর বেকার থাকে। এর পেছনে শুধু বেতন নয়, ক্ষমতার কেন্দ্রে যাওয়ার লক্ষ্যও থাকে, যা উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকার বৃদ্ধির কারণ।
এই অধিবেশনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিডিজবসডটকমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিম মাসরুর ও টাস্কফোর্সের সদস্য রুমানা হক। ফাহিম মাসরুরের মতে, উচ্চশিক্ষিত বেকারের বড় অংশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী স্নাতক। এর প্রধান কারণ, সেখানকার ৬৩ শতাংশ শিক্ষার্থী সমাজবিজ্ঞান বা কলা অনুষদের, যাদের চাকরির বাজারে চাহিদা কম।
একই অনুষ্ঠানে উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম আমানুল্লাহ দাবি করেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের সবচেয়ে বড় সরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান; প্রতিবছর ১০ লাখ স্নাতক তৈরি হয়। এই বিপুল স্নাতক কী পড়ছে, কেন পড়ছে– এর জবাবদিহি নেই। পুরোপুরি এলোমেলো অবস্থা!
স্বীকার করতে হবে, এই মুহূর্তে দেশের প্রধান সমস্যা দুটি– বেকারত্বের উচ্চহার ও দুর্নীতি। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে প্রত্যাশা ছিল, এ দুটি বিষয় সবচেয়ে অগ্রাধিকার পাবে এবং সে অনুযায়ী জরুরি সংস্কার করবে। কিন্তু বেকারত্ব ও দুর্নীতি দুটোই বেড়ে চলেছে। এমনকি গত এক বছরের মধ্যে ‘উচ্চশিক্ষা কমিশন’ গঠনও হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ২০২২ সালে সতর্ক করেছিল, প্রতিবছর সাত লাখেরও বেশি স্নাতক দেশের শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। তাদের প্রতি ১০ জনের ছয়জনই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজের শিক্ষার্থী। এসব কলেজের পাঠদান দুর্বল, পাঠ্যক্রম পুরোনো, শিল্প খাতের সঙ্গে সংযোগ সামান্যই। অথচ উচ্চশিক্ষার পরিধি কেবল বাড়ছেই। মাত্র তিন বছর আগেও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ৫০টি, এখন তা ৫৬টি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১০১ থেকে বেড়ে হয়েছে ১১৬টি। কিন্তু এত স্নাতকের কর্মসংস্থান কীভাবে হবে– এ প্রশ্ন কেউ করছে না। রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকরা চুপচাপ! হতে পারে, তাদের সন্তান দেশে থাকছে না অথবা তাদের চাকরি খুঁজতে হয় না!
ইউজিসির বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালের সাত লক্ষাধিক স্নাতকের মধ্যে এককভাবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীই ৬১.৭ শতাংশ। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল ১৫.৭ শতাংশ, ৫০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২.৩ শতাংশ ও শতাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল ১০.৩ শতাংশ।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গত বছর ডিসেম্বরের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ২৮ শতাংশ স্নাতক বেকার। বাকি ১৬ শতাংশ স্ব-উদ্যোগে কিছু করছে এবং ১৩ শতাংশ স্নাতক খণ্ডকালীন কাজের পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। বেতনভুক্ত চাকরি পেয়েছে মোট স্নাতকের অর্ধেকেরও কম– ৪২ শতাংশ। অথচ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থী প্রায় ৩৮ লাখ।
পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, এই বেকারত্ব অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। গত ১০-১৫ বছরের উন্নয়ন মডেল কর্মসংস্থানবান্ধব ছিল না। আর শিক্ষা ব্যবস্থাও চাকরির বাজারের চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। অর্থনীতিবিদরাও এই উদ্বেগের সঙ্গে একমত। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘বাংলাদেশের ৪৫০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে ধারণ করার জন্য যথেষ্ট নয়। আসল বিপদ হলো, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যা তৈরি করছে এবং নিয়োগকর্তাদের যা প্রয়োজন, তার মধ্যকার অমিল।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এক বছরের মধ্যে দেশের নাজুক ও ভঙ্গুর অর্থনীতি ইতিবাচকভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে; বিশেষ করে ব্যাংক খাতে লুটপাট বন্ধ হয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে। তবে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ না বাড়ায় বেসরকারি খাতে নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে খুবই কম।
বাংলাদেশ যতদিন প্রবৃদ্ধির কৌশল ও উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা উভয়কেই নতুন করে ঢেলে সাজাতে না পারছে ততদিন বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকদের বেকারত্ব সমস্যার টেকসই সমাধান হবে না। বরং এটি দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বা সমৃদ্ধির পথে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করবে।
লাখ লাখ শিক্ষিত জনগোষ্ঠী যাতে রাষ্ট্রের ওপর বোঝা হয়ে না দাঁড়ায় তার জন্য সরকারকে এখনই উচ্চশিক্ষা কমিশন ও মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় গঠন করতে হবে; দেশের ভেতরে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য সুষ্ঠু ও নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে হবে; এবং আমলাতন্ত্রের মৌলিক গুণগত সংস্কার অবশ্যই করতে হবে।
শেখ নাহিদ নিয়াজী; সহযোগী অধ্যাপক; ইংরেজি বিভাগ; স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ
- বিষয় :
- কর্মসংস্থান কর্মসূচি
