ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

জনস্বাস্থ্যে ফেরাতে হবে জনগণকে

জনস্বাস্থ্যে ফেরাতে হবে জনগণকে
×

মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম

মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম

প্রকাশ: ১৭ নভেম্বর ২০২৫ | ০৯:০০ | আপডেট: ১৭ নভেম্বর ২০২৫ | ০৯:১৪

স্বাস্থ্য আমাদের মৌলিক অধিকার। আর ‘জনস্বাস্থ্য’ শব্দটা এতদিন ধরে শুনে আসছি যে, এটা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন মনে হয় না। কিন্তু ‘জনস্বাস্থ্য’ নামটি শুনলেই প্রশ্ন জাগে– এই স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কি সত্যিই ‘জন’-এর। নাকি এটি কিছু নীতিনির্ধারক, আমলা বা প্রযুক্তিনির্ভর পেশাদারের হাতে গড়া এমন একটি কাঠামো, যেখানে সাধারণ মানুষের জায়গা খুব সীমিত। আরেকটি প্রশ্ন বারবার আসে। তা হলো এই ‘জন’টা কে? কাদের জন্য এই স্বাস্থ্য ব্যবস্থা? তারা কি সত্যি এতে জায়গা পাচ্ছে?

গত দুই দশকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে অনেক উন্নতি হয়েছে। এ দেশের জনস্বাস্থ্যের সাফল্যের গল্প আমরা সবাই জানি। ইমিউনাইজেশন, শিশু-মাতৃস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ইত্যাদি বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। কিন্তু একটা মৌলিক প্রশ্ন থেকে যায়। এই ‘জনস্বাস্থ্য’র মধ্যে ‘জনগণ’ কোথায়? এখানে রয়েছে এক ধরনের দূরত্ব– জনগণের সঙ্গে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার; রোগীর সঙ্গে চিকিৎসকের; গ্রামের মানুষের সঙ্গে শহুরে নীতিনির্ধারকদের। এই দূরত্ব শুধু সেবার মান বা সুযোগ-সুবিধা নয়। বরং একটি গভীর কাঠামোগত সমস্যার প্রতিচ্ছবি। আর সেটি হলো, আমরা জনস্বাস্থ্যকে অনেক সময় ‘জন’ ছাড়াই কল্পনা করি।

জনস্বাস্থ্যে ‘পাবলিক’ বলতে কেবল রোগী বা সেবাগ্রহীতা বোঝালে তা একটি সীমিত দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় বহন করে। বরং এটি এক বহুমাত্রিক পরিচিতি, যেখানে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে ভৌগোলিকভাবে বৈচিত্র্যপূর্ণ জনগোষ্ঠী (গ্রাম-শহর, উপকূল-চরাঞ্চল); সামাজিকভাবে প্রান্তিক জনগণ (নারী, হিজড়া, প্রতিবন্ধী, শ্রমজীবী, আদিবাসী); স্থানীয় নেতৃত্ব (ইউপি সদস্য, ইমাম, শিক্ষকমণ্ডলী); সুশীল সমাজ, এনজিও; তরুণ সমাজ ও ডিজিটাল অ্যাক্টিভিস্ট; প্রবাসী ও অভিবাসী শ্রমিক পরিবার। এসব জনগোষ্ঠী শুধু স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করে না; তারা নীতি নির্ধারণ, বার্তা প্রচার এবং আচরণগত হস্তক্ষেপে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক শক্তি হিসেবে কাজ করে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্য যোগাযোগে আদিবাসীরা প্রায়শ অদৃশ্য হয়ে যায়। তারা যেন পাবলিকের মধ্যে ‘নন-পাবলিক’। কেননা, পার্বত্য চট্টগ্রাম, উত্তরাঞ্চল বা চা-বাগান এলাকায় বসবাসরত আদিবাসীরা প্রায়ই জনস্বাস্থ্য নীতি ও অনুশীলনের বাইরে থাকে। তাদের ভাষা, খাদ্যাভ্যাস, চিকিৎসা-জ্ঞান, এমনকি দেহ-সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি মূলধারার স্বাস্থ্য বার্তার সঙ্গে খাপ খায় না। তাদের কাছে ‘রোগ’ মানে সব সময় জীবাণু নয়। বরং কোনো সামাজিক বা আত্মিক ভারসাম্যহীনতা। ফলে টিকা বা হাসপাতাল নয়, তারা হয়তো গ্রামের ওঝার কাছে যান।

