ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

রাজনীতি

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন এবং সংকটের ঘনঘটা 

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন এবং সংকটের ঘনঘটা 
×

আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী

আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী

প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:২২ | আপডেট: ০১ নভেম্বর ২০২৫ | ১০:৪৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

তেরো সংখ্যাটি দেখলে অনেকেরই বুক হয়তো একটু কাঁপে। কানে বাজে ‘আনলাকি থার্টিন’ শব্দগুচ্ছ। স্বাভাবিক ধারাক্রমে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনটি ত্রয়োদশ বা ১৩তম। সে কারণেই অন্তর্গত একটি শঙ্কা কাজ করছে। তবে এমন কুসংস্কার মনের বৈকল্যমাত্র– এই বিশ্বাস নিয়ে সবাই এগিয়ে চলেছি ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের দিকে। প্রধান উপদেষ্টাসহ অন্যান্য উপদেষ্টা ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো নির্বাচন উপহার দেবেন বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করছেন। একই প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচন নিয়ে আদৌ কি কোনো সংকট আছে?

১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল অনেক বড় চ্যালেঞ্জের। ১৯৭৫-এর পট পরিবর্তনের পর অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ না করলে নির্বাচনটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গ্রহণযোগ্যতা পেত কিনা, সন্দেহ ছিল। ১৯৭৭ ও ’৭৮-এ দুবার নির্বাচনের তোড়জোড় হলেও বিরোধী দলের বয়কটের তাপে ভোট যায় পিছিয়ে। শেষে আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল মালেক উকিলের ‘নাথিং ক্যান গো আনচ্যালেঞ্জড’ ঘোষণা নির্বাচনের দ্বার খুলে দেয়। তাতে বিজয়ী হয়েছিল দেশের গণতন্ত্র। পরের দুই নির্বাচনে জাতি দেখল বর্জনের মহড়া। বড় বড়  রাজনৈতিক দল নির্বাচন বর্জনের দিকে ঝুঁকে গেলে ভোটের ব্যালট পেপারে অসহায় জনগণের আর কিছুই করার থাকল না। 

গণঅভ্যুত্থানে জেনারেল এরশাদের পতনের পর ১৯৯১-এর নির্বাচনই এযাবৎকালের একমাত্র সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচন। কারও কোনো হুমকি নেই; নির্বাচন বর্জনের আওয়াজ নেই। পতিত এরশাদের দল জাতীয় পার্টিকে নির্বাচনী মাঠে রেখে সরকার পতনের কুশীলব দলগুলো সবারই উৎসবমুখর প্রতিদ্বন্দ্বিতা। প্রধান দুই দলের ভেতরেই ছিল ‘উইন উইন’ ভাব, যদিও নির্বাচনের পর কারও কারও কাছে তা সূক্ষ্ম কারচুপির নির্বাচন নামে অভিহিত হয়। শুরু হয় পরের নির্বাচনগুলোকে কোনো না কোনো ট্যাগ দেওয়া।
পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে হারের প্রতিশোধ নিতে ‘ফার্স্ট না হতে পারলে ভোটে যাব না’ নীতি মুখ্য হয়ে ওঠে প্রধান বিরোধী দলের। দাবি তোলে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা পরিবর্তনের। জনগণের আশা-ভরসার প্রতীক রাজনৈতিক দলগুলো অবলীলায় বলল– রাজনৈতিক সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে পারে না। জনগণ ৫ বছরের জন্য যাদের আস্থায় রাখতে পারবে, তারা আস্থাশীল থাকতে পারবে না ভোটের ৯০ দিন! 

এদিকে নতুন সরকার ব্যবস্থায় সপ্তম নির্বাচনে ফার্স্ট হয়ে তৃপ্তির হাসি হাসল যারা, অষ্টম সংসদ নির্বাচনের জন্য গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জামানায় নাভিশ্বাস উঠে গেল তাদেরই। তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নিয়ে হামলে পড়ল বিদায়ী সরকারের ওপর। বলল, হোমওয়ার্ক করে মাঠে নেমেছে। সেই হোমওয়ার্কের তোড়ে সদ্যবিদায়ী সরকারি দলের বোধোদয় হলো– ৯৬তে তোলা দাবিটা ভুল ছিল। 

