তৃতীয় মেরু
গদাধরের গন্ডার কিংবা দুধকুমারের দুঃখ
শেখ রোকন
শেখ রোকন
প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:২৬ | আপডেট: ১২ অক্টোবর ২০২৫ | ১৮:০৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
বর্ষাকাল শেষ হয়েছে দুই মাস আগে; শরৎকাল পেরিয়ে হেমন্তও আসি আসি করছে। কিন্তু প্রকৃতিতে এখনও আষাঢ়ের আমেজ। সমকাল বলছে–‘ভাদ্র পেরিয়ে আশ্বিনও শেষ হতে চলেছে, অথচ আকাশে মেঘ, কোথাও বজ্রবৃষ্টি, আবার ভ্যাপসা গরম’ (৯ অক্টোবর ২০২৫)।
এমন পরিস্থিতি বিশেষভাবে বিস্মিত করেছে উত্তরবঙ্গবাসীকে। ওই অঞ্চলে হেমন্ত ও শীত ঋতু বাকি বাংলাদেশের আগে আসে। কার্তিকের কুয়াশা আশ্বিনেই দেখা দেয়; যে কারণে আঞ্চলিক প্রবচনও তৈরি হয়েছে–‘যদি পড়ে আশ্বিন, গাও করে শিন শিন’। এবার আশ্বিনে শরীর শিরশির করা দূরে থাক, রীতিমতো ঝুমবৃষ্টি হচ্ছে। সপ্তাহখানেক আগে কুড়িগ্রাম থেকে একজন স্বজন ‘ভিডিও কল’ দিয়ে দেখাচ্ছিলেন আষাঢ়স্য প্রথম বরিষণের মতো মেঘ ডাকছে, বিজলি চমকাচ্ছে, আকাশ ভেঙে বৃষ্টি পড়ছে। ওদিকে রৌমারী-রাজীবপুর উপজেলায় আকাশভাঙা বৃষ্টিপাত কিংবা প্রবল ঢল দেখা দিলেও সেদিন কুড়িগ্রামেরই কয়েকটি উপজেলা ছিল বৃষ্টিমুক্ত। দেখে আমার সেদিনই সন্দেহ হয়েছল, এটা ‘ক্লাউড বার্স্ট’ বা মেঘ বিস্ফোরণ। এ ধরনের দুর্যোগে সাধারণত বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে স্বাভাবিক বৃষ্টির বদলে সীমিত অঞ্চলে স্বল্প সময়ে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ ধরনের দুর্যোগ ক্রমেই বাড়ছে।
মনে আছে, গত বছর জুলাইয়ের মাঝামাঝি এক শুক্রবারে ঢাকায় মাত্র ছয় ঘণ্টায় অন্তত ১৩০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছিল। সেই বৃষ্টির মধ্যেই ভিজতে ভিজতে রিকশারোহী দুই তরুণীর অঙ্গুলি উঁচানো স্লোগান জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান সিগনেচার ফটোতে পরিণত হয়েছিল। তখনই বলেছিলাম, মূলত উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় পাহাড়ি ও পাদদেশীয় অঞ্চলের ‘ক্লাউড বার্স্ট’ সমতলের ঢাকায়ও পৌঁছে গেছে!
এর আগে, ২০২৩ সালের আগস্টে চট্টগ্রাম অঞ্চলে এ ধরনের বর্ষণে বান্দরবানের পার্বত্য অঞ্চলের বন্যায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার নবনির্মিত রেলপথ ভেসে গিয়েছিল। ২০২২ সালের জুন মাসে সিলেট অঞ্চলে শতবর্ষের রেকর্ড ভেঙেছিল বৃষ্টিপাত। এবার দেখা যাচ্ছে, মেঘ বিস্ফোরণ উত্তরবঙ্গের সমতলেও পৌঁছে গেছে! লক্ষণীয়, এ ধরনের সাম্প্রতিক দুর্যোগগুলো আগে আষাঢ়-শ্রাবণে সীমিত থাকলেও এবার আশ্বিনের শেষভাগে চলে এসেছে!
