ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

তৃতীয় মেরু

তিস্তা নিয়ে ‘ফৌজদারি অপরাধ’ মমতা নিজেও করছেন

তিস্তা নিয়ে ‘ফৌজদারি অপরাধ’ মমতা নিজেও করছেন
×

শেখ রোকন

শেখ রোকন

প্রকাশ: ১৬ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:২৫ | আপডেট: ১৬ নভেম্বর ২০২৫ | ১০:৫২

| প্রিন্ট সংস্করণ

মাইকেল মধুসূদন দত্তের বদৌলতে বাংলা ভাষায় প্রবাদে পরিণত হওয়া রানী কৈকয়ীর ‘এ কি কথা শুনি আজ মন্থরার মুখে’ উক্তিটি সামান্য পরিবর্তন করে এই নিবন্ধের শিরোনাম হতে পারত ‘এ কি কথা শুনি আজ মমতার মুখে’!

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অযৌক্তিক আপত্তির মুখে ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ‘স্বাক্ষরের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত’ তিস্তা চু্ক্তি কীভাবে ভেস্তে গিয়েছিল, কে না জানে! আগে শুকনো মৌসুমে পশ্চিমবঙ্গের গজালডোবা ব্যারাজের নিচ দিয়ে কার্যত চুইয়ে যতটুকু প্রবাহ তিস্তা দিয়ে বাংলাদেশে আসত, ২০১১ সালেরই মে মাসে প্রথম মেয়াদে তিনি মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর সেটিও বন্ধ হয়ে যায়। আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতি, বাংলাদেশের দফায় দফায় অনুরোধ, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের উপরোধ অগ্রাহ্য করে। 

সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চলতি সপ্তাহে বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গের উজানের রাজ্য সিকিম তিস্তায় জলবিদ্যুৎ বাঁধ বা ড্যাম নির্মাণের মাধ্যমে ‘সামাজিক ও ফৌজদারি অপরাধ’ করেছে। তিনি বলেছেন–‘তিস্তাকে ব্লক (বন্ধ) করে দিয়েছে। এটা অপরাধ নয়! এটা সামাজিক অপরাধ নয়! এটা ক্রিমিনাল অফেন্স (ফৌজদারি অপরাধ) নয়!’ (আনন্দবাজার, ১০ নভেম্বর ২০২৫)।

প্রসঙ্গত, অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে সিকিম, ভুটান অঞ্চলে ‘ক্লাউড বার্স্ট’ বা মেঘ বিস্ফোরণ ঘটেছিল। স্বল্প সময়ে বিপুল বৃষ্টিপাতের সেই পানি পাহাড় থেকে নদীপথে গড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গের উত্তরবঙ্গীয় জেলাগুলোতে ‘হড়পা বান’ বা তীব্রগতির আকস্মিক বন্যার বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছিল। ৪৮ ঘণ্টায় অন্তত ৩৬ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল। 

ওই মেঘ বিস্ফোরণ ও হড়পা বানের প্রভাব স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশেও পড়েছিল তিস্তা, তোর্সা (দুধকুমার), জলঢাকা (ধরলা) নদী অববাহিকায়। নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম জেলায় তিস্তাসংলগ্ন দেড় শতাধিক চর ও নিম্নভূমির ফসল ও বাড়িঘর তলিয়ে গিয়েছিল। নদী দিয়ে ভেসে এসেছিল গাছের গুঁড়ি ও গন্ডারের মতো পশুপাখি। তখন লিখেছিলাম–‘গদাধরের গন্ডার কিংবা দুধকুমারের দুঃখ’ (সমকাল, ১২ অক্টোবর ২০২৫)।

তখনও উত্তরবঙ্গ সফরে গিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, এটা ‘ম্যান মেইড’ বন্যা (আনন্দবাজার, ৭ অক্টোবর ২০২৫)। নিজের এক্স হ্যান্ডলে লিখেছিলেন– ‘এটা খুবই দুর্ভাগ্যের এবং গভীর উদ্বেগের বিষয় যে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী একটি প্রাকৃতিক বিপর্যয় নিয়ে রাজনীতি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’ তাঁর এসব বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমতের অবকাশ নেই। প্রশ্ন হচ্ছে, সিকিমের বাঁধ কিংবা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের ‘রাজনীতি’ নিয়ে তিনি যা বলেছেন, সবই নিজেও নির্বিকারে ও নির্বিচারে সেগুলো করে চলেছেন।

যেমন, এই দফায় তিনি তিস্তায় বাঁধের জন্য সিকিম রাজ্য সরকারের পাশাপাশি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে দায়ী করে আরও বলেছেন–‘কী করে কেন্দ্র পারমিশন দিল! তিস্তার জল দিতে হবে বলে মাঝে মাঝেই চিৎকার করে। তিস্তাকে বাঁচাতে হবে, এটা নিয়ে তো ভাবে না!’

