ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মেরুদণ্ডের দুরবস্থা

মেরুদণ্ডের দুরবস্থা
×

মোজাম্মেল হোসেন

মোজাম্মেল হোসেন

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:১৮ | আপডেট: ২৯ অক্টোবর ২০২৫ | ১১:৩৩

শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। এই সত্যটি আমরা স্কুলজীবনে শিখে, রচনা লিখে, পরীক্ষায় পাস করে বড় হই। মেরুদণ্ড ঋজু না বক্র, শক্ত না দুর্বল, নীরোগ না ক্ষয়প্রাপ্ত– এর ওপরেই তো জাতির স্বাস্থ্য নির্ভর করবে। মুখের শ্রী তেলচিক্কণ থাকলেই চলবে না। যা বাইরে দেখা যাচ্ছে না সেই মেরুদণ্ডখানা সোজা ও শক্তপোক্ত থাকতে হবে। নইলে দুদিন বাদে জীবনটাই ব্যর্থ। 

আমাদের জাতির মেরুদণ্ড কেমন? শিক্ষা কেমন চলছে? শিক্ষার ব্যবস্থাপনা, শিক্ষালয়ের পরিবেশ, শিক্ষাদানের সামর্থ্য ও শিক্ষা লাভের সুযোগ, শিক্ষার মান, শিক্ষার মাধ্যমে জ্ঞান ও নৈতিকতা দিয়ে উপযুক্ত মানুষ গড়ে উঠছে কিনা; বুদ্ধি ও মেধার বিকাশ হচ্ছে কিনা; শিক্ষা দেশে ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রতিযোগিতামূলকভাবে দাঁড়াতে সক্ষমতা কতটুকু তৈরি করছে– এই সবকিছু মিলিয়ে মেরুদণ্ডটির স্বাস্থ্য বুঝতে হবে। 

হতাশা দিয়ে গল্প শুরু নয়। আমাদের গর্ব করার মতো জায়গা আছে। দেশে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা চার কোটির বেশি। সরকারি শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৩ সালের তথ্যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ছাত্র সংখ্যা তিন কোটি ২৬ লাখ। এর মধ্যে প্রাথমিকে ছেলেমেয়ে প্রায় সমান সমান; মাধ্যমিক স্তরে মেয়ে বেশি। সবেমাত্র অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে আমরা জানলাম, প্রায় ৪০ হাজার ভোটার শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪৭ শতাংশ ছাত্রী। এটা অনন্যসাধারণ পরিসংখ্যান। আমাদের প্রাথমিক স্কুলে ভর্তির হার (২০২১ সালে ৯৭.৪২%) দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশে সর্বোচ্চ। মাধ্যমিকে মেয়েদের অংশগ্রহণও তাই, যা সম্ভব হয়েছে উপবৃত্তির কারণে। ভারতের নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন এর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। 

আমরা  দেখি, শুধু কৃষক নয়; দিনমজুর-ক্ষেতমজুর ও রিকশাওয়ালারাও খেয়ে না-খেয়ে সন্তানদের লেখাপড়া শেখাতে আগ্রহী। গত সপ্তাহে ‘প্রথম আলো’ এক খবরে দেখিয়েছে, ঢাকা শহরে ফুটপাতে থাকা এক নারী দুই কন্যাশিশু– নিজের মেয়ে ও নাতনিকে স্কুলে পড়াচ্ছেন।  

প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে ভর্তির হার ভালো হলেও ড্রপআউট বা ঝরে পড়ার হারও দুঃখজনক। প্রাথমিকে ভর্তি হওয়া সব ছাত্রছাত্রীই পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত থাকে না। আর একটি নিদারুণ ব্যর্থতার দিক হচ্ছে, শিক্ষার মান। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত দেশে শিক্ষার অতি নিম্নমান সম্পর্কে প্রায়ই খবর বের হয়। বিশ্বব্যাংক উল্লেখ করেছে, আন্তর্জাতিক স্কেলের মানদণ্ডে বাংলাদেশের শিক্ষার মান ২.৮, যা ভারত ও শ্রীলঙ্কার ২০.৮ এবং পাকিস্তানের ১১.৩। অর্থাৎ বাংলাদেশ তলানিতে।

