আদিবাসী হত্যা
সাঁওতালদের জমি ফিরে পাবার আইনসম্মত দাবি
শামসুল হুদা
শামসুল হুদা
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:২৫ | আপডেট: ০৬ নভেম্বর ২০২৫ | ১৪:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জে নিরীহ তিন সাঁওতাল আদিবাসী ভূমি অধিকার আন্দোলনের কর্মীকে পুলিশ প্রকাশ্যে সহস্রাধিক প্রতিবাদী সাঁওতাল-বাঙালি জনগোষ্ঠীর সামনে গুলি করে হত্যা করেছিল। পাশাপাশি চলছিল সাঁওতালদের বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে ভস্ম করে দেওয়ার এক বীভৎস তাণ্ডব। এই ধ্বংসযজ্ঞে ওই এলাকার তৎকালীন জাতীয় সংসদ সদস্য ও ইউপি চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠতম অনুচর দুর্বৃত্তরাই অংশ নিয়েছিল। গুলিতে তিন আদিবাসী শ্যামল হেমব্রম, মঙ্গল মার্ডি ও রমেশ টুডু নিহত এবং আহত হয়েছিলেন ১৫-২০ জন।
আদিবাসী সাঁওতালদের অপরাধ ছিল, তারা তাদের কৃষিজমিতে আইনসম্মত স্বীকৃতির দাবি জানিয়েছিলেন। যে জমিতে তারা আইনি স্বত্ব চেয়েছিলেন তা আসলে সাঁওতাল জাতিগোষ্ঠীর এবং কিছু বাঙালি পরিবারের পূর্বপুরুষদের মালিকানায় ছিল। ১৯৫৬ সালে ওই এলাকায় রংপুর চিনিকল নামে একটি শিল্প কারখানা প্রতিষ্ঠার অজুহাতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার তাদের উর্বর কৃষিজমি পূর্ব পাকিস্তান ভূমি রিকুইজিশন আইনের ক্ষমতাবলে দখল নিয়ে নেয়। ১৯৬২ সালে রিকুইজিশন করা জমির মালিকদের সঙ্গে তৎকালীন সরকার তথা প্রশাসনের এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির একটি শর্তে বলা হয়েছিল, যেহেতু চুক্তিভুক্ত ১৮৪২ একর জমি চিনিকলের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত আখ উৎপাদনের উদ্দেশ্যে রিকুইজিশন করা হয়েছিল, সেহেতু যদি কখনও ওই জমি আখ চাষে ব্যবহার করা বন্ধ হয়, তাহলে তা পূর্বতন মালিক বা তাদের উত্তরাধিকারীদের ফিরিয়ে দেওয়া হবে।
রংপুর চিনিকলটি ২০০৪ সালে চিনি উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। অন্য অনেক চিনিকলের মতো এটিও বছরের পর বছর লোকসানি শিল্প প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল। চিনিকল কর্তৃপক্ষের অদক্ষতা, অসততা এবং নানামুখী প্রতারণার অনেক দৃষ্টান্ত দৃশ্যমান হয়ে উঠেছিল।
যা হোক, ওই জমি আখ চাষ ব্যতীত অন্য কাজে ব্যবহার করার বিষয়ে চুক্তিতে বিধি-নিষেধ স্পষ্ট ভাষায় উল্লিখিত ছিল। কিন্তু চিনিকল বন্ধ হওয়ার পর কর্তৃপক্ষ এই জমি বেআইনিভাবে কিছু স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীকে লিজ দেওয়া শুরু করে। একই সঙ্গে তারা বর্গায় ধানের চাষসহ সবজির আবাদ ইত্যাদি করে লাভবান হওয়া কিংবা বিশেষ একটি গোষ্ঠীকে সম্পদশালী করার পথে ধাবিত হয়। অথচ তাদের এই লিজ নেওয়া এবং চিনিকল কর্তৃপক্ষের লিজ দেওয়ার এখতিয়ার বিধিসম্মত ছিল না; আইনের অনুমোদন তো ছিলই না।