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘তিস্তার জল দিতে হবে বলে মাঝে মাঝেই চিৎকার করে’ বলে স্পষ্টতই বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যার ব্যাপারে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের তৎপরতাকে ইঙ্গিত করেছেন। ‘তিস্তাকে বাঁচাতে হবে’ বলে তিনি নিজেই যে চিৎকার মাঝে মধ্যেই করে থাকেন, সেটিরও ভিত্তি নেই। কারণ গজলডোবা ব্যারাজ থেকে প্রত্যাহার করা পানি তিস্তা অববাহিকায় ব্যবহার হচ্ছে না; বরং মহানন্দা, মেচি হয়ে ডাহুক নদী অববাহিকায় চলে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইনে এক অববাহিকার পানি অপর অববাহিকায় নিয়ে যাওয়াই বরং সামাজিক ও ফৌজদারি অপরাধ।

শুধু বাংলাদেশ-ভারত তিস্তা চুক্তিতে বাগড়া বা গজলডোবা ব্যারাজ থেকে শুকনো মৌসুমে তিস্তা অববাহিকার ভাটির অংশকে বঞ্চিত করে মহানন্দা-মেচি অববাহিকায় পানি নিয়ে যাওয়া নয়; মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তিস্তার বাইরে উত্তরবঙ্গের অন্যান্য নদীর প্রবাহ থেকেও বাংলাদেশকে বঞ্চিত করার আয়োজন করছেন। ২০২৩ সালে এজন্য আরও তিনটি খাল খনন ও সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন।   

অনেকে জানেন, গজলডোবা ব্যারাজ প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী প্রধান খালগুলো নদীর দুই পাশে দুই ভাগে বিভক্ত। ডান তীরের প্রধান ও শাখা খালগুলোর দাপ্তরিক নাম ‘টিএমএলসি’ তথা তিস্তা-মহানন্দা সংযোগ খাল এবং বাম তীরের প্রধান ও শাখা খালগুলোর দাপ্তরিক নাম ‘টিজেএলসি’–তিস্তা-জলঢাকা সংযোগ খাল। ২০২৩ সালের আগ পর্যন্ত শুধু ডান তীরের খালগুলোই চালু ছিল; বাম তীরের খালগুলোর খননই করা হয়নি। 

ওই বছর গজলডোবা ব্যারাজ থেকে কোচবিহারের চ্যাংড়াবান্ধা পর্যন্ত ৩২ কিলোমিটার দীর্ঘ খাল খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাশাপাশি জলপাইগুড়িতে সীমাবদ্ধ ১৫ কিলোমিাটার দীর্ঘ আরেকটি খাল খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৮৭ সালে প্রকল্পটি উদ্বোধনের সময়েই তৃতীয় আরেকটি খাল জলপাইগুড়ির ধুপগুড়ি ব্লক এলাকায় খনন করা হলেও চালু হওয়ার আগেই অনেক জায়গায় ভরাট হয়ে যায়। ২০২৩ সালে সেটিও খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

শুধু তিস্তা নয়; ৩২ কিলোমিটার দীর্ঘ খালটির মাধ্যমে জলঢাকা বা ধরলা নদীর পানিও প্রত্যাহারের কথা বলা হয়। আগ্রহীরা আরও পড়তে পারেন–তিস্তায় ‘দুই’ খালের আড়ালে তিন সর্বনাশ (সমকাল, ২৩ মার্চ ২০২৩)।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই পরিকল্পনা আসলে তখনকার, যখন তিনি বাংলাদেশে এসেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, দুই পক্ষ আলোচনার মাধ্যমে তিস্তা সমস্যার সমাধান হবে। মনে আছে, সেই সময়, ২০১৫ সালের এপ্রিলে, ভারত সফরে গিয়েছিলেন বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানে এক বৈঠকে শেখ হাসিনা তিস্তার পানি চুক্তির বিষয়টি তুললে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, তিস্তায় ভাগাভাগির মতো পানি অবশিষ্ট নেই। তার বদলে বরং তোর্সা (দুধকুমার) ও জলঢাকার (ধরলা) পানিবণ্টন করা যেতে পারে। 

