ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অর্থনীতি

মূল্যস্ফীতির হার গণনায় সমস্যা কী

মূল্যস্ফীতির হার গণনায় সমস্যা কী
×

সাইফুল হোসেন

সাইফুল হোসেন

প্রকাশ: ২৩ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:২৮ | আপডেট: ২৩ নভেম্বর ২০২৫ | ১১:৪৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে সম্প্রতি সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী মূল্যস্ফীতির (ইনফ্লেশন) হার কমে এসেছে বলে খবর বেরিয়েছে। যেমন, আগস্ট ২০২৫-এ মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ৮.২৯ শতাংশ। জুলাইয়ের ৮.৫৫ শতাংশ থেকে সামান্য কম। আমরা সাধারণ মানুষেরা বাজারে দেখি–চাল-ডাল, তেল, সবজি-মাংস, গ্যাস-বিদ্যুৎ, পরিবহন ভাড়া কোনো কিছুর দাম কমেনি, বরং বেড়েছে। যদি মূল্যস্ফীতি কমে যায়, কেন আমাদের জীবনযাপনের খরচ কমছে না? আসলেই কি মূল্যস্ফীতি কমছে নাকি গণনায় কোনো গন্ডগোল আছে?

মূল্যস্ফীতি বলতে আমরা বুঝি, একটি নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে পণ্য ও সেবার গড় দামের কতটা বেড়েছে। সহজভাবে বললে, গত বছর যে টাকায় আপনি বাজার করতেন, আজ সেই একই জিনিস কিনতে আপনাকে কত বেশি টাকা দিতে হচ্ছে, সেটিই মূলত মূল্যস্ফীতির হার। অর্থাৎ টাকার ক্রয়ক্ষমতা কমে গেলে এবং একই পণ্য কিনতে বেশি টাকা লাগলে আমরা বলি, ‘মূল্যস্ফীতি ঘটেছে’।

বাংলাদেশে এই মূল্যস্ফীতির হিসাব করে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও বাংলাদেশ ব্যাংক। তারা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে এই হার নির্ধারণ করে। সেই পদ্ধতির মূল ভিত্তি হলো একটি ‘ঝুড়ি’ বা কনজিউমার বাস্কেট, যেখানে সাধারণ মানুষ প্রতিদিন যেসব পণ্য ও সেবা ব্যবহার করেন, সেগুলোর একটি তালিকা থাকে। এই ঝুড়িতে থাকে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য–যেমন চাল, ডাল, তেল, সবজি, মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, মসলা, ফলমূল, পোশাক, বাসা ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, পরিবহন খরচ, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিনোদন এবং অন্যান্য সেবা খাতের ব্যয়। এগুলোকে বলা হয় ‘ভোক্তা মূল্যসূচক’ বা কনজিউমার প্রাইস ইনডেক্সের (সিপিআই) উপাদান।

তবে এই ঝুড়ির সব পণ্যের গুরুত্ব সমান নয়। কেউ প্রতিদিন ভাত খান, কিন্তু পোশাক কেনেন বছরে কয়েকবার। সে জন্য বিবিএস প্রতিটি পণ্যের জন্য আলাদা ওজন নির্ধারণ করে। যেমন, খাদ্যপণ্যের ওজন সবচেয়ে বেশি (প্রায় ৫৫%-এর মতো)। কারণ সাধারণ মানুষের আয়-ব্যয়ের বড় অংশই যায় খাবার কিনতে। অপরদিকে, পোশাক বা বিনোদনের খরচের ওজন অনেক কম।

এরপর সরকার দেশজুড়ে নির্দিষ্ট কিছু বাজার থেকে প্রতি মাসে পণ্যের দামের তথ্য সংগ্রহ করে। এই দামের পরিবর্তনগুলোকে আগের মাস বা আগের বছরের একই সময়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়। সব পণ্যের দাম ও তাদের ওজন অনুযায়ী গড় পরিবর্তন বের করেই হিসাব করা হয়–এক বছরে পণ্য ও সেবার দাম মোট কতটা বেড়েছে বা কমেছে।

এভাবেই পাওয়া যায় ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) এবং সেখান থেকেই নির্ধারিত হয় দেশের মূল্যস্ফীতির হার। উদাহরণস্বরূপ, যদি আগের বছরে একটি পণ্যের দাম ছিল ১০০ টাকা এবং এবার সেটি বেড়ে ১০৮ টাকা হয়, তবে সেই ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির হার হবে ৮ শতাংশ।

