তৃতীয় মেরু
ফ্লোটিলা তুই তেল আবিবে ফুল হয়ে ফোট
শেখ রোকন
শেখ রোকন
প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:১৭ | আপডেট: ০৫ অক্টোবর ২০২৫ | ১১:৩৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
কবি ইমতিয়াজ মাহমুদের ফুল নয়; ইংরেজ সাহিত্যিক রুডিয়ার্ড কিপলিংয়ের ফ্লোটিলার কথা আগে বলি। ইংরেজি ‘ফ্লিট’ বা বাংলা নৌবহরের স্প্যানিশ প্রতিশব্দ ‘ফ্লোটিলা’। রুডিয়ার্ড কিপলিং ভারত, বার্মা, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র হয়ে লন্ডন ফিরে ১৮৯০ সালে রেঙ্গুন-মান্দালয় নৌযাত্রার অভিজ্ঞতা নিয়ে বিখ্যাত ‘মান্দালয়’ কবিতায় ইরাবতী নদীতে ব্রিটিশ ফ্লোটিলা অলস পড়ে থাকার কথা লিখেছিলেন। সাড়ে ছয়শ নৌযানের ওই ফ্লোটিলা যদিও একদা বার্মা জয় করেছিল; কিপলিং তাঁর কবিতায় বলেছিলেন, প্রাচ্য-সৌন্দর্য ও সারল্যের কাছে নৌবহরটি কার্যত পরাজিত হয়েছে।
আপাত বিজয়ী সামরিক ফ্লোটিলা যেমন সৌন্দর্যের কাছে পরাজিত হতে পারে; তেমনই দৃশ্যত অবরুদ্ধ বেসামরিক ফ্লোটিলাও যে কার্যত মুক্তির বার্তা বয়ে আনতে পারে– সেটা প্রায় দেড় শতাব্দী পরে প্রমাণ হচ্ছে ভূমধ্যসাগরে; ফিলিস্তিনের গাজাগামী ‘ফ্রিডম ফ্লোটিলা’। বৈশ্বিক মিডিয়া যদিও যতটা সম্ভব গাজা পরিস্থিতি থেকে চোখ ফিরিয়ে রাখতে চায়; ফ্লোটিলার কল্যাণে গত এক সপ্তাহ ধরে নজর না দিয়ে পারছে না।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজনীতিক, অধিকারকর্মী, চিকিৎসক, ত্রাণকর্মী ও সংবাদকর্মী নিয়ে ২০১০ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে আরও পাঁচবার ‘ফ্রিডম ফ্লোটিলা’ ইউরোপ থেকে গাজার পথে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিলেও প্রথম ফ্রিডম ফ্লোটিলায় ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় ৯ জন নিহত হলেও এবারের ষষ্ঠবারের মতো সাড়া আগে কখনও পড়েনি। গোটা বিশ্ব থেকে কেবল সংবাদমাধ্যমে নয়; জাহাজ ট্র্যাকার অ্যাপসেও নজর রাখছে কোটি কোটি মানুষ।
অন্যান্যবারের মতো একটি নয়; এবারের নৌযাত্রায় যোগ দিয়েছে কয়েকটি জোট। এর মধ্যে রয়েছে গ্লোবাল মুভমেন্ট টু গাজা, মাগরেব সুমুদ ফ্লোটিলা, সুমুদ নুসান্তারা এবং ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশন। সব মিলিয়ে কমবেশি অর্ধশত জাহাজে পাঁচ শতাধিক যাত্রী গাজা অভিমুখে রওনা দিয়েছিল। কোনো কোনো জাহাজ যেমন ত্রাণ বা চিকিৎসা সামগ্রী নিয়ে রওনা হয়েছে, তেমনই কোনো কোনো জাহাজ গাজার সমুদ্ররেখা ঘিরে ইসরায়েলি অবরোধ ভাঙার প্রত্যয় নিয়ে এগিয়েছে। কিন্তু বৃহস্পতিবার রাত থেকেই সেগুলোতে হামলা ও নাশকতা চালাতে থাকে ইসরায়েলি বাহিনী। এসব জাহাজ থেকে সাড়ে চারশর বেশি যাত্রীকে আটক করে নিয়ে যায়; তাদের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বিশ্বব্যাপী পরিচিত সুইডিশ অধিকারকর্মী গ্রেটা থুনবার্গও রয়েছেন।
