ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আইনশৃঙ্খলার অবনতি

সময়ে এক ফোঁড় দিতে হইবে

সময়ে এক ফোঁড় দিতে হইবে
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:১৫ | আপডেট: ১২ নভেম্বর ২০২৫ | ১২:২৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

সোমবার প্রকাশ্য দিবালোকে পুরান ঢাকায় যেইভাবে একজনকে গুলি করিয়া হত্যা করা হইয়াছে, তাহা ভয়ংকর চলচ্চিত্রের দৃশ্যকেও হার মানায়। সিসিটিভির ফুটেজ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়া সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, হত্যা মামলায় হাজিরা শেষে সোমবার পুরান ঢাকায় আদালত এলাকার বাহিরে দাঁড়াইয়া ছিলেন। এমন সময় তাঁহাকে দুই ব্যক্তি গুলি করেন। শুধু উহাই নহে, দুর্বৃত্তরা ভুক্তভোগীর মৃত্যু নিশ্চিত করিয়া নিরাপদে নিষ্ক্রান্ত হইতেও সক্ষম হন। এহেন হত্যাকাণ্ড আইনশৃঙ্খলা লইয়া পুরাতন উদ্বেগ নূতন করিয়া তুলিয়া ধরিয়াছে।

আমরা জানি, কিছুদিন ধরিয়া সম্ভাব্য সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং নাশকতা প্রতিরোধে রাজধানীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর তৎপরতা বৃদ্ধি করা হইয়াছে। সন্দেহভাজন অনেককে গ্রেপ্তারও করা হইয়াছে। এহেন কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যেই, এমনকি রিচারাঙ্গন সন্নিহিত অঞ্চলে উক্ত হত্যাকাণ্ড ঘটিল। এই নৃশংস ঘটনায় আবারও প্রমাণিত হইল– এই নগরে নাগরিকের জীবন অনিরাপদ। যদিও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম কার্যই হইবার কথা ছিল নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ। শুধু সোমবারের ঘটনাই নহে, গত ২০ মার্চ রাতে গুলশানে সুমন মিয়াকে, ৩১ মার্চ সাভারে মো. রুবেল নামে এক নিরাপত্তাকর্মীকে গুলি করিয়া হত্যা করা হয়। ২৫ মে রাতে বাড্ডার গুদারাঘাট এলাকায় গুলিতে নিহত হন বিএনপি নেতা কামরুল আহসান। ১৬ জুলাই রাতে মোহাম্মদপুরে এক ঘণ্টার ব্যবধানে দুই হত্যাকাণ্ড ঘটে। 

শুধু রাজধানী নহে, দেশের অন্যত্রও আইনশৃঙ্খলা লইয়া আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি বিরাজমান। গত বুধবার রাত্রে চট্টগ্রামে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর জনসংযোগে গুলির ঘটনায় একজন নিহত এবং প্রার্থীসহ দুইজন আহত হইয়াছেন। এই ঘটনাসহ গত এক মাসে চট্টগ্রামে গুলিতে দুই রাজনীতিকসহ তিনজন নিহত হইয়াছেন। আর গত বৎসর ৫ আগস্টের পর হইতে চট্টগ্রাম জেলায় খুন হইয়াছেন ৩৫ জন; তন্মধ্যে গুলিতে নিহত ২২ জন। একই সময়ে খুলনায় হত্যার শিকার ৪১ জন, যথায় গুলির ঘটনা ছিল ১৫টি। বগুড়ায় নিহত হইয়াছেন ৮৪ জন এবং দুইটি ছিল গুলির ঘটনা। কেবল হত্যাকাণ্ড নহে; ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজিসহ অন্যান্য অপরাধ সংঘটনেও অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহৃত হইতেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সংশ্লিষ্টরাই বলিতেছেন, এখনও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আগ্নেয়াস্ত্র অপরাধীদের হস্তগত। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পূর্বাপর থানায় হামলা, লুণ্ঠনসহ বিভিন্নভাবে অনেক অস্ত্র-গুলি সন্ত্রাসীদের হস্তগত হইয়াছে। খোদ কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, বিভিন্ন থানা হইতে লুটকৃত সহস্রাধিক অস্ত্র এখনও উদ্ধার করা যায় নাই। 

স্মরণ করা যাইতে পারে, গণঅভ্যুত্থানের অব্যবহিত পর শীর্ষ সন্ত্রাসীসহ বহু দুর্ধর্ষ অপরাধী বৈধ-অবৈধ প্রক্রিয়ায় কারাগার হইতে মুক্তি পাইয়াছিল। সোমবারের ঘটনায় সম্ভাব্য খুনিরূপে যাহাদের নাম আসিয়াছে, পুলিশেরই ভাষ্য, তাহাদের নেতৃত্ব দিতেছেন ঐ সময়ে কারাগারের বাহিরে আসা সন্ত্রাসী ইমন। এমন সংবাদ বিরল নহে যথায় বলা হইয়াছে, জেলমুক্ত হইয়া বহু শীর্ষ সন্ত্রাসী পুনরায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সংশ্লিষ্ট হইলেও পুলিশ তাহাদের অদ্যাবধি গ্রেপ্তার করিতে পারে নাই। তদুপরি এই পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বহু নূতন সন্ত্রাসী বাহিনীরও উদ্ভব ঘটিয়াছে, যাহারা চাঁদাবাজি-লুটপাটে বাধা পাইলেই গুলি ছুড়িতেছে। রাজশাহী-কুষ্টিয়া অঞ্চলের ডাকাত দল ‘কাকন বাহিনী’, খুলনার ‘হুমা বাহিনী’ ও ‘মুন্না বাহিনী’র তাণ্ডবের কথা আমরা কিছুদিন পূর্বে অত্র স্তম্ভেই আলোচনা করিয়াছি। কিন্তু অদ্যাবধি এই সকল সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গৃহীত হয় নাই। সামগ্রিক পরিস্থিতিতে আলোচ্য খুনের ঘটনাটি লইয়া বিস্ময়ের কিছু থাকে না।

স্মরণে রাখা জরুরি, এই পরিস্থিতি কেবল নাগরিকদের মধ্যে আতঙ্কই সৃষ্টি করিতেছে না; সরকারের ব্যর্থতার বোঝাকেও ভারী করিয়া তুলিতেছে। নির্বাচন সম্মুখে রাখিয়া এহেন অবস্থা আদৌ কাম্য নহে। অর্থনীতির স্বার্থেও এই ভয়ংকর পরিস্থিতির দ্রুত অবসান প্রয়োজন। তাই সরকার তাহার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মনোযোগী হইবে, ইহাই আমাদের প্রত্যাশা। সময়ে এক ফোঁড় না দিলে অসময়ে দশ ফোঁড় দিয়াও লাভ হইবে না।

আরও পড়ুন

×