ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মেট্রোরেলে অঘটন

উন্নয়নের গতি বনাম অবহেলার মৃত্যু

উন্নয়নের গতি বনাম অবহেলার মৃত্যু
×

ফয়সাল কবীর শুভ

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৫ | ০৭:৩৯ | আপডেট: ২৭ অক্টোবর ২০২৫ | ১১:৪৯

রাজধানীর ফার্মগেটের ব্যস্ত সড়কে রোববার দুপুরে মেট্রোরেলের একটি পিলার থেকে খুলে পড়া বিয়ারিং প্যাডের নিচে চাপা পড়ে মারা গেলেন এক পথচারী; শরীয়তপুরের আবুল কালাম। দেড়শ কেজিরও বেশি ওজনের রাবারের এই প্যাডটি মুহূর্তেই কেড়ে নিল তাঁর জীবন। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ঠিক অন্য একটি জায়গায় এর আগেও এমন একটি বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়েছিল। অর্থাৎ এটি কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়, বরং পুনরাবৃত্ত ব্যর্থতা, যার দায় এড়ানো যায় না কোনোভাবেই।

অগ্রগতির চকচকে মুখোশের আড়ালে

ঢাকা শহর আজ মেগা প্রজেক্টের নগর– মেট্রোরেল, বিআরটি, এক্সপ্রেসওয়ে, ফ্লাইওভার– সবই উন্নয়নের প্রতীক। কিন্তু এই অগ্রগতির নিচে যেন জমে উঠছে এক অনিরাপত্তার ছায়া। প্রতিটি প্রকল্প উদ্বোধনের পরই যেন রাষ্ট্র ও কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়। এরপর শুরু হয় অবহেলা, শৈথিল্য আর দায় এড়ানোর প্রতিযোগিতা। বিশেষ করে বিগত সরকার যেন ‘অবকাঠামোগত উন্নয়ন’ দেখানোর এক প্রতিযোগিতায় নেমে গিয়েছিল, কিন্তু কাঠামোগত নিরাপত্তা ছিল কম গুরুত্বপূর্ণ। 

মেট্রোরেলের এই ঘটনার আগে ২০২২ সালে গাজীপুরের বিআরটি প্রকল্পে গার্ডার পড়ে একই পরিবারের পাঁচজন প্রাণ হারান। ২০২৩ সালে তেজগাঁও এলাকায় ক্রেন ভেঙে পড়ে এক নির্মাণ শ্রমিক নিহত হন। এ বছরের শুরুতে পান্থপথ ফ্লাইওভারে বড় ফাটল দেখা দেয়। পরে জানা যায়, নকশাগত ত্রুটি ও রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতিই তার কারণ। এমনকি নতুন উদ্বোধন করা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কিছু অংশেও ইতোমধ্যে দুর্ঘটনা ও ত্রুটি ধরা পড়েছে। এসব ঘটনায় এক ভয়ংকর মিল আছে এবং সবই ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ হিসেবে আখ্যা পেয়েছে। বাস্তবে এগুলো একই ধরনের অব্যবস্থাপনার ধারাবাহিক প্রতিফলন।

উন্নত দেশগুলোতে মেগা প্রকল্প নির্মাণের পর নিয়মিত নিরাপত্তা পর্যালোচনা বাধ্যতামূলক। টোকিও মেট্রোতে প্রতিটি অংশে সাপ্তাহিক পরিদর্শন হয়। কোনো সামান্য ত্রুটি ধরা পড়লে পুরো লাইন বন্ধ রাখা হয় যতক্ষণ তা মেরামত করা না হয়। সিঙ্গাপুরে ২০১২ সালে এমআরটি ট্রেন সিস্টেমে ছোট একটি ত্রুটির পর ২৬৫ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয় এবং ৫০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে পুরো সিস্টেম আপগ্রেড করা হয়। ভারতের দিল্লি মেট্রোতে ২০০৯ সালের একটি দুর্ঘটনার পর গঠিত হয় স্বাধীন নিরাপত্তা পর্যালোচনা বোর্ড, যা আজও প্রতিবছর প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

অন্যদিকে বাংলাদেশে এখনও পরবর্তী নিরাপত্তা পর্যালোচনার কোনো বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা নেই। ফলে নির্মাণ শেষ হলেই প্রকল্পটি যেন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টির বাইরে চলে যায়। রক্ষণাবেক্ষণ বাজেটকে এখনও অনুন্নয়ন ব্যয় হিসেবে দেখা হয়। অর্থাৎ এটি ব্যয় নয়; অপ্রয়োজনীয়। অথচ বিশ্বের যে কোনো সফল অবকাঠামো প্রকল্পে বাজেটের ৫ থেকে ৭ শতাংশ নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে সংরক্ষিত থাকে। আমরা উন্নয়নের কাঠামো তৈরি করছি, কিন্তু সেই কাঠামো টিকিয়ে রাখার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি গড়ে তুলছি না।

ফার্মগেটের এই দুর্ঘটনা দেখিয়ে দিল, নিরাপত্তার বিষয়টি আমরা এখনও উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখি না। বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়া মানে কেবল যান্ত্রিক ত্রুটি নয়; এটি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার নৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতারও প্রতিচ্ছবি। কারণ একটি প্রকল্প কেবল নির্মাণে শেষ হয় না। বরং এর জীবনচক্র রক্ষণাবেক্ষণ, তদারকি ও দায়বদ্ধতার মধ্য দিয়েই পূর্ণতা পায়।

জাতীয় অবকাঠামো নিরাপত্তা কমিশন গঠন

এখন জরুরি হলো একটি জাতীয় অবকাঠামো নিরাপত্তা কমিশন গঠন, যা স্বাধীনভাবে সব মেগা প্রকল্পের নিরাপত্তা পর্যালোচনা করবে। একই সঙ্গে প্রতিটি দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে, যাতে দায় নির্ধারণ ও সংস্কারের বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া যায়। পাশাপাশি উন্নত বিশ্বের মতো সেন্সরভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যাতে উড়ালপথ, পিলার ও রেললাইনগুলোর অবস্থা রিয়েল টাইমে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়।

ঢাকার নাগরিকরা প্রতিদিন অজান্তেই ঝুঁকির ভেতর দিয়ে হাঁটে, দাঁড়ায় বা চলাচল করে। একদিকে মেগা প্রকল্পের গর্ব, অন্যদিকে একরাশ আতঙ্ক। কারণ কোথা থেকে কী পড়ে যাবে, কেউ জানে না। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। এক নিরীহ পথচারীর মৃত্যু যদি রাষ্ট্রের বিবেককে নাড়া না দেয়, তবে সেই রাষ্ট্রের উন্নয়ন কেবলই মরীচিকা।

ঢাকার আকাশচুম্বী অবকাঠামোর নিচে পড়ে আছে নাগরিকদের নীরব ভয়। এখনই সময় সেই ভয় দূর করার। নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে হবে উন্নয়নের কেন্দ্রে; জবাবদিহি ফিরিয়ে আনতে হবে রাষ্ট্রের সংস্কৃতিতে। উন্নয়ন যদি জীবন কেড়ে নেয় তবে সেটি উন্নয়ন হয় কীভাবে?

ড. ফয়সাল কবীর শুভ: অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী নগর পরিবেশবিদ

আরও পড়ুন

×