ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নৃ-মুখ

ধানমন্ডি ৩২ কেন রাজনীতির জুজু

ধানমন্ডি ৩২ কেন রাজনীতির জুজু
×

জোবাইদা নাসরীন

জোবাইদা নাসরীন

প্রকাশ: ২২ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:২৩ | আপডেট: ২২ নভেম্বর ২০২৫ | ১২:১৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

গত মার্চ মাসে শ্যামলী থেকে পাবলিক বাসে ফিরছিলাম। শুক্রাবাদ পার হওয়ার পরই বাসের হেলপার বলতে থাকলেন– ধানমন্ডি ৩২ নামেন। একজন যাত্রী বললেন, ‘এখনও ধানমন্ডি ৩২ বলেন কেন ভাই?’ হেলপার খুব সহজভাবেই বললেন, ‘এটা তো বলাই লাগব আজীবন। বাড়িতে কী আসে যায়?’ আসলেই তাই। একসময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবন হলেও ধানমন্ডি ৩২ নিছক একটি বাড়ি নয়। তবে এটিকে বাড়ি ভেবেই কিছু মানুষ বারবার তা ভাঙছে।

বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্জনের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি আগে কখনও এতটা বৈরিতার শিকার হয়নি। এমনকি পাকিস্তান সরকারও তা ভাঙেনি। গত বছরের ৫ আগস্ট আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করার পর ৩২ নম্বরের ওই বাড়িতে হামলা চালিয়ে লুটপাট ও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ৩২ নম্বর বাড়িটি বহু বছরই ছিল একটি জাদুঘর, যেখানে রক্ষিত ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অনেক কিছু এবং বঙ্গবন্ধুর অনেক স্মৃতিচিহ্ন। গত ৫ ফেব্রুয়ারি সরকারের অনেকটা সরব না হলেও মৌন সম্মতিতেই ‘বুলডোজার মিছিল’ কর্মসূচি থেকে বাড়িটির অর্ধেকের বেশি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। মৌন সম্মতি এ জন্য যে, প্রথমে পুলিশের সঙ্গে সেনাসদস্যরা এতে বাধা দিলেও এক পর্যায়ে তারা নীরব দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।

এর পরের ঘটনা গত ১৫ আগস্টের। সেদিন রিকশাচালক আজিজুর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে ফুল দিতে গিয়ে গণপিটুনির শিকার হয়েছিলেন। পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে চর্চিত জুলাই আন্দোলনের এক হত্যাচেষ্টা মামলায় আটক দেখায়। আদালতও তাঁকে জেলে পাঠান। তবে সামাজিক মাধ্যমে এ নিয়ে হইচই শুরু হলে আজিজুর জামিন পেয়েছিলেন।  

গত ১৩ নভেম্বর ৩২ নম্বরে গিয়ে জয় বাংলা স্লোগান দেওয়ার কারণে আরেক গৃহবধূকে আজিজুরের ভাগ্য বরণ করতে হয়। তবে জনপরিসরে সমালোচনার মুখেও পুরোনো এক হত্যাচেষ্টা মামলায় তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়, জামিন এখনও মেলেনি।

ওই ঘটনার রেশ না ফুরোতেই গত ১৭ নভেম্বর ৩২ নম্বর আবারও হামলার শিকার হয়। ওই দিন মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এ রায়ের পর দুপুরের দিকেই আবারও দুটো বুলডোজার নেওয়া হয় সেখানে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ‘রেড জুলাই’ নামে একটি সংগঠনের পক্ষ থেকে সেখানে বুলডোজার দুটি নেওয়া হয় বাড়িটি নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে সেখানে খেলার মাঠ বানানো হবে বলে। তবে এবার পুলিশ বেশ তৎপর ছিল। সেনাবাহিনীও ছিল। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, পুলিশ-সেনাবাহিনীর সঙ্গে ভাঙচুরকারীদের বেশ কয়েক ঘণ্টা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলে। মনে হয়েছে, রায়ের চেয়ে ‘রেড জুলাই’য়ের মনোযোগ সেই ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে থাকা ধানমন্ডি ৩২-এর দিকে। 