যদি একজন আদিবাসী নারী হাসপাতালে গিয়ে অপমানিত হন বা বুঝতে না পারেন চিকিৎসকের কথা, তাহলে তার মস্তিষ্ক একে ‘বিপদ’ মনে করে। এরপর সে আর সেই সেবা খোঁজে না। এমনকি যদি সেটা তার জীবন রক্ষা করতে পারে। জনগণের সঙ্গে স্বাস্থ্যকর্মীর সম্পর্কটা যদি হয় সহানুভূতির, শ্রদ্ধার, তবেই আচরণ বদলায়। জনস্বাস্থ্য শুধু টিকা বা প্রেসক্রিপশন নয়। এটি এক ধরনের স্নায়ুবিজ্ঞানভিত্তিক মানবিক সম্পর্ক।

রাজনৈতিক দর্শনে ‘নাগরিক’ মানে এমন একজন ব্যক্তি, যিনি শুধু সেবা গ্রহণ করেন না, বরং সমাজ ও রাষ্ট্রের অংশীদার। কিন্তু আমরা কি জনগণকে তেমন দেখি? আমরা কি মনে করি, হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা শ্রমজীবী মানুষটির এই স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় কোনো কণ্ঠ আছে? আদর্শিকভাবে জনস্বাস্থ্য একটি ‘সামাজিক চুক্তি’– জনগণ রাষ্ট্রে আস্থা রাখবে, আর রাষ্ট্র জনগণের সম্মান, স্বাস্থ্য ও মর্যাদা রক্ষা করবে। এই চুক্তি ভাঙে, যখন রোগীকে দোষারোপ করা হয়, তাকে বোঝানো হয়, ‘আপনি সচেতন নন’। এই দৃষ্টিভঙ্গি এক ধরনের নৈতিক দখলদারি তৈরি করে, যা জনগণের ওপর নয়, রাষ্ট্র ও সিস্টেমের ওপর থাকা উচিত।

কীভাবে জনস্বাস্থ্য জনগণের হবে? জনগণের কথা শুনতে হবে। নজর দিতে হবে ভাষা ও সংস্কৃতির দিকে। তথ্য একপক্ষীয় নয়, আলাপচর্চা হতে হবে। গুরুত্ব দিতে হবে সামাজিক নেতৃত্বকে। সবচেয়ে বড় কথা কেবল সেবা নয়, গড়তে হবে সম্পর্ক। জনগণের কথা শোনার মানে হলো স্বাস্থ্য নীতিমালা তৈরির সময় মাঠের কর্মী, রোগী বা স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে পরামর্শ। শুধু শহরের কনসালট্যান্ট নয়; ইউনিয়ন পর্যায়ের নার্স, ফার্মেসির লোকজনও বাস্তবতা জানেন। ভাষা ও সংস্কৃতির দিকে নজর দেওয়ার মানে হলো স্বাস্থ্য বার্তা যেন জনগণের ভাষায় হয়। ‘হাইজিন’, ‘পাবলিক গুড’, ‘প্রিভেনশন’ নয়। বলতে হবে– ‘সাফ থাকলে রোগ কমে’; ‘আগে সচেতন হলেই বাঁচা যায়। টিভি বা পোস্টারে একতরফা বার্তার বদলে মহল্লাভিত্তিক আলোচনা, খোলা মতবিনিময় সভা বা স্কুল-কলেজে মতামত নেওয়ার চর্চা করা হোক। গ্রামে যে দাদি শিশুর যত্ন ভালো জানেন বা যে শিক্ষক স্কুলে স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করেন, তাদের সঙ্গে কাজ করতে হবে। তাদেরই প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তাদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। আর হাসপাতালে গেলে যেন রোগী নিজেকে অবাঞ্ছিত না ভাবে। চিকিৎসা যেন হয় সহানুভূতির সঙ্গে। রোগী যেন প্রশ্ন করতে পারেন, মতামত দিতে পারেন।

‘জনস্বাস্থ্য’ তখনই সার্থক হবে, যখন ‘জন’ থাকবে তার কেন্দ্রে– মাতৃভাষা, মর্যাদা ও সিদ্ধান্তে। আমাদের দরকার এমন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, যেখানে রোগীর মুখে ভাষা থাকুক, স্বাস্থ্যকর্মীর মনে শ্রদ্ধা থাকুক এবং নীতিনির্ধারকদের কানে শ্রবণশক্তি থাকুক। কেননা, একটি শক্তিশালী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা শুধু ভবন, ওষুধ বা প্রযুক্তিতে দাঁড়িয়ে থাকে না। এটির শক্ত অবস্থান জনগণের আস্থা, অংশগ্রহণ ও সম্মিলিত দায়বদ্ধতার ওপর। আজ যদি সত্যিই চাই, জনস্বাস্থ্য জনগণের জন্য হোক– আমাদের শুধু ‘জনগণের জন্য কাজ’ করলে হবে না, বরং ‘জনগণকে সঙ্গে নিয়ে কাজ’ করতে হবে। 

মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম: জনস্বাস্থ্য ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ; শিক্ষক, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ

আরও পড়ুন

×