জনপ্রশাসন
অধিদপ্তর ও সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীর মূল্যায়ন যে কারণে প্রত্যাশিত
দেশের মাঠ পর্যায়ের কাজ করে অধিদপ্তর, পরিদপ্তর এবং সংস্থাসমূহ
গাজী মিজানুর রহমান
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৫ | ১৩:৫৯
দেশের মাঠ পর্যায়ের কাজ করে অধিদপ্তর, পরিদপ্তর এবং সংস্থাসমূহ। স্বল্প কয়েকটা অধিদপ্তর আছে, যাদের নিজস্ব ক্যাডার আছে। সেখানে ক্যাডার কর্মকর্তারা নবম গ্রেডের পদ থেকে চাকরি শুরু করেন এবং সেই অধিদপ্তরের ওপরের পদগুলোতে তারা যেতে পারেন। আর যেসব অধিদপ্তরের জন্য ক্যাডার সার্ভিস নেই, সেখানে শীর্ষ পদে বা কোথাও কোথাও শীর্ষ পদের নিচের পদে ডেপুটেশনে কাজ করেন ক্যাডার কর্মকর্তা অথবা সামরিক বাহিনী থেকে আসা কর্মকর্তাগণ। তারা দপ্তর-অধিদপ্তরের নন-ক্যাডার কর্মকর্তা-কর্মচারীগণের সাথে অভিজ্ঞতা শেয়ার করে কাজগুলো সম্পাদন করেন। বিধিবদ্ধ সংস্থা/বোর্ডের ক্ষেত্রে একই কথা খাটে। এগুলোর পরিচালনা বোর্ডে ক্যাডার কর্মকর্তা বা সরকার কর্তৃক নিয়োজিত গুরুত্বপূর্ণ অন্য সার্ভিসের কর্মকর্তাগণ আসতে পারেন। তবে সব ক্ষেত্রে সেবা প্রদানের সরাসরি দায়িত্ব পালন করেন নন-ক্যাডার সদস্য বা সংস্থা/বোর্ডের নিজস্ব জনবল।
দেশের উন্নয়নের জন্য অধিদপ্তর-সংস্থার কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে এবং দায়িত্ব পালনে গতিশীল রাখতে তাদের জন্য উপযুক্ত কাজের পরিবেশ সৃষ্টি করে দিতে হবে। অনেক প্রতিষ্ঠানে দেখা যায়, শীর্ষ পদগুলোর অধিকাংশ পদে ডেপুটেশনে লোক আনা হয়। এতে নিজস্ব জনবলের পদোন্নতির সুযোগ ব্যাহত হয়। অধিদপ্তর এবং সংস্থার নিজস্ব জনবল তাদের প্রতিষ্ঠানের কাজের বিষয়ে সবচেয়ে বেশি অভিজ্ঞ। কারণ, এক অফিসেই তাদের চাকরির শুরু এবং এক অফিসেই শেষ। এই অভিজ্ঞতা কাজে না লাগালে জনগণের জন্য সেবা ব্যাহত হবে। নন-ক্যাডার বা সংস্থার নিজস্ব জনবলের চাকরির ভালোমন্দ, কাজের পরিবেশ, পদোন্নতি, প্রশিক্ষণের সুযোগ, এসব অবহেলিত থাকলে তারা নিবেদিত হয়ে কাজ করার স্পৃহা হারাবে।
রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে ক্যাডার সার্ভিসগুলো নেতৃত্বের আসনে থাকবে, এতে কোনো দ্বিমত নেই। ক্যাডার এবং নন-ক্যাডারের মধ্যে সুযোগ-সুবিধার ব্যবধান থাকবে, এটাও ঠিক; কিন্তু তা একটা সহনীয় মাত্রার মধ্যে থাকা দরকার। পেছনে রাখলেও কাছে-কাছে রাখতে হবে, দূরে ঠেলে দেওয়া সঠিক কাজ হবে না। অধিদপ্তরের নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের গতিশীল রাখতে তাদের কাজের দায়িত্ব দিতে হবে। অধিদপ্তরে ক্যাডার অফিসার যখন ডেপুটেশনে আসেন, তখন তাদের জন্য সমস্যার গভীরে ঢুকতে আগের ঘটনাক্রম জানতে বিশ্বস্ত এবং দায়িত্বশীল কর্মকর্তা দরকার হয়। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হলে, তুচ্ছ কারণে স্বার্থান্বেষী গ্রুপ আদালতে গিয়ে পদায়ন বা পদোন্নতি বা অন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ আটকে রাখে। ফলে হতাশায় নিমজ্জিত হয় অধিদপ্তর বা সংস্থার নিজস্ব লোকবল।