এদিন অবশ্য আরেকটা ঘটনা ঘটে বেশ গোপনীয়তার সঙ্গে। সেটি হলো চট্টগ্রামের লালদিয়ায় নতুন বন্দর নির্মাণ এবং চট্টগ্রাম বন্দরের মালিকানাধীন পানগাঁও অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মিনাল (পিআইটিসি) পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ডেনমার্ক ও সুইজারল্যান্ডভিত্তিক দুটো কোম্পানির কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। এর সঙ্গে ৩২ নম্বর ভাঙার শেষ দফার উদ্যোগের কোনো যোগসূত্র থাকলেও থাকতে পারে।

প্রশ্ন হলো, গত এক বছরে কেন বারবার টার্গেট হচ্ছে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়িটি? আগুনে পোড়ানো হয়েছে, স্বস্তি মেলেনি। বুলডোজার দিয়ে বেশির ভাগ অংশই গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে; তাতেও স্বস্তি নেই। একেবারেই নিশ্চিহ্ন করতে হবে! 

প্রসঙ্গত, এই বাড়ির সেই পোড়া ইট সংগ্রহ করে নিজের কাছে রেখেছে এক কিশোর। তা করতে গিয়ে মব ও পুলিশের হাতে কম হেনস্তা হয়নি ছেলেটি। তা দেখে যেন ৩২ নম্বর নিয়ে ওই ভাঙচুরকারীদের ভয় আরও বেড়ে গেছে। 

কিন্তু ভয় কীসের? সেই বাড়িটি আর বাড়ির কাঠামোতেই নেই। সেই বাড়িটি এখন ধ্বংসস্তূপ। কিন্তু সেটি কেন এখনও শক্তিশালী? আগুন লাগিয়ে, বুলডোজারে ভেঙে দিয়েও কেন ভয় কাটে না? কেন সেই ভাঙা স্তূপকে এখনও পাহারা দিতে হয়? তার মানে হলো, এই বাড়ির প্রতিটি ইট, মাটি, সুরকি শুধু বাড়ির উপকরণ নয়। এগুলোকেই ভয় পাচ্ছে একটা গোষ্ঠী। তারা এটা জানে, বাড়ির দালান ভাঙলেও আজিজুররা এখানে ফুল নিয়ে আসে; গৃহবধূ সালমা ইসলাম সেখানে গিয়ে জয় বাংলা স্লোগান দেয়; কিশোর নিজন আমিন খান সেই বাড়ির ধ্বংসস্তূপ থেকে পোড়া ইট সংগ্রহ করতে যায়। গৃহবধূ সালমা ও নিজন দুজনকেই নিয়ে যাওয়া হয় থানায়। নিজন মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পায়। 

সব ইট পুড়ে ছাই হয়ে গেলেও ৩২ নম্বর বাংলাদেশের মানুষের মনোজগতে এমন একটি স্মৃতি, যা অমোচনীয় কালি দিয়ে আঁকা। এখন পর্যন্ত এ দেশের মানুষের শ্রেষ্ঠতম অর্জন মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাওয়া বাংলাদেশ। ধানমন্ডি ৩২ নম্বর মানুষকে সেই স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দেয়। এটা ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; বাড়িটির কথা এ দেশের বেশির ভাগ মানুষ জানে। তাই মানুষবিহীন পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়া কয়েকটি পিলারকেই এত ভয় হয়। তা না হলে কয়েকদিন পরপর কেন সেটিকে ঘিরেই এত উত্তেজনা তৈরি হয়? এই উত্তেজনার ভেতরে কী তাড়না কাজ করে?

ধানমন্ডি ৩২ নিয়ে অযথা এই ‘রাজনৈতিক অস্বস্তি’ ৩২ নম্বরকে রাজনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী করছে। কারণ এতে মানুষের সহানুভূতি ৩২-এর দিকেই যাচ্ছে। 

সরকার বেশ কয়েক মাস আগেই নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে এবং সেই হিসাবে দেশে আওয়ামী লীগ নেই। তাহলে এই ‘নেই’-এর দেশে কেন ৩২ নম্বরকে এতটা ভয় হচ্ছে?

জোবাইদা নাসরীন: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
 [email protected]

 

আরও পড়ুন

×