বাংলাদেশ থেকে খ্যাতিমান আলোকচিত্রী ও অধিকারকর্মী ড. শহিদুল আলম গাজাগামী এবারের নৌবহরে যোগ দেওয়ায় বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমেও স্বভাবত যোগ হয়েছে বাড়তি মাত্রা। ইতালির অতরান্তো থেকে ‘কনশানস’ নামে একটি জাহাজে সহযাত্রীদের সঙ্গে তিনি ৩০ সেপ্টেম্বর রওনা দেন গাজা অভিমুখে। তার পর থেকে প্রতিদিন প্রায় ঘণ্টায় ঘণ্টায় যাত্রাপথের আপডেট পাওয়া যাচ্ছে তাঁর ফেসবুক পোস্ট থেকে।
শহিদুল আলম যে নৌযানে অবস্থান করছেন, সেই কনশানস বহরের সবচেয়ে বড় নৌযান বলে তাঁর ফেসবুক পোস্টসূত্রে জানা যাচ্ছে। এটি সবার শেষে ইতালি থেকে যাত্রা করলেও গতি বেশি হওয়ায় বাকিদের ছুঁয়ে ফেলতে সময় নেয়নি। শুক্রবার ফেলেছে। এখন কনশানসের গতি কমানো হয়েছে এবং সব নৌযান একযোগে এগিয়ে যাচ্ছে।
শনিবার দুপুরে শহিদুল আলম ফেসবুকে লিখেছেন, আমরা কনশানসের মানুষেরা অবরোধ ভাঙতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তারা যদি আমাদের আটকায়, অন্যরা এগিয়ে আসবে। দমনপীড়নকারী কখনোই জনগণের শক্তির বিরুদ্ধে টিকতে পারেনি। ইসরায়েলও ব্যর্থ হবে। তিনি আরও লিখেছেন, জাতিগত নিধন ঠেকাতে বিশ্বনেতাদের পুরোপুরি নিষ্ক্রিয়তা এবং কপট ভূমিকার কারণে বিশ্ববাসী নিজেরাই পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
প্রসঙ্গত, ফ্রিডম ফ্লোটিলায় শহিদুল আলমের যোগ দেওয়ার বিষয়টি বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশির প্রশংসা কুড়িয়ে চলেছে। ৭০ বছর বয়সে বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের মুসলিম রাষ্ট্র থেকে ইসরায়েলের মতো দানবীয় শক্তির বিরুদ্ধে এভাবে ঝুঁকি নেওয়ায় তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে প্রার্থনাও দেখা যাচ্ছে। মাঝখানে তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। বিপরীতে কেউ কেউ তাঁর সমালোচনাও করছেন। যদিও সেটা তুলনামূলক সামান্য। গত বৃহস্পতিবার তিনি নিজেই ফেসবুক অডিয়েন্স অ্যানালাইসিস প্রকাশ করে দেখিয়েছেন, গত কয়েক দিনে তাঁর ফলোয়ার বেড়েছে ২ লাখ ৯০ হাজারের বেশি; আর ফলোয়ার কমেছে সাড়ে ৮ হাজারেরও কম। কিন্তু শহিদুল আলমকে যারা কাছ থেকে দেখেছেন, তাঁর সততা ও সাহসিকতা সম্পর্কে তারা ভালোভাবে জানেন।

