ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

উচ্চারণের বিপরীতে

রাজনীতিতে শক্তি প্রদর্শনের সংস্কৃতি

রাজনীতিতে শক্তি প্রদর্শনের সংস্কৃতি
×

মাহবুব আজীজ

মাহবুব আজীজ

প্রকাশ: ১১ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:২২ | আপডেট: ১১ নভেম্বর ২০২৫ | ১০:৪০

| প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে আলোচনা কার্যত ব্যর্থ হবার পর সরকার রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে মতৈক্যে পৌঁছাতে সাত দিন সময় বেঁধে দিয়েছিল; সোমবার সেই সময়সীমা শেষ হয়েছে। ফেব্রুয়ারি থেকে টানা আট মাস আলোচনার পর সাত দিন সময়সীমা নির্ধারণে সরকারের এখতিয়ার নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ শনিবার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে সরকারকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘আপনারা কোনো নির্বাচিত সরকার নন– এটি আপনারা যেন সবসময় ইয়াদ (মনে) রাখেন। আপনাদের এ রকম কোনো এখতিয়ার নাই, আমাদের ডিকটেট (আদেশ) করার যে, সাত দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত না হলে আপনারা সিদ্ধান্ত নেবেন। এত শক্তি প্রদর্শন আপনাদের বোধহয় মানায় না’ (সমকাল, ৯ নভেম্বর, ২৫)।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বিপুল প্রাণ ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে এ দেশের মানুষ গণতন্ত্র ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে সুস্পষ্ট আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে। এর পরিণতিতে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু গত ১৫ মাসের পরিক্রমায় জাতি যখন জাতীয় নির্বাচনের জন্য অধীর অপেক্ষায়, তখনও এই প্রক্রিয়ার প্রধান কুশীলবদের শক্তি প্রদর্শনী প্রকট হয়ে উঠছে নানাভাবে।  

শক্তি প্রদর্শনী সবসময় পেশিশক্তির ব্যবহারই কেবল নয়; নিজের এখতিয়ার, অপরাপর অংশীজনের সঙ্গে সম্পর্কসহ নানা ইস্যুতে কোন পক্ষ কী ধরনের আচরণ করছে, তা থেকেও শনাক্ত করা সম্ভব। জুলাই সনদ জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার দলিল হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও এতে নানা বিভ্রান্তি রয়ে গেছে। পূর্বাপর শুধু কয়েকটি রাজনৈতিক দলকে সরকার যেভাবে গুরুত্ব দিয়েছে, তাতে জনসাধারণের উপস্থিতি ও অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে। সাংবিধানিক চর্চা সবসময়ই জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে হয়ে থাকে। সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রতিনিধিদের তর্ক-বিতর্কের মধ্য দিয়ে নীতি ও আইন প্রণয়নে জনগণের পরোক্ষ অংশগ্রহণ থাকে। জুলাই সনদ তৈরিতে জনগণের সেই সুযোগ ছিল না। অংশগ্রহণকারী দলগুলো কত শতাংশ  জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। সংবিধানের প্রধান স্তম্ভসমূহ অপসারণ প্রশ্নে বাম দলগুলোর অবস্থানকে গ্রাহ্যই করেনি সরকার; অন্যদিকে জাতীয় পার্টিকে আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত না করবার পক্ষেও যুক্তি দিতে পারেনি। 

সাধারণ মানুষের সঙ্গে ঐকমত্য কমিশনের চিন্তার পার্থক্যও সুস্পষ্ট। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রোববার ঠাকুরগাঁওতে বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসে ওপরতলার কিছু শিক্ষিত লোক ঘাড়ের ওপর গণভোট ও সনদের মতো বিষয় চাপিয়ে দিচ্ছে।’ এদিকে নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভীন হক বলেছেন, ‘জুলাই সনদের প্রক্রিয়া নারীবর্জিত’ (প্রথম আলো, ৯ নভেম্বর ২০২৫)। তাঁর অভিযোগ, ঐকমত্য কমিশন কেবল ছয়টি সংস্কার কমিশনের সঙ্গে বসেছে; নারী, স্বাস্থ্য, জনপ্রশাসনসহ বাকি পাঁচটি কমিশনের সঙ্গে বসেনি। 
জুলাই সনদ নিয়ে সরকার নিজের মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে চেয়েছে; যেখানে অপরাপর অংশীজনের চেয়ে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রাধান্য পেয়েছে। এতে দেশের রাজনীতিতে চিরবিভাজনের আভাস যেমন দেখা যাচ্ছে, তেমনি সমাজের নানা অংশীজন উপেক্ষিত হওয়ায় সামষ্টিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুপস্থিত থেকে যাচ্ছে। অতুল গৌরবের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে এটি সাংঘর্ষিক। 

২.
গ্রহণযোগ্য বিবেচিত ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে গড়ে ৪০ শতাংশ ভোট পাওয়া বিএনপি বড় দল নিঃসন্দেহে। কিন্তু সরকারের কোন বিবেচনায় জামায়াত বড় দল, তার যুক্তি মেলে না। এনসিপিকেও ভোটের মাঠে গুরুত্বপূর্ণ দল হিসেবে বিবেচনার বিষয়টি বাস্তবতার সঙ্গে কতখানি মেলে– তা ভবিষ্যৎ বলবে। তবে রাজনীতির মাঠে জামায়াত, এনসিপি তো বটেই, অন্য বেশ কয়েকটি দল শক্তি প্রদর্শন অব্যাহত রেখেছে। গণঅধিকার পরিষদ তো সম্ভব হলে জাতীয় পার্টিকে শুধু রাজনীতি নয়, দেশছাড়া করবারও হুঙ্কার দিয়ে রেখেছে। জামায়াতের নেতারা আচমকা নিম্নকক্ষে পিআর পদ্ধতি প্রবর্তনসহ নির্বাচনের আগে গণভোটের দাবিতে আরও সাত দলসহ আজ মঙ্গলবার মহাসমাবেশ ডেকে বসে আছে। দলটি কবে, কখন এই পদ্ধতির  প্রবক্তা হয়ে উঠল, বোঝা মুশকিল; অন্তত ৪৫ বছরের রাজনীতিতে তারা কখনও ‘পিআর’ শব্দটি উচ্চারণ করেনি। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বেরও বড় সময় ব্যয় হচ্ছে দলের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর অরাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনী বন্ধে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। এক রাউজানেই বিএনপির অন্তর্দ্বন্দ্বে নিয়মিত খুনের ঘটনা সারাদেশে শঙ্কা জাগিয়েছে।

