আন্তর্জাতিক
নারীবিদ্বেষী রাজনীতিতে সুইডিশ গণতন্ত্র বিপাকে
মার্টিন জেলিন
প্রকাশ: ১১ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:১৫ | আপডেট: ১১ নভেম্বর ২০২৫ | ১২:০২
| প্রিন্ট সংস্করণ
আগামী বছর সুইডেনে নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এ উপলক্ষে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত প্রথম টিভি বিতর্কের কিছুক্ষণ পরই একটি চমকপ্রদ ঘোষণা আসে। সুইডিশ রাজনীতিতে উদার মধ্যপন্থার প্রতীক সেন্টার পার্টির নেত্রী আনা-কারিন হ্যাট অসহনীয় হুমকি ও হয়রানির কারণে পদত্যাগের ঘোষণা দেন।
হ্যাট সুইডিশ রাজনীতিতে একজন উদীয়মান কণ্ঠস্বর। কিন্তু মাত্র পাঁচ মাস সেন্টার পার্টির নেতৃত্ব দিতে পেরেছিলেন। এক বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, পরিবারের নিরাপত্তার জন্য চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। তাঁর বক্তৃতায় সুনির্দিষ্ট কিছু ছিল না, তবে স্পষ্ট শারীরিক হুমকির কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন, তিনি জনপরিসরে উদ্বিগ্ন থাকতেন এবং নিজের বাড়িতে আর নিরাপদ বোধ করছেন না।
হ্যাটের এই ঘোষণা আসে তাঁর পূর্বসূরি জনপ্রিয় অ্যানি লোফের দলীয় নেতৃত্ব থেকে পদত্যাগের মাত্র তিন বছর পর। চরমপন্থি ঘৃণা, নব্য নাৎসি হুমকি, অনলাইন ট্রল ও অফলাইনে আক্রমণকারীদের কারণে। ২০২২ সালে গটল্যান্ডে একটি রাজনৈতিক উৎসবে লোফ বক্তৃতা শুরু করতে যাচ্ছিলেন, এমন মুহূর্তে আরেক বক্তা রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ছুরিকাঘাতে নিহত হন। ওই হত্যার জন্য দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তি লোফকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন।
পদত্যাগকালে এক সাক্ষাৎকারে লোফ বলেছেন, শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়ে রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার পর তিনি বেশ স্বস্তি বোধ করছেন। জনপরিসরের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি যেভাবে কথা বলেছেন, তা একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক রাজনীতির পরিবেশ তুলে ধরে না; হাঙরের রাজ্যে সাঁতার কাটার মতো।
এখন আরেক উদারপন্থি নারীর অকাল বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে এখানে কী ঘটছে, তা আমাদের স্পষ্ট করে বলতে হবে। নারীদের জনপরিসর থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। অবাধ ঘৃণার চর্চা, অনলাইন ট্রল ও অতি ডানপন্থি চরমপন্থা এ কাজ করছে। বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী গণতন্ত্রে এটি নতুন করে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে।
হ্যাটের অভিজ্ঞতা একটি বিশ্বব্যাপী প্রবণতাই তুলে ধরে, যেখানে বাজে পুরুষরা জনজীবনে নারীদের ওপর তাদের ক্ষমতা জাহিরের চেষ্টা করে শারীরিকভাবে আঘাত কিংবা হত্যার হুমকি দিয়ে। ক্রমবর্ধমান ক্ষতিকর এবং অনিয়ন্ত্রিত সামাজিক মাধ্যম ও কর্তৃত্ববাদী অতি ডানপন্থি দলগুলোর উত্থানের ফলে চরমপন্থিদের সংখ্যালঘুর একটি অংশ ব্যাপকভাবে সংগঠিত হচ্ছে।
এই হুমকি ভয়াবহ রূপ নেওয়ার পরও সুইডিশ সরকারের রক্ষণশীল কর্তারা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসব উদ্বেগ উড়িয়ে দিয়েছে। সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী উল্ফ ক্রিস্টারসন নির্লিপ্তভাবে বলেছিলেন, হ্যাটের চামড়া আরও ‘মোটা’ হওয়া উচিত ছিল। বেশির ভাগ ডানপন্থি পণ্ডিত তাঁর সঙ্গেই তাল মিলিয়েছিলেন, যার অর্থ হ্যাট কেবল এই কাজের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না, বরং তাঁকে আরও কঠোর করার দায়িত্ব তাঁর ওপর।
যদি তাদের যুক্তি হয়, জনপরিসরে থাকতে গিয়ে মৃত্যুর হুমকি ও ধাওয়াকারীদের কাছে মূল্য দিতে হবে, তাহলে আমরা সম্ভবত অতি নগণ্যসংখ্যক লোককে এ তৎপরতায় পাব। আর যেসব সুইডিশ আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি, তারাই জনপরিসর এড়িয়ে চলেন। যেমন নারী, অভিবাসী ও সংখ্যালঘু। বিশ্বের সবচেয়ে উন্মুক্ত সমাজগুলোর মধ্যে সুইডেন একটি। আর গণতন্ত্রের জন্য এই অবস্থা চরম পশ্চাৎপদতাকেই তুলে ধরে। রাজনীতিতে নারীকে নিপীড়নের লক্ষ্যবস্তু করা একটি বিশ্বব্যাপী সমস্যা। ২০১৬ সালে ৩৯টি দেশের তথ্য পর্যালোচনা করে একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রতি পাঁচজন মহিলা সংসদ সদস্যের মধ্যে চারজন মানসিক সহিংসতার শিকার। প্রতিবেদন অনুসারে, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে যৌন অবমাননার শিকার ৬৫ শতাংশ; ‘তারপর মৃত্যু, ধর্ষণ, মারধর বা অপহরণের হুমকি এসেছে ৪৪ শতাংশ’।
২০১৯ সালে ফিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী হন সান্না মারিন, যিনি অন্য যে কোনো ফিনিশ রাজনীতিবিদের তুলনায় অনলাইনে বেশি নির্যাতনের শিকার হন। ন্যাটো স্ট্র্যাটকমের এক প্রতিবেদন অনুসারে, ফিনল্যান্ডের নারী মন্ত্রীরা পুরুষ মন্ত্রীদের তুলনায় সামাজিক মাধ্যমে প্রায় ১০ গুণ আপত্তিকর বার্তা পান।
অবশ্যই সুইডিশ রাজনীতিতে চরমপন্থা সম্পর্কে আশঙ্কা দূর করা সম্ভব। দেশটির অবস্থান স্থিতিশীল গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণে এর অবস্থান শীর্ষে, আর নারী-পুরুষের সমতার প্রতি অঙ্গীকারের কথা বলে। ঠিক এ কারণেই আরেক বিশিষ্ট সুইডিশ নারীকে জোর করে পদত্যাগ করানো বেশ উদ্বেগজনক। বিশ্বের সবচেয়ে স্থিতিশীল গণতন্ত্রগুলোর একটি হওয়া সত্ত্বেও চরমপন্থি সহিংসতার হুমকি রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে রূপান্তর ঘটাচ্ছে।
মার্টিন জেলিন: সুইডিশ সাংবাদিক ও লেখক; দ্য গার্ডিয়ান থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
- বিষয় :
- আন্তর্জাতিক
- সুইডেন
- নারী
- গণতন্ত্র