যে অধিদপ্তরে নিজস্ব ক্যাডার নেই, সেখানে মহাপরিচালক পদে যদি ডেপুটেশনে ক্যাডার কর্মকর্তা বা অন্য সার্ভিস থেকে আসে, তাহলে জাতীয় স্কেলের ন্যূনতম তৃতীয় গ্রেড দিয়ে একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালকের পদ রাখা দরকার, যে পদে নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের একজনকে পদায়ন করার ব্যবস্থা করা যাবে। পাশাপাশি বিধিবদ্ধ সংস্থার নিজস্ব জনবলের মধ্য থেকে যাতে একটা হিস্যা অনুযায়ী বোর্ডের সদস্য বা বোর্ডের পরিচালক হতে পারে, এমন ব্যবস্থা থাকতে হবে। উদাহরণ হিসেবে পিএটিসির কথা বলা যায়। এখানে এমডিএস পদের একটা অংশ পিএটিসির নিজস্ব জনবল থেকে আসে। তাতে চাকরির শুরু থেকেই তারা ধরে নিতে পারে যে সন্তোষজনক সার্ভিস রেকর্ড থাকলে তারা এমডিএস হতে পারবে। তাই তারা নিজেদের প্রস্তুত করে রাখে। এ কথা সব বিধিবদ্ধ সংস্থার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
অধিদপ্তরে নবম ও দশম গ্রেডের কর্মকর্তা নিয়োগ করে পাবলিক সার্ভিস কমিশন। কিন্তু সংস্থাগুলোতে যার যার মতো করে নিয়োগ হয়। রাজনৈতিক সরকারের সময় এসব নিয়োগের সময় সংস্থা প্রধানগণকে ভালো চাপ মোকাবিলা করতে হয়। নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ না হলে উপযুক্ত মানের জনবল পাওয়া যাবে না। আর যোগ্য না হলে ভালো দায়িত্ব দেওয়ার সুপারিশ করলে জনগণ সেসব কর্মীর কাছ থেকে ভালো সেবা পাবে না। বর্তমানে ব্যাংকার্স রিক্রুটমেন্ট কমিটি যেভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে সব ব্যাংকের নবম ও দশম গ্রেডের পদে লোকবল নিয়োগ করে, সেভাবেই একটা আমব্রেলা কমিটির মাধ্যমে করপোরেশন, বোর্ড বা অনুরূপ সব সংস্থায় একটা বড় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নবম ও দশম গ্রেডের পদে নিয়োগ হলে প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ বন্ধ হবে এবং যোগ্য লোক আসতে পারবে। যোগ্য লোক এলে আর তাদের উপরে ওঠার সুযোগ থাকলে তারা নিবেদিত হয়ে কাজ করবে। পদোন্নতি বা মর্যাদাসম্পন্ন পদে আসীন হওয়ার সম্ভাবনা সংকুচিত হলে কর্মীদের মন বিগড়ে যায়। সেই হতাশার ওপর ভর করে নানা ক্ষতিকর অনুষঙ্গ চলে আসে। সেজন্য ছিদ্রগুলো বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।
গাজী মিজানুর রহমান: অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব
- বিষয় :
- সরকারি চাকরিজীবী
- অধিদপ্তর
