বাজার ব্যবস্থাপনা
টিসিবির লাইনে আটকে মধ্যবিত্তের সংস্কার
রুস্তম আলী খোকন
রুস্তম আলী খোকন
প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:১৩ | আপডেট: ০৫ অক্টোবর ২০২৫ | ১১:৪৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
নাজিম হোসেন মুখ লুকিয়ে খোলা ট্রাকের লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মাঝে মাঝেই এদিক-সেদিক তাকাচ্ছিলেন, পাছে পরিচিত কেউ দেখে ফেলে। তাহলে সমাজে তাঁর সম্মানহানি ঘটতে পারে– সম্ভবত এমন আশঙ্কা মনে। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন মধ্যবিত্ত নাজিম হোসেন। ৪৫০ টাকায় দুই কেজি মসুর ডাল, দুই লিটার তেল, এক কেজি চিনির জন্য দীর্ঘ অপেক্ষাতেও আপত্তি নেই তাঁর, যদিও ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ-টিসিবির এ আয়োজন মূলত দরিদ্র মানুষের জন্য। বাজারে এসব সামগ্রী কিনতে খরচ হয় ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা।
ঢাকার মোহাম্মদপুরের রিং রোডের জাপান গার্ডেন সিটির সামনের এ চিত্র উঠে এসেছে সংবাদমাধ্যমে। এ চিত্র সেপ্টেম্বরের ৪ তারিখের। মুখ লুকিয়ে নাজিম হোসেন আদৌ খোলা ট্রাকের সেই পণ্য কিনতে পেরেছিলেন কিনা, আমরা তা জানতে পারিনি। কারণ দীর্ঘ লাইনে থাকা অসহায় জনগণের অর্ধেকেরও বেশি সংখ্যক খালি হাতে ফিরে গেছে, খবরেই তা বলা হয়েছে। বরাদ্দের চেয়ে চাহিদা কয়েক গুণ।
আরেকটি সংবাদমাধ্যম ১৯ সেপ্টেম্বর আমাদের জানিয়েছে তেজগাঁও এলাকার রিকশাচালক সাইদুলের কাহিনি। সাইদুল তিন দিন ধরে তেজগাঁও মগবাজার এলাকায় খালি ব্যাগ হাতে ঘুরছেন। খুঁজছেন ওএমএস তথা খোলাবাজারে নিত্যপণ্য বিক্রির ট্রাক। নিরক্ষর সাইদুল জানেন না বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ওএমএসের ট্রাক সেল বন্ধ করে দিয়েছে ১৩ সেপ্টেম্বর। বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন– প্রায় অর্ধেক দামে পণ্য বিক্রি সম্ভব না। এ খাতে ভর্তুকি দেওয়ার মতো বাজেট তাঁর মন্ত্রণালয়ের নেই।
এ চিত্র যখন ঢাকা শহরে ঠিক তখন ঢাকার বাইরের চিত্র আরও করুণ। ঢাকার বাইরে এখনও চালু রয়েছে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য চাল-আটা বিক্রির কার্যক্রম। ২৬০ টাকায় চাল-আটা বিক্রি হয় ট্রাক সেলে, যা কিনতে বাজারে ৫০০ টাকার মতো খরচ করতে হয়। আর তাতেই ভিড় বাড়ছে প্রতিদিন। অবস্থা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, অকালে দুই ছেলে হারানো রাজশাহীর চৌদ্দপাই এলাকার বৃদ্ধা সোনাবান বেগম লাঠি হাতে ভর করে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন রাত ২টার সময়। সারারাত জেগে ছিলেন; সঙ্গে ছিল দরিদ্র বহু বৃদ্ধ নারী-পুরুষ। তাদের অনেককেই খালি হাতে ফিরতে হয়েছে।
এই চিত্র সেপ্টেম্বরের ২৮ তারিখের। সারারাত জেগে ৩০ টাকায় পাঁচ কেজি চাল আর ২৪ টাকায় দুই কেজি আটা কিনে ক্ষুধা নিবারণের প্রচেষ্টা বেশির ভাগ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ব্যর্থ হচ্ছে। একটি খোলা ট্রাকে বরাদ্দ থাকে ২০০ জনের। লোক থাকে তার চেয়ে কয়েক গুণ। চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ কম। এমনটাই জানিয়েছেন রাজশাহীর উপ-খাদ্য পরিদর্শক মো. রিপন আলী।