তখনই আমি লিখেছিলাম, মমতার প্রস্তাব আসলে শুভঙ্করের ফাঁকি। কারণ ওই দুই আন্তঃসীমান্ত নদীতেও বাংলাদেশের পূর্ণ অধিকার রয়েছে। অপর আন্তঃসীমান্ত নদী তিস্তার বিনিময়ে ওই দুই নদীতে নতুন করে অধিকার প্রতিষ্ঠার কিছু নেই।

কথা আরও আছে। সিকিমের যে জলবিদ্যুৎ ড্যামকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘সামাজিক ও ফৌজদারি অপরাধ’ বলছেন, একই ধরনের স্থাপনা পশ্চিমবঙ্গেও রয়েছে। বস্তুত, নদী বিশেষজ্ঞ কপিল ভট্টাচার্য লিখেছেন–‘ভারতবর্ষে দার্জিলিংয়েই প্রথম জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা গৃহীত হয় ১৮৯৭ খৃষ্টাব্দে’ (বাংলা দেশের নদ-নদী ও পরিকল্পনা, প্রথম প্রকাশ ১৯৫৪)।

‘সিদ্রাপঙ নামে ১৩০ কিলোওয়াটের এই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন শুরু হয়েছিল ১৮৯৭ সালে। ১৯০৫ ও ১৯১০ সালে আরও একটি করে ১৩৫ কিলোওয়াট এবং ১৯৩১ থেকে ১৯৩৫ সময়সীমায় ২০০ কিলোওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার পাঁচটি ইউনিট স্থাপিত হয়। বর্তমানে এর মোট উৎপাদন ক্ষমতা কমবেশি ৬০০ মেগাওয়াট। 

এটি ঠিক, বর্তমানে সিকিমে অন্তত ৪৪টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত বা নির্মাণাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ৮টি প্রকল্পই সরাসরি তিস্তা নদীতে হলেও বাকিগুলোও তিস্তার বিভিন্ন উপনদীতে অবস্থিত। কিন্তু খোদ পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং ও কালিম্পঙ জেলায় রয়েছে তিনটি জলবিদ্যুৎ ড্যাম–১. তিস্তা লো ড্যাম ওয়ান অ্যান্ড টু কম্বাইন্ড; ২. তিস্তা লো ড্যাম ফাইভ; ৩. তিস্তা ইন্টারমিডিয়েট স্টেজ। 

স্বীকার্য, নদীতে ড্যাম ও ব্যারাজ নির্মাণ পানিসম্পদ, প্রতিবেশ ও পরিবেশের যে ক্ষতি করে, সেটি ফৌজদারি ও সামাজিক অপরাধই। কিন্তু সেই অপরাধ মমতা বন্দ্যোপাধায় নিজেও করছেন, বাংলাদেশের প্রতি। তিস্তা অববাহিকার ক্ষতি কেবল পশ্চিমবঙ্গেও থেমে নেই। বরং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রাঞ্জল বাংলায় জানিয়ে দিতে হবে, সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের ড্যাম ও ব্যারাজে বাংলাদেশই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। 

আর অভিন্ন নদীতে অভিন্ন অধিকার স্বতঃসিদ্ধ; এতে ভারতের যেমন, তেমনই রয়েছে বাংলাদেশের অধিকার। সেই অধিকার ক্ষুণ্ন করার যে কোনো উদ্যোগ, সেটি তিস্তা বা পশ্চিমবঙ্গে হোক, নিঃসন্দেহে বড় ফৌজদারি ও সামাজিক অপরাধ। মমতা যদি তিস্তার স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলতেই চান, বাংলাদেশের অধিকারের প্রশ্নটি বাদ দিয়ে সেটি চলতে পারে না।
 
শেখ রোকন: লেখক ও নদী গবেষক
[email protected]

আরও পড়ুন

×