রাজনীতি
অচলাবস্থা কাটবে কীভাবে
হাসান মামুন
হাসান মামুন
প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:২০ | আপডেট: ১২ নভেম্বর ২০২৫ | ১২:১৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে যে সংকট তৈরি হবে, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কার্যক্রম চলাকালে সাধারণভাবে চিন্তা করা যায়নি। সরকার আবার সেই সংকট দ্রুত নিরসনের দায়িত্ব চাপায় এ প্রশ্নে বিবদমান রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর। অথচ দায়িত্বটা ছিল খোদ জাতীয় ঐকমত্য কমিশন তথা অন্তর্বর্তী সরকারের। রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষত মাঠে থাকা প্রধান দল বিএনপি সংকট নিরসনের দায়িত্ববিষয়ক আলোচনায় উৎসাহী না হওয়ায় বল আবার ফিরে গেছে সরকারের কোর্টে। সরকার নাকি দ্রুতই সিদ্ধান্ত দেবে।
আগামীকাল বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক রয়েছে। এর আগেও প্রধান উপদেষ্টার কয়েকজন উপদেষ্টাকে নিয়ে বসার কথা। তাদেরকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ‘অনানুষ্ঠানিক আলোচনা’র দায়িত্ব দেওয়ারও খবর ছিল। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে ভিন্নমত পোষণকারী দলগুলোর মধ্যেও অনানুষ্ঠানিক আলোচনার খবর রয়েছে। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে তাদের মধ্যে জোট গঠন আর আসন সমঝোতা নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছে বলেও জানা যায়। এ বিষয়ে আলোচনায় অগ্রগতির সঙ্গে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে একমত হওয়ার বিষয়টি অনেকখানি সম্পর্কিত হতে পারে।
জামায়াতে ইসলামী ও সহমত দলগুলো চাইছিল, জুলাই সনদ প্রশ্নে গণভোট হোক নভেম্বরের মধ্যে। নভেম্বরের মধ্যভাগ এসে গেছে, বলা যায়। এর মধ্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করে গণভোট আয়োজন সম্ভব বলে মনে হয় না। নির্বাচন কমিশন (ইসি) ফেব্রুয়ারিতে, রমজান মাসের আগে জাতীয় নির্বাচন করার লক্ষ্যে পদক্ষেপ নিচ্ছে। নির্বাচনের রোডম্যাপ অনুযায়ী ডিসেম্বরের শুরুতে তপশিল ঘোষণার কথা। এর মধ্যে সংশোধিত আরপিও এবং দল ও প্রার্থীর জন্য প্রযোজ্য আচরণ বিধিমালা জারি করেছে ইসি। সরকার বললেই কেবল তারা গণভোট আয়োজনে এগোবে। তার আগে এ নিয়ে ইসির কোনো ভাবনা নেই।
সরকার ও ইসি মিলে কেমন নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে সমর্থ হবে, সেটা নিয়েই গভীর সংশয় রয়েছে। গত দেড় দশকে তো নির্বাচন বলা যায় উঠেই গিয়েছিল দেশ থেকে। গণঅভ্যুত্থানের পর অর্থবহ নির্বাচন হবে– এটাই প্রত্যাশা। সরকারও বারবার বলছে, আদর্শস্থানীয় নির্বাচন হবে এবার। আর বলা হচ্ছে, সেটা নির্ধারিত সময়েই হবে। তবে কী মানের নির্বাচন হবে আর যথাসময়ে হবে কিনা– এ দুই প্রশ্নেই সংশয় বাড়ছে বৈ কমছে না। অন্যান্য প্রস্তুতির বিষয় পাশে সরিয়ে রাখলেও বলা যায়, আইনশৃঙ্খলার ক্রমাবনতি এর বড় কারণ। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ঘিরে সংকট সৃষ্টি হওয়াতেও নির্বাচন নিয়ে সংশয় কাটছে না।
এরই মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত দলের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি জটিল করার চেষ্টা পরিলক্ষিত। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে চলমান মামলার প্রথম রায় ঘোষণা ঘিরে দলটি কর্মসূচি দিয়েছে। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হলেও তাদের কিছু কর্মী-সমর্থকের তৎপরতা থেমে নেই। অব্যাহত ধরপাকড়ও তাদের দমাতে পারছে না। আগামী নির্বাচনে দলটি অংশ নিতে না পারলেও তাদের দিক থেকে এটাকে নির্বিঘ্ন করার ক্ষেত্রে কিছু হুমকি থেকেই যাবে। খোদ প্রধান উপদেষ্টা মাঝে সবাইকে সতর্ক করে বলেছেন, ‘হঠাৎ করে আক্রমণ চলে আসতে পারে।’ এবারের নির্বাচন যে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং হবে, ইসি থেকেও সেটা বলা হচ্ছে। জনসাধারণের মধ্যেও এমন কথাবার্তা কানে আসে।

