সমকালীন প্রসঙ্গ
সন্তান বিক্রি বনাম জপিত উন্নয়ন
ভাঙা ঘরের দুয়ারে লালন-মারুফা দম্পতির সন্তানদের কয়েকজন- সমকাল
ইফতেখারুল ইসলাম
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৫ | ১৯:৩১ | আপডেট: ০৭ অক্টোবর ২০২৫ | ১৯:৩১
পুঁজিবাদী বিশ্বে এখন সবই পণ্য। মেধা থেকে শুরু করে সবকিছু। কিন্তু যখন দারিদ্র্যের কারণে মাতাপিতা সন্তান বিক্রি করে দিচ্ছেন, তখন খবরটা বড্ড ধাক্কা মারে। সোমবার সমকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দারিদ্র্যের কবলে পড়ে দুই সন্তান বিক্রি করে দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বাংলাদেশে ঘটনাটি এবারেই প্রথম ঘটেছে এমন নয়, মাঝেমধ্যে খবরের পাতা উল্টালেই এরকম মর্মান্তিক ঘটনা চোখে পড়ে।
প্রতিবেদন মতে, লালনপালনে অক্ষমতার কারণে মোহাম্মদ-মারুফা দম্পতি ২০২৪ সালে এক সন্তান এবং ২০২৫ সালে সেপ্টেম্বরে আরেক সন্তান স্থানীয় এক দাইয়ের হাতে তুলে দেন। ওই দায়ের হাত ধরে সন্তানদের বিক্রি করা হয়। যে দেশের রাজনীতিবিদরা উন্নয়নের কথা বলতে বলতে জনগণের কানে তুলা দেওয়ার অবস্থা, সে দেশে এমন দশা হওয়ারই কথা। দারিদ্র্যে আসল চিত্র চাপা দেওয়ার জন্য উন্নয়নের আওয়াজে আকাশ-বাতাস ভারি করে তোলা দরকার, অন্যথায় রাজনীতি জমবে কি করে!
বিবিএসের জরিপ মতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় দুই হাজার ৮২০ মার্কিন ডলার। সব আমলে বিশেষত ক্ষমতাসীন দলগুলো মাথাপিছু আয়ের উল্লেখ করে বড় বড় বক্তৃতা দেন। বক্তৃতাগুলোতে তাদের গণতন্ত্রের বাক্যবাণে জনগণের শ্রবণশক্তি প্রায় নাই হয়ে যায়। পাতি নেতা থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাসহ সবাই দেশজুড়ে কেবল গণতন্ত্রের সবক দিয়েই যান। অথচ একবিংশ শতকে যখন মানুষ পৃথিবীর বাইরে গিয়ে ভিন্ন জগত আবিষ্কারের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তখন দু-মুঠো খাবারের অভাবে সন্তান বিক্রির ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক ও মানবতাবিরোধী।
গত এক বছরের বেশি সময় ধরে আমরা গাজায় শিশুহত্যা দেখছি, যেখানে ইসরায়েলি সরকার খাদ্যসরবরাহ বন্ধ করে বেসামরিক মানুষকে হত্যা করছে। এখনও পর্যন্তবিশ্বনেতৃত্ব এমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি, যাতে নেতানিয়াহু প্রশাসন হত্যাযজ্ঞ থেকে দূরে সরে আসে। কিন্তু যখন কোনো রাষ্ট্রে স্বাভাবিক সময়ে অসুস্থতা কিংবা কর্মসংস্থানের অভাবে একজন ব্যক্তি তাঁর সন্তানকে খেতে দিতে না পারে, তাহলে এ দায় কার?
রাজনীতির ধারণা এসেছে সংঘবদ্ধ তৎপরতা থেকে, আবার সেখান থেকেই জন্ম নেয় রাষ্ট্রের ধারণা। উন্নত বিশ্বে যখন একজন নাগরিক সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে, তখন রাষ্ট্র কল্যাণমূলক কর্মসূচির আওতায় তাদের নিরাপত্তা দেয়। খাওয়া-পরা, বাসস্থান ইত্যাদি। এর মানে হলো, রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সামাজিক চুক্তি কার্যকর। কিন্তু যে দেশে আমরা দুই হাজার ৮২০ মার্কিন ডলার মাথাপিছু আয় বলে দাবি করছি, সেখানে যখন দারিদ্র্যের অভাবে সন্তান বিক্রি করতে হয়, তাহলে সামাজিক চুক্তির অর্থ কি দাঁড়ায়? আর নাগরিকদের প্রতিনিধি হিসেবে রাজনীতিবিদের ভূমিকাইবা কী?
উন্নত বিশ্বে দারিদ্র্য এখন চ্যালেঞ্জ নয়; তারা খাদ্যের মতো মৌলিক প্রয়োজনীয়তার অভাব দূর করেছে বহু আছে। রাষ্ট্রে নাগরিক অধিকারগুলো সেখানে বেশ তাৎপর্যপূর্ণভাবে গুরুত্ব পেয়েছে; সেফটি নেট বা নিরাপত্তা বলয় এতই শক্তিশালী যে, তারা জীবন সায়াহ্নেও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন কল্যাণমূলক কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন। এসব দেশে জনগণকেরাজনীতিবিদদের গণতন্ত্র আর উন্নয়নের সবক শুনতে শুনতে কান বন্ধ হওয়ার পরিস্থিতি হয় না। বরং রাজনীতিবিদদের কাছে তারা জানতে চান, আমাদের জন্য তোমার কর্মসূচিগুলো কি কি?
আমাদের দুর্ভাগ্য যে, আমরা এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যে পড়েছি, যেখানে রাজনীতিবিদদের দুর্বৃত্তায়ন, কপটতা, মিথ্যাচারিতা সম্পর্কে জানার পরও কিছু করার থাকে না। এর মানে সামাজিকভাবে এখানে রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী গড়ে উঠেনি, ফলে রাজনীতি এখনও গুটিকয়েক ধাপ্পাবাজদের হাতে নিয়ন্ত্রিত, যারা উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের সবক দিয়ে দেশটাই বিক্রি করে দেন। এরকম রাজনৈতিক চর্চায় সাধারণ মানুষের কল্যাণ উপেক্ষিত হবেই, কারণ একমাত্র জনগণকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি গ্রহণ করা হয় না।
হাল আমলে আমরা দেখতে পাচ্ছি, দক্ষিণ এশিয়াসহ পৃথিবীর নানা প্রান্তে তরুণরা সরকারবিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলেছে। শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপালে সরকার পাল্টে গেছে। পশ্চিমের কোনো কোনো দেশেও তরুণদের বিক্ষোভের খবর সংবাদমাধ্যমের বরাতে আমরা জানতে পেরেছি। এগুলোর তাৎপর্য হলো, দীর্ঘদিন ধরে গণবিরোধী যে তৎপরতা ও রাজনীতি চলছে, তা তরুণরা রুখে দিতে চায়। এই বার্তা নীতিনির্ধারকরা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় না নিলে নিকট ভবিষ্যতে বিশ্বব্যাপী অস্থিতিশীলতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আশা করি, আমাদের রাজনীতিবিদরা উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের সবক দেওয়া কমাবেন।
ইফতেখারুল ইসলাম: সহসম্পাদক, সমকাল
- বিষয় :
- দারিদ্র্য
- সন্তান বিক্রি
