গণঅভ্যুত্থানেও কেন স্বৈরতন্ত্র শেষ হয় না
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:২৮ | আপডেট: ০১ নভেম্বর ২০২৫ | ১০:৪৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
ঊনবিংশ শতাব্দীতে জন স্টুয়ার্ট মিল নারী স্বাধীনতা বিষয়ে যে মত প্রকাশ করেছিলেন, সেটি ছিল উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিরই নির্ভরযোগ্য প্রকাশ। তাঁর মতে, নারী স্বাধীনতার অর্থ হলো মেয়েদেরকে আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার দেওয়া এবং তাদের জন্য এমন স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, যাতে কীভাবে তারা নিজেদের জীবনকে পরিচালিত করবে, নিজেরাই ঠিক করে নিতে পারে। পরবর্তীকালে নারীবাদীদের একাংশ এই উদারনৈতিক বক্তব্যকে আরও এগিয়ে নিয়ে গেছেন। কেউ বলেছেন, তারা পুরুষের মতো হবেন, কেউ এমনও বলেছেন, তারা পরিপূর্ণ স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। কিন্তু যে-ব্যবস্থায় পুরুষ নিজেও পরাধীন, সেখানে পুরুষের সমান হওয়া মানে বন্দির সমান হওয়া; আর এই যে যা ইচ্ছা তা-ই করবার অধিকার তাকে স্বাধীনতা বলে না, বলে নৈরাজ্যিক ব্যবস্থা, যাতে নারীর মুক্তি আসবে না। তা ছাড়া নারীমুক্তির ব্যাপারটা যে কেবল মধ্যবিত্তের জন্য জরুরি, তা তো নয়। জরুরি শ্রমজীবী শ্রেণির মেয়েদের জন্যও। নারীমুক্তির সংগ্রাম তাই পুরুষের বিরুদ্ধে পরিচালিত হবে না। পরিচালিত হবে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে; মার্ক্সবাদীরা যেটা বলে থাকেন। উদারনীতিকরা এ সত্যটা খেয়াল করেন না। কেননা, ব্যবস্থার পরিবর্তন যে তাদের স্বার্থকে বিপন্ন করবে– এই বোধ তাদের ভেতরে কোনো না কোনোভাবে সক্রিয় থাকে।
জটিল সমস্যার সহজ সমাধান হাল উদারনীতির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। এর কারণ ওই একই উদ্বেগ; পাছে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হয় যে, মৌলিক পরিববর্তন ছাড়া সমস্যাগুলোর সমাধান হবে না। উদারনীতির ভরসা আসলে সংশোধনের ভেতর সংরক্ষণের ওপর। উদারনীতির পক্ষে রক্ষণশীল না হয়ে উপায় নেই। আফগানিস্তানে আমেরিকানরা তালেবানকে নির্মূল করতে গিয়েছিল। সারাবিশ্বে বহু উদারনীতিক রয়েছেন, যারা মনে করেন যে ওটিই হচ্ছে সন্ত্রাসবাদ থেকে মুক্তির সঠিক পথ। বাংলাদেশেও মৌলবাদবিরোধী উদারনীতিক মানুষকে বলতে শুনেছি, কাজটা ঠিক হয়েছে। নইলে তালেবানরা বাংলাদেশেও বিপদ তৈরি করত। এই উদারনীতিকরা কতগুলো স্থূল সত্য দেখতে পান না। যেমন– সন্ত্রাস দিয়ে সন্ত্রাস নির্মূল করা সম্ভব নয়। তাতে বরঞ্চ উল্টো ফল হয়; সন্ত্রাস ক্রমাগত বাড়তেই থাকে। বোমা মেরে অনেক কিছুই গুঁড়িয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু মানুষের বিশ্বাস এমনই বজ্জাত যে, ঘা খেলে সে আরও শক্ত হয়।
সত্য এটাও যে, যাকে মৌলবাদ বলা হচ্ছে সেটা হলো এক ধরনের ফ্যাসিবাদ। ফ্যাসিবাদীরা গণতন্ত্র অপহরণের জন্য নানা অজুহাত ব্যবহার করে; কোথাও টেনে আনে উগ্র জাতীয়তাবাদকে, কোথাও আনে ধর্মকে। তা ছাড়া যারা সাম্রাজ্যবাদী তালে ছিল, তালেবানদেরকে কী করে ধ্বংস করবে? তালেবানদেরকে তো তারাই তৈরি করেছে, আফগানিস্তানে সোভিয়েট ইউনিয়নের আধিপত্য নস্যাৎ করার জন্য। স্বার্থের দ্বন্দ্বে তখনকার ভৃত্য এখন প্রভুকে আর মানেনি; প্রভুকে বিতাড়িত করে তালেবানি জঙ্গি শাসনের কবলে আফগানিস্তানে গণতন্ত্রকামী এবং নারীরা এখন বন্দিত্ব জীবন অতিবাহিত করছে।