এ অবস্থায় গণঅভ্যুত্থানের শক্তিগুলো একের পর এক বিবাদে জড়িয়ে না পড়লে ভালো হতো। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য স্বাভাবিক। এটা গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হিসেবে বর্ণিত হয়। তবে এড়ানো যায়, এমন বিবাদ অগ্রহণযোগ্য। গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর দলগুলো আদর্শগতভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এতে কারও কিছু বলার নেই। তাতে বরং এই নিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, সামনের নির্বাচন গণঅভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিগুলোর মধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু নির্বাচন ঠিক কখন হবে, তা নিয়েই দীর্ঘদিন ধরে চলেছে রাজনৈতিক মতভেদ। অন্তর্বর্তী সরকারও এ ক্ষেত্রে এমন অবস্থান নিয়ে ছিল, যা কার্যত একটি পক্ষের দিকে হেলে থাকা। এ অবস্থায় বিচার ও সংস্কারে ‘প্রত্যাশিত অগ্রগতি’র শর্ত জুড়ে দিয়ে নির্বাচনকে বিলম্বিত করার অভিযোগ ওঠে খোদ সরকারের বিরুদ্ধে।
তারপরও সংস্কার আলোচনায় দীর্ঘ সময় দিয়েছে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো, যারা ‘দ্রুত নির্বাচন’ চাইছিল। আট মাস ধরে চলেছে সংস্কার আলোচনা। অতঃপর রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই সনদ স্বাক্ষর করেছে প্রধান দুই পক্ষ। তার আগে গণভোট আয়োজন করে এর পক্ষে জনসম্মতি গ্রহণের বিষয়েও সবাই একমত। এতে আশাবাদ জাগে শুধু সংস্কার নয়; নির্ধারিত সময়ে নির্বিঘ্নে নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে। সুনির্দিষ্ট সময়সীমা পেয়ে ইসিও কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে। এসব অগ্রগতির মধ্যে ঐকমত্য কমিশন সনদ বাস্তবায়ন বিষয়ে একটি পক্ষের দিকে হেলে পড়ে সুপারিশ করবে– এটা প্রত্যাশিত ছিল না। তাদের এমন ভূমিকায় সরকারও সমালোচিত হচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টাও সমালোচিত। কেননা, তিনি ঐকমত্য কমিশনের সভাপতি।
তারপরও আশা, সংকট নিরসনে তিনি উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। সব রাজনৈতিক পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত নেওয়া অবশ্য কঠিন। মাঝে ছোটখাটো সংস্কারে অগ্রগতি আনতেও হিমশিম খাচ্ছে সরকার। এনবিআর সংস্কার ঘিরে তো নজিরবিহীন অচলাবস্থা চলে রাজস্ব আহরণে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। ‘আশু বাস্তবায়নযোগ্য’ সংস্কারেও পারদর্শিতা দেখাতে পারেনি সরকার। এ অবস্থায় জুলাই সনদ ঘিরে গুরুতর রাজনৈতিক মতপার্থক্যের মাঝে তারা কীভাবে কী করবেন, তা দেখার অপেক্ষায় অনেকে। বিএনপি ও জামায়াত কাউকেই অসন্তুষ্ট না করার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া সত্যি কঠিন। এনসিপিকে খুশি রাখার ব্যাপারও রয়েছে। নির্বাচনের পর পরিস্থিতি যা-ই দাঁড়াক; এর আগ পর্যন্ত দলটির এক ধরনের গুরুত্ব থাকবে বলেই মনে হয়।
সরকার ১৫ নভেম্বরের মধ্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করতে চায় বলে খবর রয়েছে। বিদ্যমান বাস্তবতায় রাষ্ট্রপতিকে এড়িয়ে সেটা কি সম্ভব? একতরফাভাবে আদেশ জারিও নতুন সংকটের জন্ম দিতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আরেক দফা অনানুষ্ঠানিক আলোচনা করে হলেও এ কাজে এগোতে হবে সরকারকে। গণতন্ত্রে উত্তরণের জন্য জরুরি নির্বাচনের পথ প্রশস্ত করতে দলগুলো অল্প ছাড় দিয়ে হলেও সরকারকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা জোগাতে পারে। কেননা, নির্বাচন নতুন করে অনিশ্চিত হয়ে পড়লে সব রাজনৈতিক দলই পড়তে পারে অপরিমেয় ক্ষতির মুখে। তেমন পরিস্থিতিতে গণভোট আর সংস্কার বাস্তবায়ন ইত্যাদি প্রশ্ন সোজা চলে যেতে পারে হিমাগারে। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পুরো যাত্রাপথটি তখন হয়ে থাকবে মূল্যবান সময়ের অপচয় আর দুর্ভাগ্যজনক অভিজ্ঞতা।
সম্ভাব্য এ পরিস্থিতি মাথায় রাখতে হবে দেশে গণতন্ত্র ও সুশাসন জোরদার করতে চাওয়া সব পক্ষকে। জনপ্রত্যাশারও দাম দেওয়া চাই। অর্থনীতির দিক থেকে বাংলাদেশ সম্ভাবনাময়, এটাও মনে রাখা প্রয়োজন। গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক সরকার মিললে বিনিয়োগ আর কর্মসংস্থানে অচলাবস্থাও কাটবে। ঐকমত্যের ভিত্তিতে চলমান সংস্কার বাস্তবায়নের পাশাপাশি অর্থনীতিতেও সংস্কার আনতে হবে নতুন সরকারকে, যেটা এখন অবহেলিত।
হাসান মামুন: সাংবাদিক, কলাম লেখক
- বিষয় :
- হাসান মামুন
- রাজনীতি
- অচলাবস্থা