এই পরিপ্রেক্ষিতে সাঁওতাল আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কৃষক এবং তাদের সহযাত্রী বাঙালি, যাদের পূর্বপুরুষ এ জমির মালিক ছিলেন– ২০০৪ সাল থেকে বন্ধ রংপুর চিনিকলের নামে ১৯৫৬ সালে রিকুইজিশন করা জমি চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তাদের কাছে কৃষি আবাদের জন্য ফেরত দেওয়ার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। তারা ওই জমির চারপাশে অস্থায়ী ঘর বানিয়ে বসবাস শুরু করেন; একই সঙ্গে জমিতে ধান আবাদ করতে থাকেন। তারা যত্ন করে আবাদ করায় ১৮৪২ একর জমিতে ধান ও বিভিন্ন সবজির চাষ হতে থাকে। ফলে ওই ভূমি তিন-চার ফসলি জমিতে রূপান্তরিত হয়। মাঝখানে কয়েকটি পুকুর থাকায় সেখানে মাছের চাষও চলে।
পাশাপাশি জেলা প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপির মাধ্যমে তারা ওই জমি বৈধভাবে তাদেরকে হস্তান্তরের আবেদন জানান। কয়েক দফা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে বিষয়টি নিষ্পত্তির চেষ্টাও করা হয়। কিন্তু প্রভাবশালী একটি মহল বৈধভাবে সাঁওতালদের কাছে এই জমি প্রশাসনের হস্তান্তরের সুযোগ থাকলেও তা যেন কার্যকর না হয়, তার জন্য চিনিকলের ম্যানেজার এবং অন্যান্য স্বার্থান্বেষীর প্ররোচনায় নানা গুজব ছড়িয়ে প্রশাসনের কান ভারি করতে থাকে। অন্যদিকে স্থানীয় এমপি আবুল কালাম আজাদ প্রকাশ্যে সাঁওতালদের আন্দোলনকে সমর্থন জানালেও আড়ালে চক্রান্তকারীদের সঙ্গে মিলে তাদের উচ্ছেদের পরিকল্পনা করেন বলে সাঁওতালদের অভিযোগ।
এরই ফলে ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতাল উচ্ছেদ অভিযান চলে। তারা এই হামলা নীরবে মেনে নেননি। প্রথমে তারা নিজেদের সাংগঠনিক ঐক্য ও মনের জোরে তীর-ধনুক নিয়ে আত্মরক্ষায় প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। কিন্তু হামলাকারীরা সশস্ত্র ও সংঘবদ্ধ থাকায় তাদের প্রতিরোধ তেমন কাজে আসেনি। পুলিশ একসময় সাঁওতালদের প্রতিরোধ নস্যাৎ করতে নির্বিচারে গুলি বর্ষণ শুরু করে। এর ফলে তিনজন সাঁওতাল আদিবাসী নেতা ওই দিনই নিহত হন। সাঁওতালদের বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার ফলে সাঁওতাল নারী-শিশুসহ কয়েকশ পরিবার কয়েক দিন খোলা জায়গায় দিনযাপন করেছে। পরে তারা খড়, বাঁশ বা অন্যান্য সামগ্রী দিয়ে অস্থায়ী ঘর তুলে বসবাস করতে থাকে। এখনও তারা সেভাবেই মানবেতর জীবনযাপনের এক করুণ ইতিহাস রচনা করে চলেছেন। এ ঘটনার সচিত্র প্রতিবেদন তৎকালীন সংবাদমাধ্যমে আংশিক প্রচারিত হলেও পুরো ঘটনার বিবরণ সরকারি চাপে প্রকাশ হয়নি। তবে কাতারভিত্তিক আলজাজিরায় সচিত্র প্রতিবেদনে সেই সত্য উঠে এসেছিল।