নবম সংসদ নির্বাচনে ফার্স্ট হওয়ার মানসে দুই পক্ষেরই সে কী অদ্ভুত আচরণ! হোমওয়ার্কের শিকার না হতে এক পক্ষ প্রধান বিচারপতির অবসরের বয়স বাড়িয়ে কৌশল করল পছন্দের জনকে রেফারি বানাতে। আরেক পক্ষ মাঠে নেমে গেল লগি-বৈঠা নিয়ে। নাজেল হলো ছদ্মাবরণে সেনাশাসন। দেশ চলে গেল দু’বছরের জন্য অগণতান্ত্রিক শাসনে। আশায় বুক বাঁধা জাতি পুলকিত হলো ২০০৮ সালে– আবার বুঝি গণতন্ত্র ফিরে এলো, এই আনন্দে। কিন্তু হা হতোস্মি! দুই পক্ষ বিভক্ত হয়ে গেল দুই কট্টর শিবিরে। অতীতের জ্বালা থেকে শিক্ষা নিয়ে এক পক্ষ তুলে দিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা; আরেক পক্ষের দাবি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া ভোট হবে না। মাঝখান থেকে হেরে গেল জনগণ। ভোট দেওয়ার জন্য পায় না নিজের পছন্দের প্রার্থী। দশম নির্বাচন বর্জন করলেও একাদশ নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল অংশ নিল। কিন্তু রাতে ভোট হয়েছে– এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে শেষ মুহূর্তে ভোট ও ফল প্রত্যাখ্যান করে তারা। দেশে কিংবা আন্তর্জাতিক মহলে সে দুই নির্বাচন পায়নি ন্যায্যতা। দ্বাদশে তো বিরোধীপক্ষ মনোনয়ন দেওয়ার ধারেকাছেও যায়নি। একের পর এক তিনটি নির্বাচন দেশে-বিদেশে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। সে কারণেই সাধারণ নাগরিকদের অংশগ্রহণ আর বিদেশিদের সহানুভূতি ছিল জুলাই অভ্যুত্থানে। 

জুলাই অভ্যুত্থানের পর মানুষের মনে স্বস্তি– এবার বুঝি নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোটটা দিতে পারব। ভোটের সোর জমছিল ভালোই। গোল বাধল পতিত দল এবং তার ‘দোসর’দের নির্বাচনী লড়াই থেকে দূরে সরিয়ে। মাঠে ওরা থাকলে জুলাই আন্দোলনের প্রধান শরিকরা হয়তো একসঙ্গে থাকত। তখন প্রবণতা থাকত যৌথভাবে ফার্স্ট হওয়ার, যার সম্ভাবনা ছিল শতভাগ। শক্তিশালী প্রতিপক্ষ না থাকায় প্রধান দলগুলো নিজ নিজ পতাকা নিয়ে সোচ্চার; পরস্পরবিরোধী শিবিরে বিভক্ত। সবারই তীব্র বাসনা– ফার্স্ট হতে হবে। বাসনা তীব্র হতে হতে গলার সুরও গেছে পাল্টে। ‘আগিলা জামানা’র মতো ক্ষণেক্ষণে ‘ফার্স্ট না হতে পারলে ভোটে যাব না’ সুর বেজে উঠছে। একেক দল একেক দাবিতে ভোট বর্জনের হুমকি দিয়ে চলেছে। কেউ পিআর প্রশ্নে, কেউ প্রতীক প্রশ্নে। সেই সঙ্গে আছে অন্য দলের সঙ্গে সম্পৃক্তদের, বিগত তিন নির্বাচন-সংশ্লিষ্টদের নির্বাচন থেকে শতহস্ত দূরে রাখার দাবি। দাবি আগে গণভোটের; পাল্টা দাবি সংসদের সঙ্গে একত্রে গণভোট। আস্থাহীনতা ফুটে উঠেছে খোদ উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে; নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধেও। দাবি উঠছে– এই আমলাদের দিয়ে, এই পুলিশ দিয়ে ভোট হবে না। বিতর্কিত করা হচ্ছে সেনাবাহিনীকে। এখন একে বাদ দিয়ে তাকে রেখে নির্বাচন করতে চাইলে ভোটকর্মী ও নিরাপত্তায় পাহারার জন্য না শেষে জনবল আমদানি করতে হয় বিদেশ থেকে, যেমনটা গত শতকের শেষ দশকে করতে হয়েছিল কম্বোডিয়া ও পূর্ব তিমুরকে। তাহলে আমাদের রাজনীতির কফিনে গেঁথে যাবে সর্বশেষ পেরেক। এসব ফাঁড়া কাটিয়ে যদি ভোট হয়ও এবং আশা করছি হবেই, তবুও কোনো কোনো দলকে নির্বাচন থেকে নির্বাসন দেওয়াটা কি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মান্যতা পাবে?

আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী: কলাম লেখক; অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব

আরও পড়ুন

×