বস্তুত ফ্রিডম ফ্লোটিলা নিয়ে বাংলাদেশের বাইরেও বিক্ষপ্ত সমালোচনা রয়েছে; বিশেষত ইসরায়েল ও তার প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য মিত্রদের দিক থেকে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী সমর্থনের জোয়ারে সব যেন ভেসে যাচ্ছে। রয়টার্স লিখেছে, ‘গত ১০ দিনে এটা ইসরায়েলি অবরোধের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চতম প্রতিপক্ষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। সামাজিক মাধ্যমে চৌকস প্রচারণা, হালনাগাদ নৌযান শনাক্তকরণ প্রযুক্তি, লাগসই ওয়েব নকশা এবং তৃণমূল সাংগঠনিক তৎপরতা এবারের অভিযানকে ব্যাপক মনোযোগ ও সমর্থন এনে দিয়েছে; গাজা অবরোধ তুলে নিতে বৈশ্বিক আন্দোলন জোরদার করেছে’ (৪ অক্টোবর ২০২৫)।
ফ্রিডম ফ্লোটিলায় ইসরায়েলি হামলার প্রতিবাদে শুক্রবার ইতালিজুড়ে সাধারণ ধর্মঘট ছাড়াও প্যারিস, লন্ডন, বার্লিন, জেনেভা, ডাবলিন, ইস্তাম্বুল, বার্সেলোনায় মানুষ বিক্ষোভ প্রদর্শনে রাজপথে নেমে এসেছে। ইউরোপের বাইরে আর্জেন্টিনা, মেক্সিকোতে বিক্ষোভ হয়েছে। কলম্বিয়ায় বিক্ষোভ ছাড়াও দেশটি ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার করেছে। রয়টার্স বলছে, এর আগে কখনও ইউরোপ-আমেরিকায় ইসরায়েলবিরোধী এমন বিক্ষোভ দেখা যায়নি। ফ্রিডম ফ্লোটিলার এবারের ধরনই এ পার্থক্য গড়ে দিয়েছে।
আশঙ্কা অমূলক নয়, এবারের ফ্রিডম ফ্লোটিলাও আগের পাঁচটির মতো শেষ পর্যন্ত গাজা উপকূলে পৌঁছতে পারবে না। প্রশ্ন হচ্ছে, এর মধ্য দিয়ে গাজাবাসীর কী অর্জন হলো? প্রথমত, ইউরোপের সাধারণ মানুষের মধ্যে যে বিক্ষোভ দেখা দিয়েছে, সেটা ইতালি বা গ্রিসের মতো দেশগুলোর সরকারকেও বাধ্য করছে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অবস্থান নিতে। খোদ যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মতো দেশগুলোকেও বাধ্য করেছে ফিলিস্তিনী রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিতে। দ্বিতীয়ত, এবার তুরস্ক, দক্ষিণ আফ্রিকা বা মালয়েশিয়ার মতো রাষ্ট্রগুলোর প্রতিক্রিয়া ছিল খুবই কড়া। তার মানে, ইসরায়েল পুরোনো মিত্রদের সমর্থন তো হারাচ্ছেই, ফিলিস্তিন নতুন নতুন সমর্থকও পাচ্ছে। আরব দেশগুলোর কুসুম কুসুম বিরোধিতার পুরোনো মানচিত্রের পরিবর্তনও হচ্ছে।
এমনকি ইউরোপ-আমেরিকার ইহুদি জনগোষ্ঠীও ইসরায়েলকে আগের মতো সমর্থন করতে পারছে না। গত দুই বছরে গাজা গণহত্যায় প্রায় ৭০ হাজার মানুষের প্রাণহানি এবং প্রায় দুই লাখ মানুষের অঙ্গহানি শুভবুদ্ধিসম্পন্ন যে কোনো মানুষের বিবেক নাড়িয়ে দেবে না? ইসরায়েলের জনসাধারণের মধ্যেও সবাই নিশ্চয় বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তাঁর ডানপন্থি সমর্থকদের মতো রক্তখেকো ভাম্পায়ার হয়ে ওঠেনি। ইমতিয়াজ মাহমুদ লিখেছেন, ‘যে কাঁদে কাঁদুক তবু লিখি ফুটনোট, ফুল তুই তেল আবিবে বোমা হয়ে ফোট’। এবারের ফ্রিডম ফ্লোটিলার সামরিক শক্তি নেই যে তেল আবিবে বোমা হয়ে ফুটবে। এর যে মানবিক শক্তি, সেটা বরং তেল আবিবে গিয়ে ফুল হয়েও ফুটতে পারে।
শেখ রোকন: লেখক ও নদী-গবেষক
[email protected]
