ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব

নেলসন ম্যান্ডেলা: ক্ষমা, শান্তি ও ঐক্যের এক অনন্য প্রতীক  

নেলসন ম্যান্ডেলা: ক্ষমা, শান্তি ও ঐক্যের এক অনন্য প্রতীক  
×

নেলসন ম্যান্ডেলা [১৮ জুলাই ১৯১৮–৫ ডিসেম্বর ২০১৩]

মঞ্জুরে খোদা 

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৫ | ১৯:১৪

নেলসন ম্যান্ডেলা আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে এক অনন্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। সাধারণ এক গ্রামীণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও ম্যান্ডেলা শুধু দক্ষিণ আফ্রিকা নয়, গোটা বিশ্বের নিপীড়িত জনতার নেতা হয়ে ওঠেন। আইনজীবী হিসেবে পেশাগত জীবন শুরু করতে না করতেই তিনি সক্রীয় হয়ে ওঠেন রাজনীতিতে। সমাজের অবিচার, অনাচার, বৈষম্য তাঁকে প্রবল সংগ্রামী ও প্রতিবাদী করে তোলে।  

নানা চড়াই-উতরাই, আন্দোলন-সংগ্রাম পেরিয়ে ১৯৯৪ সালে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কালো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। নিজের শাসনামলে (১৯৯৪-৯৯) তিনি ক্ষমতাকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর ব্যবহার না করে বরং অংশীদারিত্বের মাধ্যমে জাতিকে একত্র করেন। ক্ষমতার বণ্টন, ক্ষমা ও পুনর্মিলনের রাজনীতিই ছিল তাঁর নেতৃত্বের মূল বৈশিষ্ট্য। বর্ণবৈষম্য পরবর্তী সময়ে তাঁর লক্ষ্য ছিল প্রতিশোধ নয়, বরং পরস্পরের মিলন। তার অংশ হিসেবেই তিনি বিরোধীদের অন্তর্ভুক্ত করে একটি জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন করেন। 

ম্যান্ডেলার জীবনের মূল বার্তা ছিল– ক্ষমা ছাড়া সত্যিকারের শান্তি সম্ভব নয়। বিভাজন, বর্ণবৈষম্য ও রাজনৈতিক সংঘাতকে তিনি সহমর্মিতা, সংলাপ এবং ন্যায়ের মাধ্যমে মোকাবিলা করেছেন। তিনি বলেন, ক্ষমা ছাড়া ভবিষ্যৎ গড়া যায় না। ১৯৯৪ সালের প্রথম নির্বাচনে এএনসি সরকার গঠন করার মতো নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ম্যান্ডেলা পূর্বের শ্বেতাঙ্গ শাসক দল ন্যাশনাল পার্টি (এনপি), ইনকাথা ফ্রিডম পার্টি (আইএফপি) জুলু জাতিগোষ্ঠীর দলসহ সবাইকে নিয়ে সরকার গঠন করে এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেন।

এই সরকারে বিরোধী দলগুলোর মন্ত্রীদের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় দেওয়া হয়। যেমন– প্রতিরক্ষা, খনিজ সম্পদ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তিনি শ্বেতাঙ্গ রাষ্ট্রপতি বাসভবন, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান ও ক্রীড়া দলগুলোয় পুরোনো শাসকগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব রাখেন। ১৯৯৫ সালের রাগবি বিশ্বকাপে তিনি শ্বেতাঙ্গ অধিনায়ক ফ্রাঁসোয়া পিনারকে প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়ে ঐক্যের বার্তা দেন। প্রশাসনে শ্বেতাঙ্গ, কৃষ্ণাঙ্গ ও অন্যান্য বর্ণের সবাইকে সমানভাবে সুযোগ দেন।
ম্যান্ডেলা রাজনৈতিক বিরোধীদের প্রতি ব্যক্তিগতভাবে শ্রদ্ধাশীল ছিলেন– এমনকি যারা তাঁর বন্দিত্বের সময় তাঁকে নিপীড়ন করেছিল, তাদের সঙ্গেও তিনি সংলাপ চালান। তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার বা প্রতিশোধমূলক রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ বিরত ছিলেন।

তিনি শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গ উভয় সম্প্রদায়ের নেতাদের নিয়ে ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন টিআরসি’ গঠন করেন। এ কমিশনের মাধ্যমে অতীতের সব অন্যায়ের প্রকৃত সত্য প্রকাশের সুযোগ দেন, সেখানে অপরাধীরাও ক্ষমা পেতে পারেন যদি তারা সত্যটা স্বীকার করেন। এতে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অংশগ্রহণ ছিল এবং এর মাধ্যমে দেশে জাতীয় পুনর্মিলনের সৃষ্টি হয় এবং তিনি হয়ে ওঠেন জাতীয় ঐক্যের প্রতীক।
এই অন্তর্ভুক্তিমূলক সমঝোতার রাজনীতি দক্ষিণ আফ্রিকায় একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক ভিত্তি তৈরি করে এবং বর্ণবৈষম্য-পরবর্তী গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনা রোধ করে। ম্যান্ডেলা বিরোধীদের শত্রু নয়, বরং রাষ্ট্র গঠনের সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। তিনি ক্ষমতার অংশীদারিত্ব, পুনর্মিলন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে একটি ঐক্যবদ্ধ দক্ষিণ আফ্রিকা গড়ে তুলেছিলেন।
নেলসন ম্যান্ডেলা দেখিয়েছেন, ক্ষমতা শুধু অধিকার নয় বরং দায়িত্বও। তাঁর জীবন ও সংগ্রাম আমাদের শেখায়, স্বাধীনতা, সমতা, মানবাধিকার নিশ্চিত করতে ধৈর্য, ন্যায়পরায়ণতা ও ক্ষমার মানসিকতা থাকতে হয়। ২৭ বছরের কারাবাস, প্রায় পাঁচ দশকের সীমাহীন বঞ্চনা, বৈষম্য, জাতিগত নিপীড়ন ও হাজার হাজার মানুষের গুম-খুন ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত বিজয়ে ম্যান্ডেলা প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসাপরায়ণ না হয়ে ক্ষমার মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য ও অন্তর্ভুক্তির সমাজ ও রাজনীতির প্রতিষ্ঠা করেছেন। গৃহযুদ্ধের পথে না গিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। এ কারণে তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন।  
অনেক আত্মত্যাগের মাধ্যমে জুলাই অভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিষ্ঠিত হলো। তাঁর প্রধান হলেন শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি যদি নেলসন ম্যান্ডেলার উদাহরণ অনুসরণ করতেন তাহলে হয়তো বাংলাদেশের ইতিহাস অন্যরকম হতো।

ড. মঞ্জুরে খোদা: লেখক-গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
 
 

আরও পড়ুন

×