রাজনীতি
১৩ নভেম্বর: শঙ্কা না সংখ্যা?
ফাইল ছবি
আদনান মনোয়ার হুসাইন
প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০২৫ | ২১:৫১
দেশে ১৩ নভেম্বর ঘিরে ক’দিন ধরেই এক ধরনের অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ এদিন ‘লকডাউন’ নামে কর্মসূচি দিলেও এর আওতায় ঠিক কী করা হবে তা স্পষ্ট করেনি। ফলে কানামাছি খেলার মতো করে দেওয়া এ কর্মসূচি ঘিরে যুগপৎ ব্যাপক আলোচনা, কৌতূহল ও উদ্বেগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে; সেটি যেমন সাধারণের মধ্যে তেমনি সরকার ও প্রশাসনেও। আওয়ামী লীগ যদি কোনো সহিংসতায় না গিয়ে ‘অভাবিত’ প্রচারের সন্তুষ্টিতে সীমাবদ্ধ থাকে তাহলে তা দেশ ও দলটির জন্যই মঙ্গলজনক।
কিছুদিন আগেই আওয়ামী লীগ অনলাইনে ১৩ নভেম্বর রাজধানী ঢাকায় ‘লকডাউন কর্মসূচি’ পালনের ঘোষণা দেয়। দলটি এদিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার ঠিক কী করবে তা বলেনি। তবে তাদের একেক নেতা ফেসবুক, ইউটিউবে কর্মসূচি ঘিরে একেক ধরনের করণীয়ের কথা বলছেন। কেউ সবাইকে করোনাকালের মতো ঘরে অবস্থানের আহ্বান জানাচ্ছেন, কেউ গাছের গুঁড়ি ফেলে সড়ক আটকে দেওয়ার কথা বলছেন। কেউ সরকারের প্রতি অনাস্থা জানাতে কালো বেলুন ওড়াতে বলছেন। ফেসবুক সূত্রে জানা যাচ্ছে, দু’তিন দিন আগে দলটির সভাপতি শেখ হাসিনাও নাকি এক ভিডিওবার্তায় নেতাকর্মীদের নিরাপদে থেকে কর্মসূচি সফল করার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে তিনিও স্পষ্ট করেননি কর্মসূচিতে ঠিক কী রয়েছে!
১৩ নভেম্বর নিয়ে আওয়ামী লীগ যখন সামাজিক মাধ্যমে সরব, সরকারের ব্যাপক তৎপরতাও তখন দৃশ্যমান। একের পর এক মিটিং ও বিভিন্ন নির্দেশনার খবর পত্রিকা, টিভিতে দেখা যাচ্ছে। ফলে অনলাইন কিংবা অফলাইন–কোনো না কোনোভাবে ১৩ নভেম্বরের খবর জনসাধারণের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। বাদ যাচ্ছেন না কেউই। ফলত দিনটি নিয়ে উচ্চমাত্রার হাইপ সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসনের নানাবিধ প্রস্তুতিতে এক ধরনের অস্বস্তিও দেখা দিয়েছে। খারাপ কোনো কিছু ঘটতে চলেছে কিনা–এ ধরনের একটা শঙ্কা কাজ করছে জনমনে।
ডিএমপি জানিয়েছে, ১৩ নভেম্বর ঘিরে রাজধানীতে ১৭ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবেন। পাশাপাশি সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যা ব ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করবেন। ইতোমধ্যে দেশের সব বিমানবন্দরে উচ্চ সতর্কতার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাস্তার পাশে খোলা জ্বালানি তেল বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ হয়েছে। এমনকি ঢাকা মহানগরে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের মোবাইল ফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং আওয়ামী লীগের কার্যক্রম সম্পর্কে সজাগ থেকে তা প্রতিরোধ করার পাশাপাশি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখার ব্যাপারে পুলিশকে সবসময় সতর্ক রাখতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানায় ডিএমপি।