এই অমানবিক পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় পুলিশের নির্মম আচরণ ও অগ্নিসংযোগের মতো অপরাধে সম্পৃক্ত হওয়ার প্রতিবাদে দেশের নাগরিক সমাজ এবং ওই অঞ্চলের সাধারণ মানুষ তীব্র প্রতিবাদ জানায়। ঘটনার পরপরই নাগরিক সমাজের নেতা, মানবাধিকারকর্মী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী ঢাকা, রাজশাহী, দিনাজপুর প্রভৃতি জেলা থেকে ওই এলাকায় গিয়ে কী ঘটেছিল, তা জানতে চেষ্টা করেন এবং পরে দেশবাসীকে জানান। নিহত, আহত সাঁওতাল পরিবারের পাশে এভাবে তারা দাঁড়িয়েছিলেন। দেশের তিনটি মানবাধিকার ও ভূমি অধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র, এএলআরডি ও ব্রতী এ ঘটনায় রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার দায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে একটি রিট আবেদন দাখিল করে (রিট পিটিশন নম্বর: ১৪৪০২/২০১৬)।
এই রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন হাইকের্টের বিশেষ বেঞ্চের দুই বিচারপতি কয়েকটি নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সেই নির্দেশনার মধ্যে ছিল– সাঁওতালদের রক্ষার জন্য সরকার যেন যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেয় এবং তাদের উৎপাদিত ফসল যেন সাঁওতালদের ঘরে পৌঁছে দেয়। সেই সঙ্গে রুল জারি করে সরকারের এই নিষ্ক্রিয়তাকে কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না– কারণ দর্শাতে বলা হয়। শুনানির বিভিন্ন পর্যায়ে হাইকোর্ট গাইবান্ধার দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারকে আদালতে ডেকে পাঠান এবং আদালতে তারা তাদের ব্যর্থতার জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন। পরে হাইকোর্ট পুলিশ সুপারসহ ওই দিন দায়িত্বপ্রাপ্ত ৮২ জন পুলিশ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে একসঙ্গে ওই এলাকা থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন এবং সাঁওতালদের বাড়িতে আগুন লাগানোর ঘটনায় জড়িত দুই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
এ ঘটনার পর থেকে পৈতৃক সম্পত্তি ফেরত পাওয়ার দাবিতে এখন পর্যন্ত সাঁওতাল ও স্থানীয় বাঙালিরা আন্দোলন করে যাচ্ছেন। তৎকালীন সরকার যেমন তাদের যৌক্তিক দাবি উপেক্ষা করে তাদেরকে নির্যাতন করেছিল, এখনও প্রশাসন তাদের সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণ করছে। কখনও তারা বলে, এখানে ইপিজেড করা হবে; কখনও অন্য প্রকল্প করা হবে– এ যুক্তিতে তাদের উচ্ছেদের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। তারা গোবিন্দগঞ্জ থানায় যে হত্যা মামলা করেছিল, ৯ বছর পেরিয়ে গেলেও তার চার্জশিট এখনও হয়নি। এখনও নিহত ও আহতদের স্বজনরা তাকিয়ে আছেন বৈষম্য বিলোপের ঘোষণা দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা অন্তর্বর্তী সরকারের দিকে। তারা বিশ্বাস করেন, অন্তর্বর্তী সরকার তাদের যৌক্তিক দাবি মেনে পৈতৃক সম্পত্তি তাদের বুঝিয়ে দেবে। তাতে হয়তো শ্যামল হেমব্রম, মঙ্গল মার্ডি ও রমেশ টুডুর বিদেহী আত্মা কিছুটা হলেও শান্তি পাবে।
শামসুল হুদা: মানবাধিকারকর্মী; নির্বাহী পরিচালক, এএলআরডি
- বিষয় :
- শামসুল হুদা
- সাঁওতাল
- উপজাতি
