অন্যদৃষ্টি
অষ্টমীর কুমারী পূজা
.
তারাপদ আচার্য্য
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:০৮ | আপডেট: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১২:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
শারদীয় দুর্গোৎসবের এক বর্ণাট্য পর্ব কুমারী পূজা। তান্ত্রিক মতে, কুমারী পূজা চলে আসছে স্মরণাতীত কাল থেকে। কিন্তু এই পূজার ব্যাপক পরিচিতি সাধারণ মানুষের মধ্যে ছিল না। স্বামী বিবেকানন্দ বেলুড় মঠে কুমারী পূজার আয়োজন করার পর থেকে এই পূজা নিয়ে ভক্তদের জানার আগ্রহ বাড়তে থাকে। পূজার সাংস্কৃতিক আবহ সম্পর্কে যাদের আগ্রহ বেশি তারাও কুমারী পূজা সম্পর্কে হয়ে ওঠেন কৌতূহলী। বর্তমান বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান, নেপালসহ বিশ্বের কোনো কোনো রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠের পূজামণ্ডপে কুমারী পূজা হয়।
সনাতন ধর্মের অন্যতম গ্রন্থ বেদ, পুরাণ তন্ত্র এবং বিভিন্ন দার্শনিক শাস্ত্রগ্রন্থে যত প্রকার সাধনা, অনুভব ও অভিজ্ঞতা আছে; হিন্দু ধর্ম তার যুগ-যুগান্তরব্যাপী তত্ত্বান্বেষণের সুমহান ইতিহাসে যত দেব-দেবীর সাধনার প্রবর্তন করেছে, দুর্গাপূজায় তার পূর্ণ সমন্বয় ঘটেছে। এই সমন্বিত দুর্গাপূজার অঙ্গ পূজারূপে কুমারী পূজা আমাদের কাছে এক গভীর তত্ত্বের দ্বারোদ্ঘাটন করেছে।
শারদীয় দুর্গাপূজার অষ্টমী তিথিতে অনুষ্ঠিত হয় কুমারী পূজা। অষ্টমী তিথিতে দিনে হয় অষ্টমী পূজা, রাতে সন্ধি পূজা। অষ্টমীর শেষ নবমীর শুরু– এই সন্ধিক্ষণে অনুষ্ঠিত হয় বলে এ পূজার নাম সন্ধি পূজা। যেসব মণ্ডপে কুমারী পূজা হয়, সেখানে একই দিনে অনুষ্ঠিত হয় তিনটি পূজা। দিনের বেলা অষ্টমী বিহিত পূজা ও কুমারী পূজা, রাতে সন্ধি পূজা।
পূজার দিন সকালে পূজার জন্য নির্দিষ্ট কুমারীকে স্নান করিয়ে নতুন কাপড় পরানো হয়। ফুলের গয়না ও নানাবিধ অলংকারে তাকে সাজানো হয়। তার পা ধুয়ে পরানো হয় আলতা; কপালে এঁকে দেওয়া হয় সিঁদুরের তিলক; হাতে দেওয়া হয় মনোরম পুষ্প। কুমারীকে মণ্ডপে সুসজ্জিত আসনে বসিয়ে তার পায়ের কাছে রাখা হয় বেলপাতা, ফুল, জল, নৈবেদ্য ও পূজার নানাবিধ উপাচার। তারপর কুমারীর ধ্যান করতে হয়।
বৃহদ্ধর্মপুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী, দেবতাদের স্তবে প্রসন্ন হয়ে দেবী চণ্ডিকা কুমারী কন্যারূপে দেবতাদের সামনে দেখা দিয়েছিলেন। দেবীপূরাণেও এ বিষয়ে উল্লেখ আছে। দেবী ভগবতী কুমারীরূপেই আখ্যায়িত। তাঁর কুমারিত্ব মানবীভাব বোঝা খুবই কঠিন। কারণ তিনি দেবতাদের তেজ থেকে সৃষ্টি। শিবের ঘরনি হয়েও তিনি কুমারী।
পণ্ডিত যোগেশচন্দ্র বিদ্যানিধি বলেন, যুগাবতার শ্রীরামকৃষ্ণ কুমারীকে ভগবতীর অংশ বলেছেন। শ্রীমা সারদা দেবীকে ষোড়শীরূপে পূজা করা সেই ভাবেরই অংশ এবং এইভাবে সাধনার শেষে শ্রীরামকৃষ্ণ ষোড়শীরূপিণী জগন্মাতার শ্রীচরণে তাঁর সর্ববিধ সাধনার ফল সমর্পণ করেন।
কুমারী সম্বন্ধে এসব প্রশস্তি থেকে এটাই বোঝা যায়, কুমারী দেবী ভগবতীর অতি সাত্ত্বিক রূপ। জগন্মাতা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টিকর্ত্রী হয়েও চিরকুমারী।
শাস্ত্রীয় বিধানমতে, এক বছর বয়সী থেকে শুরু করে ১৬ বছর বয়সী কুমারীকে দেবীরূপে পূজা করা হয়। একেক বয়সের মেয়েদের একেক নামে পূজা করার বিধান রয়েছে। যেমন, এক বছরের কন্যার নাম সন্ধ্যা, দুই বছরের কন্যার নাম সরস্বতী, তিন বছরের কন্যার নাম ত্রিধামূর্তি, চার বছরের কন্যার নাম কালিকা, পাঁচ বছরের কন্যার নাম সুভাগা, ছয় বছরের কন্যার নাম উমা, সাত বছরের কন্যার নাম মালিনী, আট বছরের কন্যার নাম কুব্জিকা, ৯ বছরের কন্যার নাম কালসন্দর্ভা, ১০ বছরের কন্যার নাম অপরাজিতা, ১১ বছরের কন্যার নাম রুদ্রাণী, ১২ বছরের কন্যার নাম ভৈরবী, ১৩ বছরের কন্যার নাম মহালী, ১৪ বছরের কন্যার নাম পীঠনায়িকা, ১৫ বছরের কন্যার নাম ক্ষেত্রজ্ঞা ও ১৬ বছরের কন্যার নাম অম্বিকা।
শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন, কুমারী পূজা করে কেন? উত্তর– সব স্ত্রীলোক ভগবতীর একেকটি রূপ। শুদ্ধাত্মা কুমারীতে ভগবতীর বেশি প্রকাশ।
তারাপদ আচার্য্য: সাধারণ সম্পাদক, সাধু নাগ মহাশয় আশ্রম, দেওভোগ, নারায়ণগঞ্জ
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি
- কুমারী পূজা
- দুর্গাপূজা
