সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অধ্যাদেশ
ঐতিহ্যবাহী কলেজগুলোর স্বাতন্ত্র্য বিনষ্টের চেষ্টা
.
মো. সাইমুন খান
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৫ | ১৮:৫৪ | আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০২৫ | ১৮:৫৭
ঢাকা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অধ্যাদেশ-২০২৫’ খসড়া উচ্চশিক্ষা অঙ্গনে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সরকার বলছে, এটি ঢাকার সাত কলেজের শিক্ষার মানোন্নয়ন ও প্রশাসনিক দক্ষতার জন্য। কিন্তু খসড়াটি পড়লেই বোঝা যায়, এর আড়ালে আছে ঐতিহ্যবাহী সরকারি কলেজগুলোর স্বাতন্ত্র্য বিনষ্টের চেষ্টা। ঐতিহ্যবাহী সাত কলেজ হলো– ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি বাঙলা কলেজ এবং সরকারি তিতুমীর কলেজ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত এই সাত কলেজের সমস্যা নিরসনে যে কমিটি গঠন করা হয়েছিল, তার কাজ ছিল দুটি– প্রথমত, সাত কলেজের স্বতন্ত্র সত্তা বজায় রেখে সমন্বিত কাঠামো তৈরি; দ্বিতীয়ত, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অংশীজনের মত নিয়ে প্রস্তাব চূড়ান্ত করা। কিন্তু বাস্তবে এ দুটি দায়িত্বের একটিও পালন করা হয়নি। পরামর্শ না নিয়ে, স্বচ্ছতা ছাড়া, প্রায় গোপনীয়তার সঙ্গে এ অধ্যাদেশের খসড়া তৈরি করা হয়েছে। ফলে শুরু থেকেই এটি গণতান্ত্রিকতা ও অংশগ্রহণের পরীক্ষায় অকৃতকার্য।
প্রস্তাবিত খসড়ায় সাতটি সরকারি কলেজকে একত্র করে ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’ নামে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের পরিকল্পনা আছে। এতে শতবর্ষী সরকারি কলেজগুলোর স্বতন্ত্র পরিচয় বিলীন হয়ে যাবে। ঢাকা কলেজ, ইডেন কলেজ, বদরুন্নেসা কলেজ, তিতুমীর কলেজ, বাঙলা কলেজ, কবি নজরুল কলেজ ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ– প্রতিটি কলেজের নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সামাজিক অবদান আছে। সেই ঐতিহ্য মুছে ফেলা মানে উচ্চশিক্ষার ভরসা ও বিশ্বাস নষ্ট করা। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো– লক্ষাধিক শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও নাগরিক সমাজের মত উপেক্ষা করে অধ্যাদেশটির খসড়া করা হয়েছে। কেবল একটি ক্ষুদ্র অংশের মতের ভিত্তিতে প্রণীত খসড়াটি এখন মাঠে আন্দোলনের জন্ম দিচ্ছে। শিক্ষার্থীরা ইতোমধ্যে রাস্তায় নেমে এ অধ্যাদেশ প্রত্যাখ্যান করেছে।
আশঙ্কার কারণ স্পষ্ট। সেটা হলো, এই অধ্যাদেশ কার্যকর হলে সাত কলেজের উচ্চশিক্ষা ও নারীশিক্ষার পরিসর সংকুচিত হবে। শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের ঝুঁকিও স্পষ্ট। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে নতুন কাঠামো মানে বাড়তি প্রশাসনিক খরচ, নতুন পদ সৃষ্টি ও সম্ভাব্য মাশুল বৃদ্ধি। এতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শিক্ষার্থীদের আর্থিক চাপ বাড়বে। এ ছাড়া ওই কলেজগুলো থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা বিলুপ্ত হলে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। দেশের অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী সরকারি কলেজেও বিভ্রান্তি ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা তৈরি হবে।
বিকল্প পথ হলো, সাত কলেজের ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রেখে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো কলেজিয়েট বিশ্ববিদ্যালয় মডেল গঠন করা। এতে প্রতিটি কলেজের স্বাতন্ত্র্য থাকবে, আবার নীতিগত সমন্বয়ও হবে। এর পাশাপাশি কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি– ১. সাত কলেজের নাম, লোগো ও সম্পত্তি অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। ২. বিদ্যমান পাঠ্যসূচি থেকে কোনো বিষয় বাদ দেওয়া যাবে না; বিশেষত ইসলামী শিক্ষা অপসারণ সাংবিধানিক মূল্যবোধের পরিপন্থি। ৩. প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় ক্যাম্পাস পৃথক স্থানে গঠন করা যেতে পারে। ৪. শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ও বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের প্রশাসনিক ভূমিকা বজায় রাখতে হবে। ৫. শিক্ষক, ক্যাডার কর্মকর্তা, আইনজীবী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি নিয়ে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন রিভিউ কমিটি গঠন করা জরুরি। ৬. নারীশিক্ষার পরিসর সংকুচিত করা সংবিধান ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের পরিপন্থি; ইডেন ও বদরুন্নেসা কলেজের ভূমিকা সংরক্ষণ করতে হবে। ৭. শিক্ষক সংখ্যা বৃদ্ধি, গবেষণা তহবিল, বৃত্তি ও এমফিল-পিএইচডি সুযোগ সম্প্রসারণ করতে হবে।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা কাঠামো এখন পরিবর্তনের মুখে। কিন্তু পরিবর্তন মানেই ঐতিহ্য ভাঙা নয়; পরিবর্তন মানে উন্নতির নতুন পথ খোঁজা। ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অধ্যাদেশ-২০২৫ যদি সেই উন্নতির পথে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বাস্তবসম্মত না হয়, তবে তা একদিন উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে ভুলের উদাহরণ হিসেবে টিকে থাকবে। সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা আজ যে প্রশ্ন তুলছে– ‘আমাদের কণ্ঠ কে শুনবে?’– তার উত্তর এখন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হাতে।
মো. সাইমুন খান: শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ।