আর কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ? গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত এই দলের নেতৃত্ব অপকর্মের জন্য অনুতপ্ত হওয়া দূরে থাক, সামাজিক মাধ্যমে হুঙ্কার ও অপপ্রচার চালাচ্ছেন। এই অবস্থান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দলটির ঐতিহ্য ও ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অনলাইনে শক্তি প্রদর্শনকারীদের অনেকেই বিদেশে বিলাসী জীবনযাপন করছেন। দেশের অগণিত কর্মীকে শঙ্কা ও অনিশ্চয়তায় ফেলে রেখে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে অহেতুক আস্ফালন এসব নেতার অমানবিকতা ও নিষ্ঠুরতার আরেক প্রমাণ। 

আওয়ামী লীগ ১৩ নভেম্বর সারাদেশে ‘লকডাউন’ ঘোষণা দিয়ে উত্তেজনা তো ছড়াচ্ছিলই; সোমবার এই নিবন্ধ লেখার সময় খবর এলো– রাজধানীতে অন্তত দুটি স্থানে চোরাগোপ্তা ককটেল বিস্ফোরণ হয়েছে। বাসে আগুনের খবরও জানা গেছে। দেখে নেব, খেয়ে নেব– বিগত ১৬ বছর আওয়ামী লীগের দুঃশাসনকালের নিয়মিত অনুষঙ্গ ছিল। এর থেকে বেরিয়ে আসবার কোনো লক্ষণ নেই দলটির নেতৃবৃন্দের। তাদের আরও আর্থিক কেলেঙ্কারির খবর সংবাদমাধ্যমে আসছে। রাজনীতি সত্যিই রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে অর্থ-বিত্ত-ক্ষমতা তৈরির সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। এখানে দলীয় আদর্শ বা অন্যায়-অপকর্মের জন্য যথাবিহিত শাস্তি আজকাল উপহাসের মতো শোনায়। 

৩.
রাজনীতিতে দুর্নীতি, পেশিশক্তি ও দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধেই চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে সারাদেশের মানুষের অভূতপূর্ব জাগরণ। গণঅভ্যুত্থান রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে যে অবারিত সুযোগ এনে দিয়েছিল, তা হেলায় হারানো উচিত হবে না। নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও রাজনীতিতে সংস্কারের যে প্রচেষ্টা সরকার নিয়েছে, তা সফল করবার দায়িত্ব এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী সবার। এই প্রক্রিয়া ব্যর্থ হলে একে অপরের ওপর দায় চাপিয়ে কেউই উদ্ধার পাবে না।

একযাত্রায় পৃথক ফল– নানা জোড়াতালির সময় পাড়ি দিচ্ছে অন্তর্বতী সরকার। নির্বাচনের জন্য যেখানে প্রয়োজন সব দলের জন্য সমতল মাঠ, নিরাপত্তার নিশ্ছিদ্র নিশ্চয়তা, মাঠ প্রশাসনের দক্ষতা– সেখানে প্রশাসনে অদলবদল নির্বাচনের তিন মাস আগেও শেষ হয় না। গত তিন নির্বাচনে সম্পৃক্ত প্রশাসনের সবাইকে বাদ দিতে গেলে শেষ পর্যন্ত না লোকই কম পড়ে যায়! সরকারি চাকুরেরা তো চাকরিই করেন। কর্তার ইচ্ছায় তাদের কর্ম। 

হুমকি-ধমকি, শারীরিক-মানসিক আক্রমণ-পীড়ন; ‘আপনি গত পনেরো বছর কী করেছেন’ কিংবা ‘স্বৈরাচারের পতনে আমি ছিলাম’ বলে ‘এখন আইন আমার জন্য নয়’– এসব অগণতান্ত্রিক আচরণ। কোনো রাজনৈতিক দল কর্মী-নেতাকে পেশিশক্তিতে উৎসাহ দিতে পারে না। শক্তি প্রদর্শন ও চর্চা আধুনিকতা ও মানবিকতার বিপক্ষে চলে যেতে বাধ্য; বরং যুক্তিবোধ ও নৈতিকতার চর্চাই সব অন্যায় থেকে রাজনৈতিক কর্মীদের দূরে রাখতে পারবে। দাতব্য গৃহ থেকে শুরু হয়– রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক আচরণ, যুক্তির চর্চা ও শিষ্টাচারের অনুশীলন সমাজে প্রভাব রাখবে। সরকার থেকে রাজনীতির সব অংশ যখন সহনশীল আচরণ নিশ্চিত করে যুক্তিবোধ ও সকলের মতামতকে সম্মান জানাতে পারবে, তখনই প্রকৃত গণতন্ত্রের সৌন্দর্য বিকশিত হতে শুরু করবে।

মাহবুব আজীজ: উপসম্পাদক, সমকাল; সাহিত্যিক
[email protected]

আরও পড়ুন

×