সমকালীন প্রসঙ্গ
শিক্ষকদের কান্না বুঝতে কাঁদানে গ্যাস লাগে?
১০ম গ্রেডে বেতনসহ তিন দাবিতে শহীদ মিনারে প্রাথমিক শিক্ষকদের অবস্থান কর্মসূচি। ফাইল ছবি
সাইফুর রহমান তপন
প্রকাশ: ০৯ নভেম্বর ২০২৫ | ১৮:৩৫
আবারও রাজধানীতে লাঠি, কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড নিয়ে শিক্ষকদের ওপর চড়াও হলো পুলিশ। এবার ভুক্তভোগী হলেন সরকারি প্রাথমিক শিক্ষকরা। বেতন গ্রেড বাড়ানোসহ তিন দফা দাবিতে আন্দোলন করছেন তারা। গত শনিবার সকাল থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন সহকারী শিক্ষকরা। শনিবার বিকেলে শাহবাগ থেকে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনা অভিমুখে পদযাত্রা কর্মসূচি ছিল তাদের। সেখানেই বুলেট ছাড়া আর সব হাতিয়ার নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে পুলিশ। শিক্ষকরা অভিযোগ করেছেন, পুলিশি হামলায় অনেক শিক্ষক-শিক্ষিকা আহত হয়েছেন, পাঁচজন শিক্ষককে শাহবাগ থানায় আটক করে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে পুলিশ বলছে, শিক্ষকরা বাধা উপেক্ষা করে যমুনার দিকে এগোতে চাইলে তাদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ সদস্যরা পদক্ষেপ নেন।
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর গত ১৪ মাসে বিভিন্ন স্তরের শিক্ষক-কর্মচারীরা তাদের দীর্ঘদিনের দাবি আদায়ে সারাদেশ থেকে ঢাকায় এসেছেন কয়েক দফায়। প্রতিবার প্রতিটি পর্যায়ের শিক্ষকরা পুলিশি হামলার মুখোমুখি হয়েছেন। কিছুদিন আগে এসেছিলেন মাধ্যমিক পর্যায়ের বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীরা তাদের বাড়িভাড়া-ভাতা বৃদ্ধির দাবি নিয়ে। শেষ পর্যন্ত সফল হলেও তাদেরও মুখোমুখি হতে হয়েছে হামলা, রাবার বুলেট, জলকামান, টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ ও পুলিশের লাঠিচার্জের।
শিক্ষকরা পেশাজীবী; উপরন্তু শিক্ষার্থীদের আদব-কায়দা, ভদ্রতা-নম্রতা শেখানোর গুরুদায়িত্ব তাদের কাঁধে। ফলে ধারাবাহিক অভাব-অনটন-বঞ্চনার কারণে রাগ-ক্ষোভ জন্ম নিলেও উগ্র বা উচ্ছৃঙ্খল হতে পারেন না তারা। সেই নিরীহ শিক্ষকদেরই বিরুদ্ধে পুলিশকে নামিয়ে দিল সরকার।
বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা জাতীয় বেতন স্কেলের ১৩তম গ্রেডে বেতন পান। তা দশম গ্রেডে করার দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন শিক্ষকরা। তাদের অন্য দুটি দাবি হলো– শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতি এবং চাকরির ১০ ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড দেওয়া। প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদের নেতা আবুল কাশেম সমকালকে বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে আমরা দশম গ্রেডের দাবি জানিয়ে আসছি। পরে সরকার ১১তম গ্রেডের আশ্বাস দিলেও বাস্তবায়ন করেনি। তাই বাধ্য হয়েই আবার আন্দোলন করছি। প্রসঙ্গত, একই দাবিতে মে মাসে তারা টানা কয়েক ধাপে কর্মবিরতি পালন করেছিলেন। সরকারের আশ্বাসে আন্দোলন স্থগিত করে তখন তারা শ্রেণিকক্ষে ফেরেন, তবে সেই আশ্বাস বাস্তবায়িত হয়নি।
