নারীর প্রতি দাম্পত্য সহিংসতা
সংখ্যাই অনেক কথা বলিতেছে
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:২৫ | আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০২৫ | ১২:৩১
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশের ৭৬ শতাংশ নারী জীবনে অন্তত একবার স্বামীর দ্বারা সহিংসতার শিকার হইয়াছেন বলিয়া বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক জরিপে যেই তথ্য উঠিয়া আসিয়াছে উহা যদ্রূপ উদ্বেগজনক, তদ্রূপ লজ্জাজনক। প্রতি চার নারীর মধ্যে তিনজনের এহেন সহিংসতার শিকার হইবার অর্থ–নারী শুধু বাহিরেই নহে, গৃহাভ্যন্তরেও নিরাপত্তাহীন। এক কথায়, নারীর সামাজিক-পারিবারিক বিপন্নতার চিত্রই উক্ত জরিপে উঠিয়া আসিয়াছে। ইহাও স্মর্তব্য, যেই কোনো দেশের সভ্যতার অন্যতম সূচক নারীর নিরাপত্তা। উল্লিখিত চিত্র বাংলাদেশের অবস্থান যেইখানে নির্দেশ করে, উহা ভাবমূর্তির পক্ষে ইতিবাচক নহে। এই দেশে নারীর অসহায়ত্ব এই পরিসংখ্যানেও স্পষ্ট হয় যে, দাম্পত্য সহিংসতার শিকার ৯৩ শতাংশ নারী প্রতিকারমূলক আইনি আশ্রয় গ্রহণ করেন নাই। উপরন্তু, ৬২ শতাংশ নারী সহিংসতার কথা কখনও প্রকাশই করেন নাই। এই সংখ্যাই অনেক কথা বলিতেছে। কতখানি প্রতিকূল সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশ থাকিলে একটা দেশের অধিকাংশ নারী নির্যাতনের যন্ত্রণা এই আধুনিক যুগেও মুখ বুজিয়া সহ্য করিয়া থাকেন, উহা ব্যাখ্যা করিয়া বলিবার প্রয়োজন নাই। এই প্রশ্নও অসংগত হইতে পারে না যে, যেই ৭ শতাংশ নারী আইনি আশ্রয়ের আশায় বিদ্যমান বিচার ব্যবস্থা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলির নিকট যাইয়া থাকেন, তাহারা কতখানি প্রতিকার পান? প্রতিকার না হউক, সংবেদনশীল আচরণ কী মিলে?
জাতিসংঘের স্বীকৃত পদ্ধতিতে দেশের খানাভিত্তিক শহর, গ্রাম, দুর্যোগপ্রবণ, বস্তি এলাকাসহ ২৭ হাজার ৪৭৬ নারীর সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে প্রণীত প্রতিবেদনটিতে বলা হইয়াছে, দাম্পত্য সহিংসতার ধরনের মধ্যে রহিয়াছে–শারীরিক, মানসিক, যৌন, অর্থনৈতিক ও নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ। জরিপে আরও দেখা যায়, ৫৪ শতাংশ অর্থাৎ, অর্ধেকের বেশি সংখ্যক নারী জীবদ্দশায় স্বামীর হাতে শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার হইয়াছেন। এমনকি গর্ভাবস্থাতেও এই সহিংসতা হইতে রেহাই মিলে নাই। গর্ভাবস্থায় ৭ দশমিক ২ শতাংশ নারী শারীরিক ও ৫ দশমিক ৩ শতাংশ যৌন সহিংসতার শিকার হইয়াছেন। এইদিকে সাম্প্রতিককালে যুক্ত হইয়াছে অনলাইনে ও সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকার হয়রানি ও জিম্মির ন্যায় ডিজিটাল সহিংসতা। এই প্রকার সহিংসতার প্রতিকার প্রার্থনা সাধারণ নারীর পক্ষে প্রায় অসম্ভব নহে; প্রতিকারের সক্ষমতাও বিবেচ্য।
আলোচ্য জরিপে গৃহাভ্যন্তরে নারীর প্রতি সহিংসতার গুরুত্বপূর্ণ যেইসকল কারণসমূহ উঠিয়া আসিয়াছে, সেইখানে যৌতুক প্রথাই প্রধান। স্বামীর মাদকাসক্তি, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক ও শহুরে বস্তিতে বসবাস নারীর ঝুঁকি বাড়াইবার কথাও প্রতিবেদনে রহিয়াছে। আমরা জানি, যৌতুকের বিরুদ্ধে দেশে আইন রহিয়াছে, যেইখানে যৌতুক গ্রহণ ও প্রদান তো অপরাধই, দাবি করাও দণ্ডনীয় অপরাধ বলা হইয়াছে। তৎসত্ত্বেও নারীর প্রতি পারিবারিক সহিংসতার প্রধান উৎস যৌতুক কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজিতে গেলে দেখা যাইবে। প্রথমত, আইনটির প্রয়োগ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ঘটে নাই; দ্বিতীয়ত, অজ্ঞতার কারণে বা সামাজিক নানা অপপ্রচারের ভয়ে আইনটির আশ্রয় ভুক্তভোগীরা তেমন গ্রহণ করেন না। উভয় ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব প্রধান বলিয়া আমরা মনে করি।
জরিপ প্রতিবেদন অনুসারে, স্বামীর উচ্চতর শিক্ষা সহিংসতার আশঙ্কা হ্রাস করে। এই ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রের ভূমিকা প্রধান। সংবিধান নির্দেশনা মান্য করিয়া রাষ্ট্র যদি সকলের জন্য উপযুক্ত শিক্ষার ব্যবস্থা করিত, তাহা হইলে উক্ত সমস্যা অনেকাংশে হ্রাস পাইত। তবে বিলম্ব হইলেও সময় শেষ হইয়া যায় নাই। শুধু পুরুষ নহে, সকল নারীকে উচ্চশিক্ষার আওতায় আনিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। পাশাপাশি নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার যে কোনো ঘটনায় সরকারকে শূন্য সহিষ্ণুতা দেখাইতে হইবে। সর্বোপরি, সমাজের সচেতন মানুষদের এই বিষয়ে ধারাবাহিকভাবে সোচ্চার থাকিতে হইবে।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়
- সহিংসতা
- নারী নির্যাতন
- দাম্পত্য