সম্ভাব্য নাশকতার আশঙ্কায় গত ৯ নভেম্বর মেট্রোরেল পরিচালনাকারী সংস্থা ডিএমটিসিএলের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বাতিল করা হয়। একই দিন সুপ্রিম কোর্ট এলাকা, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবন এবং এর সংলগ্ন এলাকার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের স্বার্থে জাতীয় ঈদগাহ মাঠে বহিরাগতদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়।
গত মঙ্গলবার ডিএমপি কমিশনার নাশকতাকারীদের প্রতিরোধ করতে ঢাকাবাসীর প্রতি আহ্বান জানান। একইদিনে আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায় রাজনৈতিক দলগুলোকে মাঠে থাকার আহ্বান জানানো হয়। পরে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে নাগরিকদের সহযোগিতা চেয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সন্দেহভাজন কাউকে দেখলে সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানাবেন। এর আগে রাস্তাঘাটে তল্লাশি চৌকি স্থাপন ছাড়াও যানবাহনসহ সন্দেহভাজনদের তল্লাশির নির্দেশনা দেওয়া হয়।
সন্দেহের যেহেতু কোনো মাপকাঠি নেই, এসব পদক্ষেপের নানা অপব্যবহারের আশঙ্কাও থেকে যায়। সাধারণ নাগরিকের হয়রানি, বিড়ম্বনার শিকার হওয়ার পাশাপাশি ব্যক্তিস্বাধীনতা, ব্যক্তি গোপনীয়তা তথা মানবাধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার মতো ঘটনা ঘটার আশঙ্কাও রয়েছে। গত ১৫ বছরে বিরোধী দলগুলোর প্রতিটি আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি নাগরিকদের হতে হয়েছে। মানুষ এসব থেকে মুক্তি চেয়েছিল। এগুলোর প্রত্যাবর্তন তাদের আরও ক্ষুব্ধ করবে। মব সহিংসতার এই সময়ে জনগণকে প্রতিরোধের আহ্বান জানালে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নিতে পারে এবং তা সামাল দেওয়ার সক্ষমতার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা দরকার।
তবে এটিও ঠিক, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকারকে কঠোর হতেই হবে। কিন্তু সমস্যার প্রকৃত সমাধান না খোঁজে টোটকা দাওয়াই দিলে কাজ হবে কিনা সে প্রশ্নও প্রাসঙ্গিকভাবে উঠে যায়। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ। কোনো দল প্রকাশ্যে কার্যক্রম চালাতে না পারলে সমাজে যে অস্থিরতা বাড়বে তা বলাই বাহুল্য। দলটির নেতাকর্মী দোষী নির্দোষ নির্বিশেষে মামলা-হামলা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। আওয়ামী লীগের কারও সঙ্গে একটি ছবি থাকলেও সরকারি কর্মজীবী, শিক্ষক থেকে শুরু করে পেশাজীবীদের পর্যন্ত দীর্ঘ ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। দলটির কর্মী সমর্থক শুভানুধ্যায়ীদের মধ্যে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার অনুভূতি যত প্রবল হবে তাদের সামাল দেওয়া ততই কঠিন হবে। ৫ আগস্টের পর ইনক্লুসিভ সমাজ গঠনের যে স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল সেটিই হতো সঠিক পন্থা। তা না করে বিভক্তি বাড়িয়ে বিপদ টেনে আনা হয়েছে। অবশ্য নির্বাচন হয়ে গেলে অস্থিতিশীলতা নিয়ন্ত্রণ করা প্রশাসনের জন্য সহজ হবে।