যদিও মেঘ বিস্ফোরণের বিষয়টি স্পষ্ট করে বলা হয়নি। সমকালের প্রতিবেদন বলছে–‘রোববার ভোর থেকে ভারতের দিক থেকে কালজানি নদী হয়ে ভেসে আসতে থাকে হাজার হাজার গাছের গুঁড়ি। তীরে তুলে এগুলো চন্দন কাঠ হিসেবে বিক্রি করছেন অনেকে। এমনকি গুঁড়ি তুলতে গিয়ে রোববার সকালে নাগেশ্বরীর বেরুবাড়ীর খেলারভিটায় খামার নকুলা গ্রামের মনছুর আলী (৪০) ডুবে নিখোঁজ হয়েছেন’ (সমকাল, ৭ অক্টোবর ২০২৫)।
কেবল গাছের গুঁড়ি নয়, গন্ডারের মতো বিরল প্রাণীও ভেসে আসছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদন বলছে– ‘দুধকুমার নদ দিয়ে কাঠের গুঁড়ি, মৃত গরু, সাপ, মাছসহ নানা প্রাণী ভেসে আসছে। গত সোমবার সন্ধ্যায় দুধকুমার নদের স্রোতে গন্ডারটিকে মৃত অবস্থায় প্রথমবার ভাসতে দেখা যায়। পরে ভূরুঙ্গামারী উপজেলার তিলাই ইউনিয়নের দক্ষিণছাট গোপালপুর গ্রামের চরে আটকে পড়ে প্রাণীটির দেহ’ (৮ অক্টোবর ২০২৫)।
গাছ ও গন্ডার ভেসে আসাই প্রমাণ করে কুড়িগ্রামের উজানে পশ্চিমবঙ্গে কী মাত্রায় বৃষ্টিপাত হয়েছে। কলকাতা থেকে প্রকাশিত আনন্দবাজার পত্রিকার এ-সংক্রান্ত খবরে বলা হয়েছে–‘টানা বর্ষণে কয়েক দিন আগে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায়। বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বয়ে গিয়েছিল কোচবিহারের তোর্সা, কালজানি নদী’ (৮ অক্টোবর ২০২৫)।
অবশ্য গুঁড়ি বা গন্ডার ভুটান থেকেও ভেসে আসতে পারে। কোচবিহারের বনাধিকারিককে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে– ‘যে কাঠগুলো ভেসে গিয়েছে, সেগুলো কোচবিহার ফরেস্ট ডিভিশনের নয়। দেখে যা বুঝেছি, সেগুলো পাহাড়ি প্রজাতির গাছ। পাইন প্রজাতির গাছের বড় বড় লক। এই ধরনের গাছের বড় বড় লক ভুটানেই পাওয়া যায়’ (আনন্দবাজার, ৮ অক্টোবর ২০২৫)।
কেবল কালজানি নদী; তোর্সা, ঘরঘরিয়া, চোকা, গদাধর, রইডাক প্রভৃতি নদী দিয়েও আসতে পারে। কারণ যে অববাহিকায় এবারের অকাল বন্যা ও বর্ষণ ঘটেছে, সেখানে এসব পার্বত্য নদী ভুটান থেকে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশ এসে সীমান্তে মিশেছে। এগুলোর মিলিত স্রোত বাংলাদেশে দুধকুমার নামে পরিচিত। প্রসঙ্গত, মিলিত স্রোতের কতটুকু তোর্সা বা কালজানি আর কতটুকু দুধকুমার, সে নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে।
মনে আছে, অন্তর্বর্তী সরকারের একজন শীর্ষকর্তা কিছুদিন আগে আমার কাছে একটি ভিডিওচিত্র পাঠিয়ে দিয়ে জানতে চেয়েছিলেন, নদীটি কোথায়। কারণ আমার মতো তিনিও জানতেন যে, কালজানি ভারতীয় নদী। কিন্তু ভিডিওচিত্রটিতে দেখা যাচ্ছিল ধারাভাষ্যকার নদীটির সৌন্দর্য ও সংকট নিয়ে বাংলাদেশি নাগরিকের বক্তব্য প্রকাশ করেছেন। তখন একদফা খোঁজ-খবর নিয়ে তাঁকে জানিয়েছিলাম, যদিও ভৌগোলিকভাবে অভিন্ন নদী; বাংলাদেশেও একটি অংশ কালজানি নামে পরিচিত জটিল সীমান্তরেখার কল্যাণে।

