জন্মদিন
‘বুদ্ধিজীবী’ পরিচয় তাঁকে মহিমান্বিত করেছে
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক
ইফতেখারুল ইসলাম
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:২০ | আপডেট: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১২:২২
| প্রিন্ট সংস্করণ
আজ বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের ৮৬তম জন্মদিন। ১৯৪০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তিনি কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে লেখালেখি করছেন, যা বর্তমানে নিজস্ব এক চরিত্রে দাঁড়িয়ে গেছে। প্রাবন্ধিক ও গবেষক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম তাঁর এই লেখনীর বিশিষ্ট ভঙ্গির কারণে তাঁকে চিহ্নিত করেছেন একজন ‘ব্যক্তিত্বসম্পন্ন গদ্য-লেখক’ হিসেবে।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক নানাবিধ কারণে চিন্তাবিদ হিসেবে আলাদা। লেখার জন্য লিখে গেছেন কিংবা ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ বর্গে তাঁকে ফেলা যাবে না। কারণ লেখালেখিতে তাঁর রয়েছে সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য। সেটি হলো সমাজের কল্যাণ সাধন। ফলে চিন্তাচর্চার মধ্য দিয়ে জনগোষ্ঠীর সূক্ষ্ম বোধগুলো জাগিয়ে তোলা, সে লক্ষ্য মাথায় রেখে মোহাম্মদ আজম যেমন বলেছেন– তিনি আমাদের বিশেষ বিশেষ ‘বার্তা’ বা মেসেজ দিতে চান। তাঁর বইগুলোর শিরোনামে চোখ ফেললেই ব্যাপারটি স্পষ্ট হয়ে পড়ে। ‘যুগসংক্রান্তি ও নীতিজিজ্ঞাসা’, ‘সভ্যতার ভবিষ্যৎ’, ‘নৈতিক চেতনা: ধর্ম ও আদর্শ’, ‘অবক্ষয় ও উত্তরণ’ ইত্যাদি। এর বাইরেও তিনি যেসব বই লিখেছেন, সেগুলো একই উদ্দেশ্য দ্বারা তাড়িত।
এই বঙ্গে বাংলা সাহিত্যের একজন অধ্যাপক হিসেবেও তাঁর বিশেষত্ব পরিষ্কার। সাহিত্যচর্চায় তিনি কেবল ‘সাহিত্যকেন্দ্রিকতা’য় আবদ্ধ না থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রের বিশাল কর্মযজ্ঞ ভাবনায় যুক্ত করেছেন। ফলে লেখক হিসেবে তিনি যতটা আত্মসত্তা দ্বারা তাড়িত, তার চেয়ে ঢের সমাজের কল্যাণ নিয়ে। এই ধারার চিন্তাবিদ হিসেবে তিনি উদারপন্থাই বেছে নিয়েছেন। এ পন্থায় তিনি সমাজে সংস্কারের মধ্য দিয়ে উৎকর্ষ অর্জন করতে চান। সে জন্য তিনি বহু লেখায় বারবার সংস্কৃতির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁকে কেবল ‘প্রগতিশীল’, ‘লিবারেল’ কিংবা ‘সেক্যুলার’ বলে চিহ্নিত করাটা মুশকিল হবে– বিশেষত এ বিষয়গুলো আমাদের এখানে চর্চিত কাঠামোর মধ্যে তাঁকে ফেলা যাবে না। ব্যক্তিত্বে তিনি ঋজু এবং অদ্যাবধি বইয়ের জগতে বুঁদ হয়ে থাকতে পছন্দ করেন। কিন্তু তিনি এই চিন্তাচর্চা কেবল মস্তিষ্কের মধ্যে সীমিত রাখতে নারাজ। ফলে তাঁর প্রধান আগ্রহ এই সমাজ ও মানুষ। সমাজে আদর্শ ও ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটিয়ে তিনি পরিবর্তন ঘটাতে চেয়েছেন।
‘বাঙালি মুসলমান’ বর্গের নানা ব্যাখ্যা মাথায় রেখে বলা চলে, তিনি বাঙালি মুসলমানদের অন্যতম প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তিত্ব। তাঁর লেখালেখিতেও এই বর্গ অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্ব পেয়েছে। ফলে বাঙালি মুসলমানের আত্ম-অন্বেষণেও তিনি নিজেকে যুক্ত করেছেন। শিখা গোষ্ঠীর আবুল হুসেন, কাজী আবদুল ওদুদ, মোতাহের হোসেন চৌধুরী নিয়ে তাঁর কাজগুলো তারই ইঙ্গিত।
তরুণ বয়সে তিনি পূর্ববঙ্গের ষাটের আন্দোলন দেখেছেন। কিন্তু স্বাধীনতা-পরবর্তী বিদ্বৎমহলে অন্য নব্বইজনের মতো তাঁকে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদী’ বলেও চিহ্নিত করা মুশকিল। বিশেষ সময় কিংবা ভাবাদর্শ মাথায় রেখে তিনি আজীবন তাড়িত হননি। বরং সমাজ, মানুষ ও রাষ্ট্রের বিবর্তনের ইতিহাসের মধ্য থেকেই তিনি নিজেকে বিকশিত করেছেন। ফলে বিশেষ কোনো মতাদর্শ কিংবা রাজনৈতিক গোষ্ঠী তাঁকে অন্য অনেকের মতো আটকাতে পারেনি। সমাজের কল্যাণ দ্বারাই তিনি চিন্তা ও মননে তাড়িত। এ কারণে তিনি সবসময় এই সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য থেকেছেন প্রাসঙ্গিক। গণঅভ্যুত্থানের আগে যেমন তিনি বুদ্ধিজীবী হিসেবে ছিলেন সজীব ও সক্রিয়, এখনও তিনি গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর। ‘মূলধারা’র বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই যেভাবে প্রাসঙ্গিকতা হারাতে বসেছেন, সে জায়গায় তিনি আলাদা। সমাজের নতুন প্রজন্মের কাছেও অন্যদের তুলনায় তিনি বেশি প্রাসঙ্গিক। বয়স এখনও তাঁকে কাবু করতে পারেনি। বরং চিন্তা ও তৎপরতায় সক্রিয় জীবন যাপন করছেন। পারিবারিক জীবনে খুবই মর্মস্পর্শী ঘটনার শিকার হয়েছেন, কিন্তু কোনো ধরনের ঘৃণা বা বিদ্বেষের কাছে পরাভূত হননি। তিনি যে উৎকর্ষের কথা বলেছেন, তা তাঁর চিন্তা ও ব্যক্তিত্বে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের লিখিত বইয়ের সংখ্যা ৩২টি, অনূদিত ১টি; সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ২৩টি। লিখেছেন ৬-৮টি পুস্তিকা। ‘লোকায়ত’ নামে একটি সাময়িকপত্র সম্পাদনা করেন। তিনি এখনও আত্মজীবনী লিখে উঠতে পারেননি। তিনি যে সময়ে বেড়ে উঠেছেন, কিংবা যেভাবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় এবং পরিক্রমা দেখেছেন, বিশেষত তা আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এ প্রেক্ষিতে তাঁর আত্মজীবনী এই সমাজ ও রাষ্ট্রের গতিমুখ বুঝতে কাজে লাগবে। আশা করি, তিনি সেই সময় পাবেন।
ইফতেখারুল ইসলাম, সহসম্পাদক, সমকাল
- বিষয় :
- জন্মদিন
- বুদ্ধিজীবী
- প্রাবন্ধিক