এই বাস্তবতাকেও স্মরণে রাখতে হবে যে, মৌলবাদ জিনিসটা পুঁজিবাদেরই অবদান। ভারতবর্ষে যেমন সম্প্রদায় আগেও ছিল, কিন্তু ব্রিটিশ আসার আগে সাম্প্রদায়িকতা ছিল না। বিশ্বে তেমনি ধর্ম আগেও ছিল, কিন্তু এখন যাকে মৌলবাদ বলা হচ্ছে তা ছিল না। তৈরি হয়েছে বিশেষভাবে পুঁজিবাদের কারণেই। পুঁজিবাদ সমাজে যে অর্থনৈতিক দৈন্য, যন্ত্রণা ও ক্ষোভের সৃষ্টি করে তার প্রকাশের জন্য পথ আছে দুটি; একটি গণতান্ত্রিক অপরটি ধর্মীয় মৌলবাদী। প্রকৃত গণতান্ত্রিক পথ যেটি সেটি সমাজতান্ত্রিকও বটে। ওই পথে মানুষের বিক্ষোভ প্রকাশ পাবে, রাষ্ট্রক্ষমতায় যে অগণতান্ত্রিক শক্তি প্রতিষ্ঠিত রয়েছে, তারা সেটা সেখানে থাকতে দেবে না। সমাজতন্ত্রীরা হচ্ছে প্রতিক্রিয়াশীলদের আসল শত্রু। বিক্ষোভ প্রকাশের ওই পথ রুদ্ধ করে দেওয়ার ফলে বঞ্চিত মানুষের ক্ষুব্ধ অনুভূতি প্রকাশ পায় ধর্মান্ধ মৌলবাদী পথে। শাসক শ্রেণি নিজেরাও উৎসাহিত করে এই পথযাত্রাকে। জনরোষকে প্রশমিত করার জন্য তারা ধর্মের প্রতি মানুষের আকর্ষণকে বাড়িয়ে দেয়। গণমাধ্যমে ধর্মীয় ধ্যান-ধারণার প্রচার, ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা– এসব কাজ করতে থাকে, যা আমাদের দেশে প্রবলভাবে দৃশ্যমান।
উদারনীতির আরেক বৈশিষ্ট্য হলো আশাবাদ। দেখা যাক কী হয় থেকে শুরু করে সব ঠিক হয়ে যাবে পর্যন্ত এই আশাবাদের পরিধিটা বিস্তৃত। শেখ মুজিবুর রহমানকে আমরা দেখেছি তাঁর দলের ওপর আস্থা রাখছেন এই ভরসায় যে, দীর্ঘকাল সংগ্রাম করার দরুন তারা অন্যায় করা থেকে বিরত থাকবে। বাস্তবতা কিন্তু তাঁর ওই আশাবাদকে সমর্থন করেনি; বরঞ্চ নিষ্ঠুরভাবে ব্যঙ্গ করেছে। একজন সাবেক সমাজতন্ত্রী, যিনি একাধিকবার মস্কো ঘুরে এসেছেন, তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরও আশা হারাননি বলে পত্রিকায় প্রবন্ধ লিখে জানিয়েছেন, তাঁর আশা ছিল যে একক বিশ্বের দায়িত্ব পেয়ে যুক্তরাষ্ট্র সজাগ হয়ে উঠবে এবং ওই দায়িত্বভার যথাযথরূপে পালন করবে। বোঝা গেল তিনি সাম্রাজ্যবাদ যে কী বস্তু তা তখন অনুধাবন করেননি, যদিও পরে, ওই প্রবন্ধ যখন লিখছেন তখন আক্ষেপের সঙ্গে হৃদয়ঙ্গম করতে বাধ্য হয়েছেন বলে নিজেই উল্লেখ করেছেন, হায়! একচ্ছত্র হয়ে মার্কিনিরা দৌরাত্ম্যের মাত্রা আগের তুলনায় বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
পুঁজিবাদ যে মানুষকে বিচ্ছিন্ন ও উৎপাটিত করে; সে যে সমস্ত কিছুকে পণ্যে পরিণত করতে চায়– উদারনীতিকরা এই বিষয়ে সচেতন। যে জন্য পুঁজিবাদের সঙ্গে তাদের একটা দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। কিন্তু তাদের আরও বড় ভয় হচ্ছে সমাজবিপ্লবকে। যে জন্য তারা জনগণকে সচেতন করতে চায় না; পারলে দূরে সরিয়ে রাখে। কিন্তু পুঁজিবাদ তো আর পুঁজিবাদের বিকল্প হতে পারে না। যে জন্য আমরা দেখি যে সাম্রাজ্যবাদ-পীড়িত দেশগুলোতে অভিমান-অহংকার, আহত আত্মসম্মানবোধ এবং আত্মপরিচয়ের অন্বেষণে উদারনীতিকেরা পিছু হটে, হটে গিয়ে এমনকি মৌলবাদের কাছেও চলে যায়।
উভয় পক্ষই পুঁজিবাদের রক্ষক; উভয়েই ব্যক্তিগত সম্পত্তির পবিত্রতায় বিশ্বাস করে এবং সমাজতন্ত্রীদেরকে শয়তানের চেলা হিসেবে দেখে। এরা কেউই গণতন্ত্রে আস্থা রাখে না, উভয়েই স্বৈরতন্ত্রী। ফলে গণঅভ্যুত্থানের পর গণঅভ্যুত্থান হলেও স্বৈরতন্ত্র শেষ হয় না।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