শনিবার এই নিবন্ধ লিখতে গিয়ে সহযোদ্ধা এবং রিভারাইন পিপলের পরিচালক অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদের সঙ্গে কথা বলে আরও স্পষ্ট হলাম। সীমান্তের সামান্য উজানে তোর্সা ও কালজানি মিলিত হয়ে কালজানি নামেই কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী উপজেলা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। আবার ভারতে ঢোকার পর সেখানে এসে গদাধর নামে মিশেছে রইডাক-গদাধরের মিলিত স্রোত। এরপর দুধকুমার নামে বাংলাদেশে প্রবেশ করে ভুরুঙ্গামারী, কুড়িগ্রাম সদর ও নাগেশ্বরীর মধ্য দিয়ে ব্রহ্মপুত্রে মিশেছে।
আর কালজানি, গদাধরসহ দুধকুমারের সব উপনদীই কেবল ভুটানের পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়নি; পশ্চিমবঙ্গের হাসিমারা, বক্সা, রইডাক প্রভৃতি বনাঞ্চলের মধ্য দিয়েও এসেছে। গুঁড়ি, গাই, কিংবা গন্ডার সেসব বনভূমি থেকেই ভেসে এসেছে, বলা বাহুল্য। এটা ঠিক, এক সময় উত্তরবঙ্গের তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, এমনকি ব্রহ্মপুত্র দিয়েও এভাবে গাছের গুঁড়িসহ অন্যান্য বনজসম্পদ ভেসে আসতো বর্ষাকালে। এবারের অকাল বর্ষণ ও ঢলে ভেসে আসা ‘সম্পদ’ পুরোনো ব্যবস্থা ফিরে আসার সুযোগ নয়; বরং নতুন বিপদের সংকেত। শঙ্কা তৈরি করেছে, ভবিষ্যতেও উজানের পাহাড়ি ও পাদদেশীয় অঞ্চলে মেঘ বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। এর জের ধরে অকাল বন্যায় দুধকুমার অববাহিকায় কেবল ফসল ও সম্পদের ক্ষতি নয়; ঢলে নদীভাঙনও বেড়ে যেতে পারে।
বস্তুত দুধকুমার নদীতে এবারই অস্বাভাবিক ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙনে ভিটেমাটি হারানো কুড়িগ্রাম সদরের যাত্রাপুরের বাসিন্দা তাইজুল ইসলাম বলেছেন, ‘আগেও ভাঙছে। কিন্তু এমন ছিল না। এমনভাবে ভাঙছে মনে হয় সউগ ক্যালে (ছিলিয়ে) নিয়া গেইছে। এক রাইতে অন্তত দুইশ গজের বেশি জায়গা খাইছে’ (বাংলা ট্রিবিউন, ৯ অক্টোবর ২০২৫)।
এই সংকটের কারণ ও উত্তরণের উপায় সম্পর্কে বাংলা ট্রিবিউন থেকে আমার মন্তব্য জানতে চাইলে যা বলেছি, তার সারসংক্ষেপ এমন: ভাঙন তীব্রতার কারণ অবশ্যই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব; অসময়ে অত্যধিক বৃষ্টিপাত এবং মেঘ বিস্ফোরণ। আবার সারা বছর প্রবাহ না থাকায় নদীগুলোর ধারণক্ষমতা কমে গেছে। ফলে সামান্য ঢলেই ভাঙন দেখা দিচ্ছে। পরিস্থিতি উত্তরণে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় বৈশ্বিক ও দেশীয়ভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। একইসঙ্গে নদীর উজানে বাঁধ রাখা যাবে না এবং ভাটিতে নির্বিচার বালু উত্তোলন বন্ধ করতে হবে। আরেকটি জরুরি কাজ হলো বাঁশের বান্ডেলিং দিয়ে স্রোত ঘুরিয়ে দেওয়া; যাতে তীরে লেগে ভাঙন তৈরি না করে। লোকায়ত প্রজ্ঞাভিত্তিক এই প্রযুক্তি আর্থিকভাবে সাশ্রয়ী, পরিবেশসম্মত ও টেকসই।
কথা হচ্ছে, এসব বিষয়ে এখনই নজর দিতে হবে; যেমন রাষ্ট্রীয়ভাবে, তেমনই স্থানীয় অধিবাসীর দিক থেকে। যেমন দেশীয়, তেমনই আন্তঃরাষ্ট্রীয় পর্যায়ে। অন্যথায়, আগামী দিনগুলাতে দুধকুমারের দুঃখ বাড়বে বৈ কমবে না।
শেখ রোকন: লেখক ও নদী গবেষক
[email protected]
- বিষয় :
- শেখ রোকন
- নদী
- দুধকুমার নদী