ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

শিক্ষাঙ্গন

তিনটি ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ফল এবং অনেক প্রশ্ন

তিনটি ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ফল এবং অনেক প্রশ্ন
×

অনি আতিকুর রহমান

অনি আতিকুর রহমান

প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৫ | ২১:০১ | আপডেট: ১৬ অক্টোবর ২০২৫ | ২৩:৫৫

ডাকসু ও জাকসুর পর চাকসুতেও ভরাডুবি হয়েছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের। একই পরিস্থিতি বাগছাসের। ভূমিধস জয় পেয়েছে ইসলামী ছাত্রশিবির। আজ রাকসু নির্বাচন হয়ে গেল। যদিও ফল প্রকাশ এখনও হয়নি। তবে সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা চলছে– ফল অনুমিত। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন ছাত্র সংসদ নির্বাচনে হারের বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে ছাত্রদল বা বাগছাস; আর ছাত্রশিবিরই বা কেন জিতে যাচ্ছে?  

শুধু ছাত্রদল নয়, গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের সংগঠন গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের হারও বিস্ময় জাগায়। অথচ ছাত্রলীগের অনুপস্থিতি ভালো করেই কাজে লাগানোর সুযোগ ছিল এ দুই সংগঠনের। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের রাজনীতিতে এই যে নতুন মেরূকরণ এবং সেখানে তুলনামূলক উদার ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল বা বাগছাসের ব্যর্থতা এবং ধর্মীয় রক্ষণশীল ধারার ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবিরের উত্থান– এর পেছনে কারণ কী? ডাকসু, জাকসু ও চাকসু নির্বাচনের ফল কি শুধু ছাত্র রাজনীতিতেই নতুন মেরূকরণ ঘটিয়েছে?

নিউ নরমাল পরিস্থিতিতে প্রায় দেড় বছর কাজের সুযোগ পেয়েও ছাত্রদল কেন হারের বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে? নিকট অতীতের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, এর প্রধান কারণ সাংগঠনিক দুর্বলতা। এ ছাড়া নির্বাচনের আগে গণসংযোগের অভাব, নেতৃত্বের সংকট, বিভক্তি ও বর্জন কৌশল হারের পেছনে ভূমিকা রেখেছে। দীর্ঘ সময় ক্যাম্পাসগুলোতে স্বাভাবিক রাজনৈতিক কার্যক্রম থেকে দূরে থাকায় ছাত্রদলের সাংগঠনিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে। কর্মীদের মধ্যে হতাশা ও নিষ্ক্রিয়তা স্পষ্ট। নির্বাচনের আগে হঠাৎ সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করেও তারা শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। গণসংযোগের অভাবও ছিল। ছাত্রদলকে মূলত প্রথাগত রাজনৈতিক বক্তব্যেই আটকে থাকতে দেখা গেছে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের সমস্যা, শিক্ষার পরিবেশ এবং তাদের ব্যক্তিগত সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে কথা বলা সংগঠনকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। ছাত্রশিবির শিক্ষার্থীদের এই মৌলিক চাহিদাগুলোতে নজর দিয়ে ব্যাপক গণসংযোগ করেছে, যা ছাত্রদল করতে পারেনি। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও তৃণমূলের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব ছিল চোখে পড়ার মতো। 

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে যারা নেতৃত্ব দিয়েছিল, সেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীদের নিয়ে গঠিত গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ বা বাগছাসের মতো নতুন সংগঠনগুলোও প্রত্যাশিত ফল অর্জন করতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে নিজেদের মধ্যে বিভাজন, রাজনৈতিক অনভিজ্ঞতা এবং আন্দোলনের ভাবমূর্তি ধরে রাখতে না পারার মতো বিষয়গুলো প্রধান কারণ হিসেবে ধরা দিয়েছে। অভ্যুত্থানের পরপর বৈষম্যবিরোধীদের নেতৃত্ব বহু ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একক শক্তিশালী প্যানেল দাঁড় করাতে না পারায় তাদের ভোট ভাগ হয়ে যায়, যার সরাসরি সুফল পেয়েছে ছাত্রশিবির। সংগঠন হিসেবে তাদের রাজনৈতিক কৌশল ও নির্বাচনী অভিজ্ঞতা তুলনামূলকভাবে কম ছিল। আন্দোলনের সময়কার ভাবমূর্তি ধরে রাখতে না পারায় আন্দোলন পরবর্তী সময়ে তারা দ্রুত খেই হারিয়ে ফেলে। ফলে নিজেদের একটি কার্যকর ও সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করতে পারেনি।

ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের ভূমিধস জয় ছাত্র রাজনীতির নতুন দিক উন্মোচন করেছে। তাদের এই সাফল্যের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, সুসংগঠিত প্রস্তুতি, কৌশলী প্রচার, স্বতন্ত্র মোড়কে উপস্থিতি সংগঠনটিকে শিক্ষার্থীদের কাছে নিয়ে গেছে। এ ছাড়া ডাকসু ও জাকসুর জয়ের বিষয়টও পরবর্তী ক্যাম্পেইনে প্রচার করে ভোটারদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করেছে। ছাত্রশিবির শিক্ষাঙ্গনে তাদের কর্মীদের সুসংগঠিতভাবে ধরে রেখেছে। দীর্ঘ প্রস্তুতি এবং নিরবচ্ছিন্ন সাংগঠনিক শৃঙ্খলার কারণে তারা নির্বাচনের সময় দ্রুত ও কার্যকরভাবে প্রচার চালাতে সক্ষম হয়েছে। 

শিক্ষার্থীরা ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে কতটা গ্রহণ করবে, সেই বিতর্ক এড়িয়ে তারা মূলত শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি এবং ক্যাম্পাসের পরিবেশ উন্নয়নের বিষয়গুলোতে জোর দিয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয়কে কিছুটা আড়াল করে ভিন্ন ধর্ম বা সাধারণ প্রার্থীদের নিজেদের প্যানেলে সংযুক্ত করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সাহায্য করেছে। 

তিনটি ছাত্র সংসদ নির্বাচন প্রমাণ করেছে যে ছাত্র রাজনীতিতে শুধু জনপ্রিয় স্লোগান বা অতীত গৌরবের দিন শেষ। শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জন করতে হলে সুসংগঠিত কার্যক্রম, কার্যকর নেতৃত্ব, ক্যাম্পাসের সমস্যাগুলোর প্রতি মনোযোগ দেওয়া এবং সঠিক নির্বাচনী কৌশল গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ। ছাত্রদল এ জায়গাগুলোতে পিছিয়ে থাকায় তারা ব্যর্থতার বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে, আর ছাত্রশিবির তাদের কৌশল পরিবর্তন ও সাংগঠনিক শক্তি ব্যবহার করে এই শূন্যস্থান পূরণ করে ভূমিধস জয় পেয়েছে। 

ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ট্রেন যাত্রা শুরু করেছে। অন্যদিকে জাতীয় নির্বাচনের ট্রেনও প্ল্যাটফর্মে উঠে গেছে। ফলে একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবে সবার মনে উদয় হয়েছে– ছাত্র সংসদ নির্বাচন কি জাতীয় নির্বাচনে কোনো প্রভাব ফেলবে? আসন্ন নির্বাচনে ভোটারদের একটা বড় অংশ তরুণ। এই তরুণদের চিন্তা ও রুচির সঙ্গে মিল রেখে রাজনৈতিক দলগুলো যদি তাদের অগ্রাধিকার সাজাতে না পারে, তাহলে এই ভোট তারা পাবে না। ফলে ছাত্র সংসদ নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনকেও একটা স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে– ‘মাসুদ ভালো হয়ে যাও’।

অনি আতিকুর রহমান: সহসম্পাদক, সমকাল
[email protected]
 

আরও পড়ুন

×