বিশ্বব্যাংকের দ্বারস্থ না হয়ে আমরা গত বছরে অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ ভর্তি পরীক্ষা ও গত সপ্তাহে বেরুনো এইচএসসির ফল দেখতে পারি। ভর্তি পরীক্ষায় বিজ্ঞান গ্রুপে পাসের হার মাত্র ৫.৯৩%। এইচএসসিতে সব বোর্ডের পাসের গড় হার ৫৮.৮৩%। এত ফেল বিরাট জাতীয় অপচয়।  

আমাদের উচ্চশিক্ষার মান? যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত ‘কিউএস’ সংস্থার ২০২৫ সালে র‌্যাঙ্কিংয়ে বিশ্বের সেরা ৫০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটিও বাংলাদেশের নয়। এশিয়ার সেরা ৩০০ বিশ্ববিদ্যালয়েও আমরা ঢুকতে পারিনি। দক্ষিণ এশিয়ায় র‌্যাঙ্কিংয়ে আছি ১৯তম স্থানে। এসব লজ্জাকর তথ্য-পরিসংখ্যান আমরা জানি। প্রশ্ন হলো, শিক্ষার দুরবস্থার কারণগুলো কী কী?

গবেষণালব্ধ অনেক কারণের কথা বলা যেতে পারে। তবে এই মুহূর্তে সর্বসাম্প্রতিক শিক্ষক আন্দোলনের দিকে তাকানো যেতে পারে। ১২ থেকে ২১ অক্টোবর ৯ দিন ঢাকায় এসে সারাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষাস্তরের এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা পুলিশের লাঠি-পানি, শব্দ-বোমা, কাঁদানে গ্যাস খেয়ে আন্দোলন করে বাড়ি ভাড়া দুই দফায় মূল বেতনের ১৫% পর্যন্ত আদায় করেছেন। এই শিক্ষকরা কত বেতন পান? এমপিও মানে ‘মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার’ বা বেসরকারি স্কুলের শিক্ষকদের সরকারি স্কেলের মূল বেতনের সমান অংশ সরকার থেকে দেওয়ার ব্যবস্থা। 

২০১৫ সালে সরকারি বেতন বাড়ানোর পরও এখন মাধ্যমিক স্কুলের চাকরির প্রবেশমুখে একজন সহকারী শিক্ষকের বেতন ১১তম ও ১০ম গ্রেডে যথাক্রমে সাড়ে ১২ হাজার টাকা ও ১৬ হাজার টাকা। প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষকদের বেতন শুরু ১৩তম গ্রেডে ১১ হাজার টাকা। কলেজের শিক্ষকের বেতন শুরু ৯ম গ্রেডে ২২ হাজার টাকা। এমপিওভুক্তদের বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা ও বার্ষিক উৎসব ভাতা অতি নগণ্য, যা স্থানাভাবে বিস্তারিত উল্লেখ করলাম না। আবার পেনশন ও কল্যাণ তহবিল বাবদ কিছু কেটে রাখতে হয়। যে কোনো মধ্যবিত্ত পরিবারকর্তা সম্যক বুঝবেন, এই পরিমাণ টাকায় কীভাবে সংসার চালানো যায়! 
কেউ কেউ বলছেন, অনেক শিক্ষক প্রাইভেট পড়িয়ে রীতিমতো বড়লোক। কত জন? ঢাকা ও বড় শহরে কোচিং চালান প্রধানত অঙ্ক ও ইংরেজির শিক্ষকরা। বাণিজ্যিক কোচিং সেন্টারের মালিক ভিন্ন পেশারও হতে পারেন। এই কোচিং ব্যবসায়ীরা বোর্ড ও মন্ত্রণালয় পর্যায়ে প্রভাব খাটিয়ে শিক্ষাকে মুখস্থনির্ভর রাখার চক্রান্তে লিপ্ত। প্রশ্নপত্র ফাঁসেরও কারিগর তারা। অপরদিকে প্রথাগত বাড়ি বাড়ি টিউশনি তো শিক্ষক বা জায়গির মাস্টার ও শিক্ষার্থী ঊভয়কে সহায়তা করে। এই টিউশনি অন্যায় নয়।