১৩ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই-আগস্টের একটি হত্যা মামলায় রায়ের তারিখ ঘোষণা করার কথা। মামলাটিতে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়াও তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং রাজ সাক্ষীতে পরিণত হওয়া সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন আসামি। আওয়ামী লীগের লকডাউন কর্মসূচি এ কারণেই কিনা তা দলটি বলেনি। তেমনি গত ৭ নভেম্বর থেকে একের পর এক ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে অগ্নিসংযোগের সঙ্গে এ কর্মসূচির যোগ রয়েছে কিনা তা-ও নিশ্চিত করে বলতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অবশ্য প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব কোনো সূত্র উল্লেখ না করেই এসব নাশকতা আওয়ামী লীগ করছে বলে দাবি করেছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হয়তো নাশকতাকারীদের শনাক্ত করতে পারবে, নিবৃত্ত করতে পারবে। তারা এ কাজে সফল হতে যত দেরি করবে ততই অতীতের বীভৎস দৃশ্যের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা বাড়বে। ইতোমধ্যে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় নিহত হয়েছেন একজন বাসচালক। সেখানে গত সোমবার গভীর রাতে পার্ক করা বাসে অগ্নিসংযোগ করায় পুড়ে মারা যান এটির চালক জুলহাস মিয়া।
গত এক বছরে আওয়ামী লীগ বিভিন্ন ইস্যুতে অনলাইনের মাধ্যমে কিছু কর্মসূচি দিয়েছিল। সেগুলো কতটা তারা পালন করেছে সেটি ভিন্ন প্রশ্ন কিন্তু দেশের সংবাদমাধ্যম সেসব কর্মসূচি ঘোষণার খবর সযত্নে এড়িয়ে গেছে। এবার ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। একদিকে নাশকতার খবর, অন্যদিকে একের পর এক নিরাপত্তাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা–সব মিলিয়ে মুফতে লকডাউন কর্মসূচির বড় প্রচার হয়ে যাচ্ছে। ফলে গত বছরের ৫ আগস্টের পর যে আওয়ামী লীগ ‘নাই’ হয়ে গেছে বলে মনে করা হচ্ছিল, তারা এখন প্রবলভাবেই তাদের অস্তিত্বের জানান দিতে পেরেছে।
যেকোনো নির্বাচনের আগে নানা রকমের অস্থিরতার একটা রেওয়াজ বাংলাদেশে রয়েছে। এবারের ভিন্ন প্রেক্ষাপটে সে আশঙ্কা আরও বেশি। সবাইকে নিয়ে তেমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় অন্তর্বর্তী সরকার প্রস্তুত হবে কী, তাদের এখনও নাকাল হতে হচ্ছে জুলাই সনদ নিয়ে দলগুলোর বিরোধ মেটাতে। জুলাই অভ্যুত্থানের অংশীদার দলগুলো পরস্পরকে যে ভাষায় হুংকার ছুড়ছে তাতে নিজেদের মধ্যে সংঘাত বাধে কিনা সে আশঙ্কাই প্রবল হয়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে কোণঠাসা হয়ে পড়া আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের মোক্ষম সুযোগ করে দিচ্ছে।
কর্মসূচিতে যোগ দিতে গিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ভুলে গেলে চলবে না যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে এই দলই নেতৃত্ব দিয়েছে। গত তিনটি নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক করে তুলতে নিদারুণ ব্যর্থতার পরও তাদের সরকারের গত ১৫ বছরে অনেক উন্নয়ন হয়েছে। এই দেশের কোনো ক্ষতি তাদের দ্বারা যেন না হয়। যে ধ্বংসাত্মক রাজনৈতিক কর্মসূচি অতীতে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, সেসব যেন ফিরে না আসে। শান্তিকামী সাধারণ নাগরিক হিসেবে এটুকু প্রত্যাশা করতেই পারি, ১৩ নভেম্বর কোনো শঙ্কাবাহী দিন নয় বরং ক্যালেন্ডারের পাতায় সাধারণ একটি তারিখ, একটি সংখ্যা হয়ে থাকবে।
আদনান মনোয়ার হুসাইন : সহকারী বার্তা সম্পাদক, সমকাল
[email protected]
- বিষয় :
- আদনান মনোয়ার হুসাইন
- মতামত
- রাজনীতি
- আওয়ামী লীগ
