ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

রাজনীতি

জুলাই সনদ এবং ঐক্যের অগ্নিপরীক্ষা

জুলাই সনদ এবং ঐক্যের অগ্নিপরীক্ষা
×

কাজী মারুফুল ইসলাম

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৫ | ০৭:৪৭ | আপডেট: ২৭ অক্টোবর ২০২৫ | ১১:১৯

বাংলাদেশের ইতিহাসে আগস্ট গণঅভ্যুত্থান কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের ঘটনা নয়; এটি ছিল রাষ্ট্রের চরিত্র ও শাসন ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তনের দুর্বার আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময়ের স্বৈরাচারী, দুর্নীতিগ্রস্ত শাসনের অবসানের পর দেশ এখন নতুন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সামনে জাতীয় নির্বাচন। তার আগে জাতি অপেক্ষমাণ– সেই কাঙ্ক্ষিত গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের পথ এগোবে কতদূর?

এই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশন যখন একটি অবাধ, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক তখনই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে ‘জুলাই সনদ’ এবং এর বাস্তবায়ন নিয়ে তৈরি হওয়া সংশয়।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশন কর্তৃক দীর্ঘ আলোচনার পর প্রণীত এই সনদ বাংলাদেশের আগামী দিনের রাষ্ট্রনীতি ও শাসনতান্ত্রিক কাঠামোর রূপরেখা। এই সনদের অনেক সীমাবদ্ধতা ও অপূর্ণতা থাকা সত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ দলিল বলে চিহ্নিত হচ্ছে। সনদটিতে প্রধান রাজনৈতিক দল ও জোটগুলো, বিশেষত বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য ইসলামপন্থি সংগঠন এবং মধ্যপন্থি দল স্বাক্ষর করেছে। এটি নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক অর্জন। কারণ এর মাধ্যমে প্রথমবার দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলো মৌলিক সংস্কার প্রশ্নে এক টেবিলে এসেছে। তবে এই ঐকমত্যে অনুপস্থিত সেই শক্তি, যারা আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের অন্যতম প্রতিনিধি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। জাতীয় নাগরিক পার্টি এবং এর সঙ্গে কয়েকটি বামপন্থি দলও এই সনদে স্বাক্ষর করা থেকে বিরত থেকেছে। তাদের অনুপস্থিতি ঐক্যের ছবিকে আংশিক ও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

জুলাই সনদের মূল দুর্বলতা এর আইনি ভিত্তি ও ভবিষ্যৎ সরকারের কাছে এর বাধ্যবাধকতা। সনদটি ‘রাজনৈতিক অঙ্গীকার’ হিসেবে বিবেচিত হলেও নতুন নির্বাচিত সরকার এই প্রতিশ্রুতিগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে– সেই নিশ্চয়তা কোথায়? বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির ব্যত্যয় নতুন নয়। সাংবিধানিক সংস্কার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যকারিতা এবং প্রশাসন দলীয়করণমুক্ত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সনদে স্থান পেলেও এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে সুস্পষ্ট রোডম্যাপ অনুপস্থিত। এনসিপিসহ যারা স্বাক্ষর করেনি, তাদের মূল যুক্তি সম্ভবত এখানেই নিহিত; যদি এই সনদ কেবল একটি ‘আবেগভিত্তিক দলিল’ হয়, তবে নির্বাচনের পর ক্ষমতার হাতবদলে এটি স্রেফ একটি কাগজের টুকরো হয়ে যেতে পারে।

এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে চারটি মূলধারা কাজ করছে– বিএনপি, জামায়াত ও ইসলামপন্থি জোট, এনসিপি, প্রথাগত বাম দলগুলো এবং কয়েকটি মধ্যপন্থি শক্তি। এই ধারাগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং অনাস্থা যেমন প্রকাশিত, একই সঙ্গে ক্ষমতার সমীকরণে পরস্পর যে পরোক্ষ যোগাযোগ কার্যকর, তাও বুঝতে বেগ পেতে হয় না। এমন নাজুক পরিস্থিতিতে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রশ্নটি কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠেছে। 

এর মধ্যেই আবার অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের নিয়ে নতুন বিতর্ক সমুপস্থিত। বিএনপি অভিযোগ তুলছে, এনসিপি-ঘনিষ্ঠ কিছু উপদেষ্টা নিরপেক্ষতার মানদণ্ড পূরণ করছেন না। অপরদিকে অন্যপক্ষ দাবি করছে, বিএনপি-ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাদেরও সরানো উচিত। এই পারস্পরিক সন্দেহ-অবিশ্বাস এবং পারস্পরিক দোষারোপের রাজনীতি প্রমাণ করে– নির্বাচনপূর্ব সময়েও রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের প্রভাব ও ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা থেকে সরে আসেনি। এই সময়ে এসে অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম দায়িত্ব হলো একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করা; এমন অবস্থায় উপদেষ্টাদের নিয়ে বিতর্ক সেই নিরপেক্ষতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