আমরা বছরের পর বছর দেখি, দারিদ্র্যপীড়িত শিক্ষকরা মাঝে-মধ্যেই বেতন-ভাতা বাড়ানোর আন্দোলনে ঢাকায় এসে রাস্তায় অপমানিত হন। এবারও পুলিশ অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে। একজন পুলিশ কর্মকর্তার এক বয়স্ক শিক্ষকের মুখ চেপে ধরে রাখার পীড়াদায়ক ছবি দেখা গেছে। এসব দৃশ্য স্কুলের শিশুরা সংবাদচিত্রে দেখছে। তাদের মানসিক প্রতিক্রিয়া কেমন হয়, আমাদের ভাবা উচিত না?
অবশ্য সরকার শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বাড়াতে টাকা কোথায় পাবে? এটাই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান সমস্যা ও প্রতিবন্ধক। বাজেট বরাদ্দ ও মোট জাতীয় উৎপাদনের (জিডিপি) শতাংশ উভয়ত বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে ব্যয় দক্ষিণ এশিয়ায় নিম্নস্তরে। ২০২৩-২৪ সালের হিসাবে জিডিপির শতাংশ হিসাবে শিক্ষা খাতে নেপালে ব্যয় ৪.৩%, ভারতে ২.৯%, বাংলাদেশে ১.৯% ও শ্রীলঙ্কায় ১.৮%।

পরিতাপের বিষয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নানা আকর্ষণীয় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু শিক্ষা খাতে ব্যয় ধার্য গতবারের চেয়েও নেমে এসেছে; জিডিপির ১.৫৩ শতাংশ। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে বার্ষিক মোট বরাদ্দের মাত্র ১১.৮% শিক্ষা খাতে। ইউনেস্কোর সুপারিশ হচ্ছে, তৃতীয় বিশ্বে শিক্ষা খাতে ব্যয় জিডিপির ৪ থেকে ৬ শতাংশ এবং বাজেট বরাদ্দ ১৫ থেকে ২০ শতাংশ রাখা। অন্য কোথাও সরকার ব্যয় কমাচ্ছে না; মন্ত্রী ও সরকারি আমলাদের এত দামি গাড়ি দেওয়া হয়, যা নাগরিকদের চোখ কপালে ওঠে। তুলনামূলক প্রশাসন ও পুলিশে বেতন-ভাতা ভালো বলে মেধাবী শিক্ষার্থীরা বিসিএস পরীক্ষা দেওয়ার জন্য হন্যে হয়। যদি বলা হয়, মেধাবীরা তো ভালো বেতন পাবেনই, তাহলে কি ধরে নিতে হবে মেধাবীরা কখনও শিক্ষকতা পেশায় আসবেন না? তাহলে শিক্ষার মান কেন বাড়বে?

প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার যে দুর্বলতা, নৈরাজ্যকর এলোমেলো, শতচ্ছিন্ন বস্ত্রের মতো অবস্থা, তা দূর করতে হলে দুই জায়গায় আমাদের মনোনিবেশ করতে ও সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তা হলো– নীতির প্রশ্ন ও অর্থের সংস্থান। নীতির দিকটা নিয়ে স্থানাভাবে এই নিবন্ধে আলোচনা তুললাম না। বারান্তরে লেখার ইচ্ছা রইল। তবে এই বিষয় দুটি এই-সরকার বা ওই-সরকার, এই-দল বা ওই-দলের বিষয় নয়। এটি জাতীয় বিষয়। শিক্ষা প্রশ্নে জাতিকে মনস্থির করতে হবে; বাস্তবায়নে নামতে হবে।

মোজাম্মেল হোসেন: সাংবাদিক

আরও পড়ুন

×