ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আন্তর্জাতিক

ইরাক-লিবিয়ার মতো ভেনেজুয়েলাতেও মার্কিন হামলা?

ইরাক-লিবিয়ার মতো ভেনেজুয়েলাতেও মার্কিন হামলা?
×

মঞ্জুরে খোদা

প্রকাশ: ১৪ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:১৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

মাদকবিরোধী যুদ্ধের কথা বলে ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসনের মঞ্চ প্রস্তুত করছে। এ বছর আগস্টে যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ ক্যারিবীয় সাগরে এজিস শ্রেণির ডেস্ট্রয়ার ও পারমাণবিক সাবমেরিন মোতায়েন শুরু করে। সেপ্টেম্বরের মধ্যে তারা তথাকথিত ‘ড্রাগ বোট’-এর ওপর বিমান হামলা চালিয়ে কোনো প্রমাণ ছাড়াই ১৪টি নৌকা ধ্বংস ও ৬১ জনকে হত্যা করে। 

অক্টোবরের মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা উপকূলে চার হাজার এবং পুয়ের্তো রিকোতে পাঁচ হাজার সৈন্য মোতায়েন করে। এদের সঙ্গে রয়েছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান, এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন। কারাকাসের আকাশে বি-৫২ বোমারু বিমান উড়িয়ে মহড়া দেওয়া হয়। অক্টোবরের শেষে ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড বিমানবাহী রণতরীও এ অঞ্চলে পাঠানো হয়। 
এই বছর ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট ‘ট্রেন দে আরাগুয়া’ নামে এক অপরাধী নেটওয়ার্ককে ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর জুলাই মাসে ট্রেজারি বিভাগ তথাকথিত ‘কার্টেল দে লস সোলেস’কে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ‘আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ বলে অভিহিত করে। কিন্তু কোনো মার্কিন সংস্থা এসব সংগঠনকে হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেনি, এমনকি কোনো তথ্যপ্রমাণও হাজির করেনি। 

ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করছে, এ দুটি সংগঠন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সরকারের সঙ্গে মিলে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচার করছে। অথচ তার কোনো প্রমাণই নেই। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তরের প্রতিবেদন বলছে, বৈশ্বিক মাদক পাচারে ভেনেজুয়েলার ভূমিকা অতি সামান্য। তবুও যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোর মাথার জন্য ৫০ মিলিয়ন ডলারের পুরস্কার ঘোষণা করেছে! এ বছর ‘ভেন্তে ভেনেজুয়েলা’ আন্দোলনের নেত্রী মারিয়া করিনা মাচাদো নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন। ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল ‘ভেন্তে ভেনেজুয়েলা’ মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বিশ্বাসী ডানপন্থি রাজনৈতিক দল। তাদের প্রধান লক্ষ্য বামপন্থি মাদুরো সরকারকে উৎখাত। এ জন্য নিজ দেশে মার্কিন হস্তক্ষেপকেও সমর্থন করেন।  

১৯৬৪ সালেও যুক্তরাষ্ট্র ব্রাজিল উপকূলে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করে বামপন্থি জোয়াও গুলার্টকে হটিয়ে জেনারেল কাস্তেলো ব্রাঙ্কোর অভ্যুত্থান উৎসাহিত করেছিল; পরিণতিতে সেখানে ২১ বছরের সামরিক একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ভেনেজুয়েলায় পরিস্থিতি ভিন্ন। সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজ সামরিক একাডেমিতে রাজনৈতিক শিক্ষা দিয়ে সংবিধানের প্রতি সেনাবাহিনীর আনুগত্য নিশ্চিত করেছিলেন। সে কারণে এখন মার্কিনপন্থি ‘ব্রাঙ্কো’ উঠে আসা কঠিন। 

মার্কিন আগ্রাসনের মুখে ভেনেজুয়েলার নাগরিকরা রাইফেল হাতে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন ‘মাতৃভূমি রক্ষায়’। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিওসদাদো কাবেলো বলেছেন, ‘এ ক্ষেত্রে ভিয়েতনামের কথা মনে পড়ে; ছোট কিন্তু ঐক্যবদ্ধ জাতি কীভাবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে শিক্ষা দিয়েছিল।’ 
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র কি ইরাক-লিবিয়ার মতো ভেনেজুয়েলাতেও হামলা চালাবে? বিষয়টি সহজ নয়; লাতিন দেশগুলো তাদের প্রতিবেশীর পাশে আছে। ব্রাজিল, মেক্সিকো ও কলম্বিয়ার সরকার ইতোমধ্যে ভেনেজুয়েলার পক্ষে দৃঢ় অবস্থানের কথা জনিয়েছে। পরাশক্তি রাশিয়া ঘোষণা দিয়েই পাশে দাঁড়াচ্ছে। ইতোমধ্যে ভেনেজুয়েলার আকাশে সুরক্ষিত বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও গড়ে তুলেছে। চীনও নিশ্চয় তার বিপুল বিনিয়োগের সুরক্ষা দিতে হাজির থাকবে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের দুই সদস্য রাষ্ট্রের অবস্থান যে কোনো বিবেচনাতেই গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে ইরাক-লিবিয়ার অবস্থা ভেনেজুয়েলার নয়। ইরাক-লিবিয়ার পাশে তাদের প্রতিবেশী দেশগুলো বা কোনো পরাশক্তি ছিল না। ইউক্রেন নিয়ে নাস্তানাবুদ অবস্থার ক্ষেত্রে ইউরোপীয় পরাশক্তিগুলোও আরেকটি ফ্রন্ট খুলতে চাইবে না। 
২০১৩ সালে হুগো শাভেজের মৃত্যুর পর তৎকালীন মার্কিন শাসক ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন– ভেনেজুয়েলার সমাজতন্ত্রের পতন সময়ের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু সেই ধারণাকে ব্যর্থ প্রমাণ করে দেশটি এগিয়ে চলেছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক হুমকির মধ্যেও ভেনেজুয়েলার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঘোষণা করেছে, ২০২৫ সালের মোট জিডিপি ২০২৪ সালের তুলনায় ৮.৭১% বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ধারা ভেনেজুয়েলার অর্থনীতির ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির স্পষ্ট ইঙ্গিত।

সম্প্রতি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান তুলসী গ্যাবার্ড বলেছেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসন রেজিম চেঞ্জের নীতি থেকে সরে এসেছে। তারা আর কোনো দেশের সরকার পরিবর্তনে ভূমিকা রাখবে না।’ কেননা, এই তৎপরতার সঙ্গে তাদের নিজেদের নিরাপত্তা ও আর্থিক বিষয়ও জড়িত। ফলে ভেনেজুয়েলায় শাসক পরিবর্তনের জন্য মরিয়া চেষ্টা মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরেও সর্বাত্মক সমর্থন পাবে কিনা, সন্দেহ।

ড. মঞ্জুরে খোদা: লেখক-গবেষক 
ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক 

আরও পড়ুন

×