তরুণ তুর্কি মামদানির নিউইয়র্ক জয়ের বার্তা
জোহরান মামদানি
অনি আতিকুর রহমান
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৫ | ২২:৫৯
নিউইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচনে ৫১ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জোহরান মামদানি। নিউইয়র্কের প্রথম মুসলিম মেয়র হন মামদানি, যিনি শতাব্দীর সর্বকনিষ্ঠের রেকর্ডও ভাঙেন। মার্কিন রাজনীতির এই তরুণ তুর্কির জয় অবশ্য প্রত্যাশিতই ছিল। মামদানি যখন প্রচারণার মাঠে তখনই তাঁকে নিয়ে ভোটার থেকে শুরু করে মিডিয়ার আগ্রহ-উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। নিউইয়র্ক বা মার্কিন মুল্লুক ছাড়িয়ে তিনি পৌঁছে যান বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছে। বাংলাদেশেও তার ঢেউ পড়ে ব্যাপকভাবে। শিরোনাম ছিলেন বিভিন্ন ভাষার গণমাধ্যমেরও। প্রশ্ন হলো- ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান হেভিওয়েট প্রার্থী এবং অভিজ্ঞ স্বতন্ত্র প্রার্থীকে কীভাবে পরাজিত করলেন তরুণ জোহরান? কোন ক্যারিশমায় ভোটারদের আকৃষ্ট করেছেন সবচেয়ে বেশি?
মূলত মামদানির নির্বাচনী ইশতেহার ও প্রচারণার মাঠে প্রাণবন্ত উপস্থিতির কাছেই হেরে গেছেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা। মামদানি তার নির্বাচনী প্রচারণায় বাড়ি ভাড়া, পরিবহন, শিশুস্বাস্থ্য এবং নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষদের নিয়ে কথা বলেছেন। ব্যয়বহুল নিউইয়র্কে সাধারণদের জীবনমান সহজ করার কথা বলেছেন। নগরবাসী তার এই নির্বাচনী অঙ্গীকার বিশ্বাস করতে পেরেছে। মামদানি যেই শহরের মেয়র নির্বাচিত হলেন; সেখানে বিরাট সংখ্যক অভিবাসীর বাস। মামদানি নিজেও অভিবাসী। ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী কড়াকড়ি মধ্যেই প্রচারণার সময় হয়ে উঠেছিলেন অভিবাসীদের কণ্ঠস্বর। ভোটও টানতে পেরেছেন স্রোতের গতিতে।
মামদানির নির্বাচনী প্রচার ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও বৈচিত্র্যময়। অভিবাসীদের মাতৃভাষায় ক্যাম্পেইন করে ভালোবাসা অর্জন করেন। উর্দু ও হিন্দির পাশাপাশি বাংলা ভাষাও ছিল এই তালিকায়। জয় নিশ্চিতের পর দৃঢ় কণ্ঠে আবারও জানান দিয়েছেন সেই কথা। মামদানি বলেছেন- 'নিউ ইয়র্ক অভিবাসীদের শহর হিসেবেই থাকবে। এটি অভিবাসীদের দ্বারা নির্মিত এবং তাদের দ্বারা পরিচালিত শহর। আর আজ রাত থেকে, এই শহর একজন অভিবাসীর নেতৃত্বে।'
রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা ব্যক্তিগত ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট আদর্শের বাইরেও সাধারণ কতকগুলো গুণ মামদানিকে এবারের নির্বাচনে আকর্ষণীয় প্রার্থী করে তুলেছিল। ফলে দলীয় ভোটব্যাংক তো বটেই ভাসমান ভোটাররা তাঁকে সহজেই গ্রহণ করতে পেরেছে।
সুদর্শন নায়কোচিত চেহারা, আত্মবিশ্বাসী বাগ্মিতা, প্রাণখোলা হাসির মিলেনিয়াল প্রজন্মের জোহরানকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়নি ভোটারদের। প্রগতিশীল চিন্তাধারার বিশ্বাসী হলেও নিজের ধর্মীয় পরিচয় গর্বের সঙ্গে ভোটারদের কাছে তুলে ধরেন জোহরান। এছাড়া গাজা ইস্যুতে বরাবরই ছিলেন সরব। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তারের পক্ষেও সোচ্চার হয়েছিলেন। ফলে ভোটারদের মনে ইসরায়েল-গাজা যুদ্ধের বিষয়ে প্রার্থীদের অবস্থানের দিকটিও কাজ করেছে। এই সমর্থনও মামদানি নিজের ঝুলিতে ভরেছেন। অন্যদিকে, তার প্রতিদ্বন্দ্বী কুওমো ইসরায়েলের কট্টর সমর্থক।
এই নির্বাচনে জোহরানের লড়াইটা ছিল মূলত ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গেই। জোহরানকে হারাতে বহু শক্তিক্ষয় করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। কিন্তু সফল হননি। বিজয়ী ভাষণে তাই ডোনাল্ড ট্রাম্পকে খোঁচাও দিয়েছেন। বলেন, 'আমাদের কাউকে পেতে হলে, আপনাকে আমাদের সবার মধ্য দিয়েই যেতে হবে।'
মাত্র ৩৪ বছর বয়স। আফ্রিকার উগান্ডায় জন্ম নেওয়া দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত মামদানিকে কয়েক মাস আগেও তেমন কেউ চিনতেন না। ডেমোক্র্যাটদের হয়ে মেয়র নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দেওয়ার পর পান বিশ্বজোড়া পরিচিতি। আর নির্বাচিত হয়ে উলটপালট করে দিলেন নিউইয়র্কের রাজনীতির রেকর্ডবুক। প্রথম মুসলিম মেয়র, শতবছরের সর্বকনিষ্ঠ মেয়র, প্রথম দক্ষিণ এশিয়ার বংশোদ্ভূত মেয়র এসবই এখন তাঁর দখলে।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ঐতিহ্যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর নিউ ইয়র্ক সিটি মেয়র নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে মনে করা হয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নীতি ও বক্তব্যের কারণে এবারের নির্বাচন আরো বাড়তি আলোচনার খোরাক জুগিয়েছে। প্রশাসনিক তেমন অভিজ্ঞতাও নেই মামদানির। এছাড়া প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অসহযোগিতা মোকাবেলা করতে হবে। নিজের যে নির্বাচনী ইশতেহার তাকেও উচ্চাভিলাষী বলেছেন স্থানীয় বিশ্লেষকরা।
ফলে ভোটের দিন হেসেখেলে জিতে গেলেও ইশতেহার বাস্তবায়নে কঠিন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে মামদানির জন্য। কীভাবে তিনি সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারেন সেটাই এবার দেখার পালা।
অনি আতিকুর রহমান: লেখক ও সাংবাদিক
[email protected]
- বিষয় :
- জোহরান মামদানি
- নিউইয়র্ক
- মেয়র
- মুসলিম