পরিস্থিতি যখন এমন, দেশের আরেক প্রান্ত চট্টগ্রামে ঘটছে অন্য কাণ্ড। গরিবের ওপর আঘাত হয় চতুর্মুখী। সেখানে ওএমএস ডিলাররা বরাদ্দ করা চাল বিক্রি করে দিচ্ছেন পাইকারি দোকানে। প্রতিদিন ১০০ জনের বরাদ্দ করা চাল ৫০-৬০ জনকে দিয়ে ডিলার বাকিটা এভাবে বিক্রি করে দেন। কখনও নিম্নমানের চাল দেওয়া হয়। ভালো মানের সঙ্গে মেশানো হয় খারাপ চাল। দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে যে ভালো কিছু পেটে যাবে, তারও নিশ্চয়তা নেই।
চট্টগ্রামে আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক এসএম কায়সার আলী সরেজমিন ট্রাক সেল দেখতে গিয়ে নিজেই মন্তব্য করেছেন, যা বিক্রি করা হচ্ছে তা গরু-ছাগলের খাবারও না। ডিলাররা বলছেন, তাদের প্রতিদিন খাদ্য পরিদর্শকদের ঘুষ দিতে হয়; খাওয়াতে হয় চা-নাশতা। সুতরাং বিপথে যাওয়া ছাড়া তাদের বিকল্প নেই।
বিগত তিন বছরে গড় মুদ্রাস্ফীতি ১০ শতাংশের ওপরে। একজন মানুষের আয়ের ৫৫ শতাংশ চলে যায় খাদ্যদ্রব্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে। ঋণ করে পরিশোধ করতে না পেরে ঘটছে আত্মহত্যার মতো ঘটনা। সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন বলছে, গত তিন মাসে সবজি থেকে চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বেড়েছে প্রকারভেদে ১৬ থেকে ৭৫ শতাংশ। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার-পিপিআরসি বলছে, দেশে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১০ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ২৮ শতাংশে পৌঁছেছে। সংস্থাটি আরও বলছে, অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৫.৬ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৯.৩৫ শতাংশে।
করোনা-পরবর্তী তিন বছরে দরিদ্র মানুষের দুর্দশার মাত্রা কোনোভাবেই কমছে না, বরং বাড়ছে। এরই মধ্যে ঘটে গেছে একটি গণঅভ্যুত্থান। পরিবর্তন হয়েছে সরকার। আসেনি কোনো পরিবর্তন। ক্ষমতাপ্রত্যাশী রাজনৈতিক দলগুলোর নেই গরিব মানুষের জীবন ও সমস্যা নিয়ে কোনো বক্তব্য। জণগণ তাদের বিশ্বাসও করে না। তারা জানে– যে যায় লঙ্কায় সে-ই হয় রাবণ। হতাশা আরও বেড়েছে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের তরুণ-তরুণীদের নানাবিধ বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে। গণঅভ্যুত্থানের মুখ বলে পরিচিত তরুণরা নিজেদের জড়িয়ে ফেলেছে ক্ষমতার চক্রে। হারিয়েছে জনগণের আস্থা। তাদের বিতর্কিত নানা কর্মকাণ্ড নিয়ে সামাজিক মাধ্যম সর্বদাই থাকে সরব। সংস্কার নামক এক শব্দ বিগত সময়ের স্বেচ্ছাচারী শাসনের উন্নয়ন শব্দের মতো কান ঝালাপালা করছে প্রতিনিয়ত। অর্থনীতিবিদরা বারবার সামষ্টিক অর্থনীতির পাশাপাশি ব্যষ্টিক অর্থনীতির ওপরেও সরকারকে মনোযোগ দেওয়ার তাগাদা দিচ্ছেন, যেখানে কর্মসংস্থান, জীবনযাত্রার মানের উন্নয়ন ইত্যাদি গুরুত্ব পাবে। কিন্তু সরকার ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করছে– সংসদ, সংবিধান ইত্যাদি সংস্কার করলেই যেন সব সমস্যা দূর হবে।
আসল প্রয়োজন হলো আর্থসামাজিক কাঠামোতে পরিবর্তন। কিন্তু বাংলাদেশে এমন কোনো রাজনৈতিক শক্তি নেই, যারা এ কাজ করতে পারে। নেই শ্রমিক-কৃষক-কেরানি-কর্মচারী ছোট চাকরিরত মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দল বা শক্তি। সেই শূন্যতায় অনবরত ঘুরপাক খাচ্ছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে ঘুরপাক খাচ্ছে মুখ লুকিয়ে নাজিম হোসেন, লাঠি হাতে ভর করে সোনাবান বেগম, খালি ব্যাগ হাতে সাইদুল।
রুস্তম আলী খোকন: লেখক ও সংগঠক
- বিষয় :
- মধ্যবিত্ত
- টিসিবির পণ্য
- মূল্যস্ফীতি
