ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ঔষধশিল্প

কাঁচামাল লইয়া পাকা উদ্বেগ

কাঁচামাল লইয়া পাকা উদ্বেগ
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:২২ | আপডেট: ২৬ অক্টোবর ২০২৫ | ১১:১৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

ঔষধ উৎপাদনে বাংলাদেশের ব্যাপক সাফল্যের বিপরীতে ইহার কাঁচামাল সংগ্রহের চিত্র হতাশাজনক বলিয়াই প্রতীয়মান হইতেছে। কারণ ঔষধের কাঁচামাল সিংহভাগই বিদেশ হইতে আমদানি করিতে হয়। উপরন্তু, দেশে এই সংক্রান্ত শিল্প প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ দীর্ঘদিন যাবৎ স্থবির হইয়া আছে। অধিকতর উদ্বেগজনক হইল, বিষয়টি জাতীয় নিরাপত্তাকে হুমকিতে ফেলিতে পারে এমন আশঙ্কা সত্ত্বেও পরিস্থিতির পরিবর্তনে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হইতেছে না। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন ঔষধের  কাঁচামাল শিল্পকে নীতি ও আর্থিক সহায়তা দিতে সুপারিশ করিলেও উহা বাস্তবায়নের কোনো পদক্ষেপ নাই। অথচ আমরা জানি,ঔষধ প্রস্তুত অপেক্ষা কাঁচামাল প্রস্তুত করিতেই অধিক ব্যয় হইয়া থাকে। ২০১৮ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ন্যাশনাল এপিআই অ্যান্ড ল্যাবরেটরি রি-এজেন্টস প্রোডাকশন অ্যান্ড এক্সপোর্ট পলিসি প্রণয়ন করিয়াছিল। যেইখানে এপিআই উৎপাদনে বিনিয়োগ, প্রণোদনা, নমুনা পরীক্ষায় সহজতা, স্বল্প সুদে ঋণসহ নানা নীতিগত সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হইলেও বাস্তবে তেমন অগ্রগতি হয় নাই। যেই কারণে প্রতিবৎসর প্রায় দেড় লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে চলিয়া যাইতেছে কাঁচামাল আমদানিতে। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদনে যথার্থই উল্লেখ করা হইয়াছে, পরিকল্পনার অভাবে স্থবির ঔষধের কাঁচামাল শিল্প।

 ঔষধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলি যথার্থই দাবি করিয়াছে, ঔষধের কাঁচামাল শিল্প গড়িয়া তুলিতে যেই পরিমাণ বিনিয়োগ দরকার উহা বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় করা কঠিন; এইখানে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ব্যতীত সম্ভব নহে। এপিআই পার্কে বড় পরিসরে কাঁচামাল উৎপাদন ও রপ্তানির পরিকল্পনা থাকিলেও উহার জন্য যেই পরিমাণ অর্থ, অবকাঠামো ও নীতিগত সহায়ক পরিবেশ প্রয়োজন তাহা এখনও নিশ্চিত হয় নাই। আমরা দেখিয়াছি, চীন-ভারতসহ অন্যান্য দেশ প্রণোদনা ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় ঔষধের কাঁচামাল উৎপাদন করিতেছে। এইখানে যত বিলম্ব ঘটিবে ঔষধ কাঁচামাল শিল্পে আমরা ততই পিছাইয়া যাইব। যখন অন্তর্বর্তী সরকার গত আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস তথা এপিআই শিল্পের উন্নয়নে ১১ সদস্যের কমিটি গঠন করিয়াছিল, যাহাদের দায়িত্ব ছিল দেশীয় ঔষধের কাঁচামাল বা এপিআই শিল্পের উন্নয়নে সুস্পষ্ট কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করিয়া সরকারকে প্রতিবেদন দেওয়া, তখন আমরা উক্ত পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানাইয়াছিলাম। কিন্তু বিস্ময়কর হইলেও সত্যি, নির্ধারিত সময়ের এক মাস পার হইলেও কমিটি প্রতিবেদন জমা দেয় নাই। এমনকি প্রতিবেদন অনুযায়ী, অদ্যাবধি কমিটি কেবল একটি বৈঠক করিয়াছে, সেইখানেও কোনো নির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি হয় নাই। এমনকি কখন প্রতিবেদন তৈয়ার হইবে, সেই বিষয়েও মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করিয়া কিছু বলিতে পারিতেছে না। যেইখানে স্বাস্থ্য সচিব সাইদুর রহমান খোদ এই কমিটির আহ্বায়ক, সেইখানে অগ্রগতির এই হাল কেন?

এমনকি দেশীয় ব্যবস্থাপনায় ঔষধের কাঁচামাল তৈয়ারি ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াইবার লক্ষ্যে যেই রোডম্যাপ করিবার দায়িত্ব আরও পূর্বে দেওয়া হইলেও তাহার কোনো কাজ হয় নাই। সমকালের প্রতিবেদনে আসিয়াছে, ২৭ মে ঔষধের কাঁচামাল উৎপাদন, নীতি-সহায়তা ও নিবন্ধন সহজীকরণ নিয়ে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর ও কাঁচামাল প্রস্তুতকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ এপিআই অ্যান্ড ইন্টারমিডিয়ারিস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের যেই বৈঠক হইয়াছিল, সেইখানে দেশীয় ব্যবস্থাপনায় ঔষধের কাঁচামাল তৈয়ারি ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াইতে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কাজ করিবার প্রতিশ্রুতি দিয়াছিলেন। উক্ত বৈঠকে অধিদপ্তরের একজন পরিচালককে  এই লক্ষ্যে রোডম্যাপ তৈয়ারির দায়িত্ব দেওয়া হইলেও তিনি এখনও কোনো প্রতিবেদন প্রস্তুত করিতে পারেন নাই।

আমরা মনে করি, এখনও সময় শেষ হইয়া যায় নাই। সরকার আন্তরিক হইলে উক্ত দুইটি কমিটির কাজ দ্রুতই সম্পন্ন হইতে পারে। বস্তুত এখন আর পশ্চাতে তাকাইবার অবকাশ নাই। সেইজন্য ঔষধের কাঁচামাল আমদানির বিকল্প সৃষ্টিতে এখনি জোর পদক্ষেপ লাগিবে। দেশীয় ঔষধ শিল্পের স্থিতিশীলতা ও বিকাশ নিশ্চিত করিতে এবং অর্থনৈতিক স্বার্থেও ইহা জরুরি।
 

আরও পড়ুন

×