এদিকে ক্ষমতাচ্যুত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়কার মানবাধিকার লঙ্ঘন, দুর্নীতি ও সহিংসতার বিচার প্রক্রিয়া চলছে। এই বিচার জনগণের ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করলেও প্রশাসনের ভেতরে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। এই সংবেদনশীল সময়ে প্রয়োজন সংযম– বিচার হতে হবে জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি হিসেবে; প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে নয়।

এনসিপি মূলত আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের নৈতিক নেতৃত্বের ধারক। যদিও অভ্যুথান-পরবর্তী সময়ে এনসিপি-সংশ্লিষ্ট ছাত্রনেতৃত্বের অনেকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও দখলের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে; ডানপন্থি ও উগ্র রক্ষণশীল দল-শক্তির সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতা এনসিপির প্রাথমিক গ্রহণযোগ্যতাকে অনেকাংশে হ্রাস করেছে। তার পরও ধরা যেতে পারে যে তাদের অবস্থান বাইনারি রাজনীতি। অর্থাৎ বিএনপি-আওয়ামী লীগকেন্দ্রিক ক্ষমতার ঘূর্ণি থেকে বেরিয়ে নতুন গণতান্ত্রিক রাজনীতির ভিত্তি গড়া। তারা নির্বাচনের বিপক্ষে নয়, বরং চায় সংস্কারের আইনি বাধ্যবাধকতা ও বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা। তাদের এই সতর্ক অবস্থানকে কেবল রাজনৈতিক কৌশল বলে দেখলে ভুল হবে; বরং এটি গণতন্ত্রকে ক্ষমতার বাজার থেকে রক্ষা করার প্রাতিষ্ঠানিক সতর্কবার্তা। 

কারণ আমাদের অতীত আশাবাদী হওয়ার সুযোগ দেয় না। প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলো গণতন্ত্রের কথা বললেও বাস্তবে তারা দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখল ও দলীয় নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। আশঙ্কা আছে, তারা আবারও ঐক্যের সুযোগ ব্যবহার করে পুরোনো ক্ষমতার খেলায় ফিরে যেতে পারে। তাই এখন প্রয়োজন এমন এক বিকল্প রাজনীতি, যা ক্ষমতার লোভ নয়; নাগরিক জবাবদিহি, নৈতিক সাহস ও জনস্বার্থের ভিত্তিতে নতুন গণতন্ত্রের পথ রচনা করবে। এনসিপিসহ চব্বিশের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী সকল রাজনৈতিক দল, শক্তি ও নাগরিক সমাজকে সেই নৈতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান নিতে হবে।

নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও প্রশাসনের দলীয় প্রভাবমুক্ত করার চেষ্টা অবশ্যই ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু এসব প্রশাসনিক উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

গণতন্ত্র পুনর্গঠনের এই সময়টা তাই কেবল নির্বাচনের নয়; বরং একটি সামাজিক চুক্তির সময়। এমন এক চুক্তি, যা ক্ষমতা ভাগাভাগির বাইরে গিয়ে নাগরিক মর্যাদা, সহনশীলতা ও ন্যায়ের ভিত্তিতে রাষ্ট্রকে পুনর্গঠিত করবে। আগস্ট গণঅভ্যুত্থান সেই সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে, কিন্তু সেই দুয়ার দিয়ে প্রবেশ করার সাহস দেখাতে হবে রাজনীতির সব পক্ষকেই। যেহেতু গণঅভ্যুত্থানের মূল দাবিগুলো শিক্ষার্থীদের মাধ্যমেই এসেছিল, যাদের প্রতিনিধিত্ব করছে এনসিপি, তাই তাদের দাবি ও উদ্বেগকে অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

মোট কথা, বাংলাদেশের গণতন্ত্র আজ দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক অগ্নিপরীক্ষার মুখে– আমরা কি আবার পুরোনো ক্ষমতার দুষ্টচক্রে ফিরে যাব, নাকি জন্ম দেব এক নতুন নৈতিক রাজনীতির? এ প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।

ড. কাজী মারুফুল ইসলাম: অধ্যাপক, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

আরও পড়ুন

×