অন্যদৃষ্টি
প্রবীণের যত্নে আমাদের দায়
মোহাম্মদ শাহী নেওয়াজ
প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:১৬ | আপডেট: ০৮ অক্টোবর ২০২৫ | ১২:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
মানব জীবনচক্রের শেষ ধাপ বার্ধক্য। একজন মানুষ পরিণত বয়সে তাঁর দক্ষতা, সক্ষমতা ও কর্মক্ষমতার প্রয়োগ করেন। কর্মক্ষম বয়সেই মানুষ জীবন-যৌবন উৎসর্গ করেন পরিবার, সমাজ ও দেশের জন্য। আজ যারা বার্ধক্যে উপনীত, তারা সামাজিকভাবে প্রবীণ হিসেবে গণ্য। পরবর্তী প্রজন্মের বাসযোগ্য সমাজ গড়ার লক্ষ্যে বর্তমান প্রবীণরা অতীতে তাদের জীবনী শক্তি উৎসর্গ করেছেন। তারা হলেন আমাদের দাদা-দাদি, নানা-নানি, পিতা-মাতা। আবার পেশাজীবী অনেকেই আজ প্রবীণ। যেমন– শিক্ষক, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, কৃষক, ডাক্তার, প্রকৌশলী, আইনজীবী প্রমুখ। প্রবীণরাই বর্তমান সমাজের রূপকার এবং সমাজের শ্রদ্ধেয় গুরুজন।
সময়ের আবর্তে তারা হয়ে পড়েন অসহায় ও অক্ষম। বার্ধক্যে পৌঁছানোর পর বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হন। তাদের ক্ষুধামান্দ্য, অনিদ্রা, ওজন হ্রাস, শারীরিক দুর্বলতা, ভঙ্গুর স্বাস্থ্য, বিষণ্নতা, স্মৃতিভ্রষ্টতা, পড়ে যাওয়া, প্রস্রাব ধরে রাখতে না পারা, চোখের ছানি, পানিশূন্যতাসহ বিবিধ শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। তাই প্রবীণদের পরিচর্যা ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠায় সমাজের সবাইকে ব্রতী হতে হবে।
জাতিসংঘ ঘোষণা ও প্রবীণবিষয়ক জাতীয় নীতিমালা অনুযায়ী বাংলাদেশের ৬০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সের ব্যক্তিকে প্রবীণ বলে অভিহিত করা হয়। চিকিৎসাসেবার উন্নয়ন, চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতি, প্রবীণবিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধিসহ নানান কারণে দেশে প্রবীণের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা তথ্যমতে, দেশে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা এক কোটি ৫৩ লাখ ২৬ হাজার ৭১৯ জন, যা মোট জনসংখ্যার ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ।
বার্ধক্য দেশের অন্যতম সামাজিক সমস্যা। দেশে আদর্শিক শিক্ষা, মূল্যবোধগত সংশয় ও ধর্মীয় অনুশাসনের অভাব বিরাজ করছে। এ প্রেক্ষাপটে দেশের বৃদ্ধ পিতা-মাতা কত যে অসহায় জীবন যাপন করছেন, তা উপলদ্ধি করা যায় না। প্রবীণরা আত্মসম্মানবোধের কারণে অপমান ও অসহায়ত্বের কথাগুলো অতি সচেতনভাবে গোপন রাখছেন। তথাপি ইচ্ছার বিরুদ্ধে বৃদ্ধ বাবা-মাকে আলাদা রাখা, বাড়ি পাহারা, বাজার করানো, সন্তানকে দেখাশোনা ও স্কুলে পাঠানো, ধমক দিয়ে কথা বলা, অপমানজনক আচরণ, চিকিৎসা বঞ্চনা, পেনশনের টাকা ছিনিয়ে নেওয়া, জমি-বাড়ি লিখে দিতে বাধ্য করাসহ নানান নির্যাতনের অভিযোগ প্রতিনিয়ত শোনা যায়, যা প্রবীণ সমাজের জন্য অত্যন্ত অপমানজনক।
বিশ্বে বর্তমানে প্রতি ছয়জনে একজন প্রবীণ নির্যাতনের শিকার, যা সংখ্যায় ১৪ কোটির বেশি। বর্তমান সময়ে প্রবীণ ব্যক্তির সংকট একাকিত্ব, নিঃসঙ্গতা ও বিষণ্নতা। এর সামাজিক কারণ– যৌথ পরিবারের অবসান, একক পরিবারের আধিপত্য, অধিক হারে নারীর কর্মসংস্থান, উচ্চশিক্ষা বা কর্মসংস্থানের জন্য সন্তানদের বিদেশ গমন।
বার্ধক্য নিজেই একটা নিরাময়-অযোগ্য ব্যাধি। জরাগ্রস্ততা নিজেই একটা অসুখ। তাই বর্তমান আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে প্রবীণ সেবা ও সুরক্ষা সুনিশ্চিতকরণে প্রবীণ পরিচর্যা বা কেয়ারগিভার সিস্টেম জোরদার করা প্রয়োজন।
আধুনিক প্রবীণ চিকিৎসাসেবা হিসেবে প্যালিয়াটিভ কেয়ার ব্যবস্থা ও জেরিয়াট্রিক মেডিসিন চালু করতে হবে।
কেয়ারগিভার হচ্ছে একটি বিশেষ সেবাকর্ম, যা সেবাবঞ্চিত প্রবীণ ব্যক্তিদের যত্ন বা সেবা প্রদানের লক্ষ্যে কাজ করে। বিশেষত যাদের মানসিক স্বাস্থ্য দুর্বল এবং যারা নিজেদের জীবনযাপনের মৌলিক কাজগুলো করতে সক্ষম নন, তাদের যত্ন নিশ্চিতকরণের জন্যই কেয়ারগিভার ব্যবস্থা।
প্রবীণদের মর্যাদায় সব পক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে। এটি প্রবীণ সমাজের প্রতি আমাদের নৈতিক দায়বদ্ধতা। প্রত্যেককেই তাদের সেবায় নিবেদিত করতে হবে, যা দেখে সন্তান ও নবীনরা ভবিষ্যৎ প্রবীণদের সেবায় উৎসাহিত হয়। বর্তমান প্রজন্মকে প্রবীণদের সেবার গুরুত্ব বিষয়ে দীক্ষিত করা গেলে প্রবীণবান্ধব সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব। এ বিশ্ব সাজিয়েছে যারা এবং গড়েছে যারা, বর্তমান সমাজ তাদের কাছে ঋণী।
মোহাম্মদ শাহী নেওয়াজ: অধ্যক্ষ, জাতীয় সমাজসেবা একাডেমি, ঢাকা
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি
- প্রবীণ