এদিকে রোববার থেকেই অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু করেছেন সারাদেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনড় অবস্থান নিয়েছেন তারা। পূর্বঘোষণা অনুযায়ী ১৫ নভেম্বর থেকে কর্মবিরতিতে যাওয়ার কথা জানালেও শনিবার (৮ নভেম্বর) ঢাকায় অবস্থান কর্মসূচিতে পুলিশের হামলার প্রতিবাদে তারা রোববার থেকেই কর্মবিরতি শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এই কর্মসূচি চলবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষক নেতারা। ফলে দেশের সাড়ে ৬৫ হাজারেরও বেশি বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ হয়ে পড়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রায় এক কোটি শিশু শিক্ষার্থী। অল্প ক’দিন পরই বার্ষিক পরীক্ষা, পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি আছে বৃত্তি পরীক্ষা। স্বাভাবিকভাবেই এ পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের অভিভাবকদেরও উদ্বেগের শেষ নেই।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার বলেছেন, সহকারী শিক্ষকের সংখ্যা অনেক বেশি। একবারে তাদের ১৩ থেকে দশম গ্রেডে উন্নীত করা বাস্তবসম্মত নয়। আমরা ১১তম গ্রেডে উন্নীত করার বিষয়ে কাজ করছি। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান সমকালকে জানান, সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেডে উন্নীত করার জন্য আমরা ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠিয়েছি। অনুমোদন পেলে তা কার্যকর হবে।
উপদেষ্টা ও মহাপরিচালকের কথা সত্য হলে প্রাথমিক শিক্ষকদের দাবি পূরণে সরকারের অনিচ্ছা নেই। কিন্তু মে মাসে এ ব্যাপারে আশ্বাস দেওয়ার পর চার মাসেরও বেশি সময় চলে গেছে। কতদিন লাগে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতি জানতে? ইচ্ছার সাথে আন্তরিকতা মিশলে এক-দুই সপ্তাহেই তা সম্ভব। তবে সেখানে যে ঘাটতি আছে স্বৈরাচারী কায়দায় আন্দোলনকারীদের দমন-পীড়নের চেষ্টা সেটাই ইঙ্গিত করে।
সকল স্তরের শিক্ষকদের জন্য সম্মানজনক স্বতন্ত্র বেতন স্কেল কেন দরকার– এ নিয়ে আলোচনা দীর্ঘদিনের। মানসম্মত শিক্ষার জন্য প্রথমেই প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষক, শোভন জীবনযাপনের ব্যবস্থা ছাড়া যা নিশ্চিত করা অসম্ভব। আর প্রাথমিক শিক্ষা যেহেতু সকল শিক্ষার ভিত্তি, সেহেতু প্রাথমিকে মানসম্মত শিক্ষকের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। কিন্তু সরকারি স্কেলে ত্রয়োদশ ধাপে রেখে, যা সরকারি অফিসের কেরানিকুলেরও নিচে, সে প্রয়োজন কস্মিনকালেও পূরণ সম্ভব নয়। অতএব আন্দোলনরত শিক্ষকদের দাবিগুলো খুব আহামরি কিছু নয়। অথচ এ শিক্ষকদের কান্না বুঝতেই সরকার কাঁদানে গ্যাস ছুড়ল।
প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা আজকে যে স্থবির হয়ে পড়েছে এবং শিক্ষার্থীদের ক্ষতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে অভিভাবক ও শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মধ্যে, তার মূল কারণ সাধারণভাবে শিক্ষা ও শিক্ষক এবং বিশেষত প্রাথমিক স্তরের শিক্ষকদের প্রতি সরকারের উদাসীনতা। তাই ওই ক্ষতির দায় সরকারকেই নিতে হবে। বিষয়টা সরকার যত দ্রুত বুঝবে এবং সে অনুসারে প্রাথমিক শিক্ষকদের ন্যায়সংগত দাবি মেনে তাদের বিদ্যালয়ে ফেরার ব্যবস্থা করবে ততই মঙ্গল।
সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল
- বিষয় :
- প্রাথমিক শিক্ষক
- শিক্ষক
- বেতন
- পুলিশের নির্যাতন