তবে এই হিসাব একটি গড় চিত্র দেয়; অর্থাৎ পুরো দেশের গড় বাজার পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে হার নির্ধারিত হয়। কিন্তু একজন ব্যক্তি বা একটি পরিবারের খরচের ধরন অনেকটাই আলাদা হতে পারে। যেমন, কারও আয় বেশি, তিনি হয়তো তুলনামূলক কম প্রভাবিত হন; আবার কারও আয় সীমিত, তিনি একই দামের বৃদ্ধি থেকে অনেক বেশি চাপ অনুভব করেন।

এছাড়া এই ‘ঝুড়ি’টি খুব ঘন ঘন পরিবর্তন করা হয় না। অথচ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা ও খরচের ধরনও বদলায়। আজ থেকে দশ বছর আগে যে জিনিসগুলো মানুষ বেশি ব্যবহার করত, এখন হয়তো নতুন পণ্য বা সেবা তার জায়গা নিয়েছে। যেমন–ইন্টারনেট বিল, মোবাইল ফোন, রাইডশেয়ারিং সার্ভিস বা অনলাইন শিক্ষা খরচ–এসব এখন জীবনের অংশ, কিন্তু অনেক সময় সেগুলোর প্রভাব সিপিআই ঝুড়িতে সঠিকভাবে ধরা পড়ে না। সম্প্রদায়ভিত্তিক বা আয়ভেদে খরচের ধরন অনেক ভিন্ন। গ্রামীণ এলাকার বাজার, মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত পরিবারের খরচ প্রায়ই শহরের সাধারণ মানের থেকে অনেক বেশি চাপে থাকে কিন্তু গণনায় সব গ্রাহকের খরচ একসঙ্গে গড় করে ধরা হয়। ফলে যাদের আয় কম, খরচ বেশি–তাদের বাস্তব অনুভূতি গণনায় পুরোপুরি প্রতিফলিত হয় না। তাই বাস্তব জীবনের ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারি পরিসংখ্যানের মধ্যে ফারাক তৈরি হয়। প্রশ্ন ওঠে, ‘ইনফ্লেশনের হার কমছে কিন্তু আমার বাজার খরচ বাড়ছে কেন?’

উন্নত দেশগুলোর তুলনায় আমাদের দেশে মূল্যস্ফীতি গণনার ধরনে কিছু পার্থক্য আছে। অনেক দেশে দুইভাবে হিসাব করা হয়–হেডলাইন ইনফ্লেশন (সব পণ্যের গড় দাম-বৃদ্ধি) ও কোর ইনফ্লেশন (খাদ্য ও জ্বালানির মতো বেশি ওঠানামা করা পণ্য বাদ দিয়ে বাকি দামের হিসাব)। এতে দামের আসল প্রবণতা বোঝা সহজ হয়। এছাড়া তারা নিয়মিতভাবে পণ্যের তালিকা বা ‘ঝুড়ি’ হাল নাগাদ করে; যাতে মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়। বাংলাদেশে এই আপডেট প্রক্রিয়া তুলনামূলক ধীর, তাই বাস্তব ব্যয়বৃদ্ধি পরিসংখ্যানে সবসময় স্পষ্টভাবে দেখা যায় না। 

যদি আগের কয়েক বছরের তথ্য দেখি, তাহলে দেখা যায়–২০২১ সালে মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ৫.৫৫%, ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৭.৭%। পরের বছরগুলোতেও এই হার আরও কিছুটা বেড়েছে, যেমন ২০২৩ (৯.৮১) ও ২০২৪ (১০.৮৯) সালে। এখন পরিসংখ্যান বলছে মূল্যস্ফীতি কমেছে, কিন্তু বাস্তবে সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের খরচ তো কমেনি–বরং খাবার, বাসাভাড়া, পরিবহনসহ সব খাতে ব্যয় বেড়েই চলেছে। 

মনে হয় এখন মূল্যস্ফীতি গণনায় কিছু বদল আনার সময় এসেছে। প্রথমত, ঝুড়িতে খাদ্য, ভাড়া, জ্বালানি-পরিবহন খরচের অনুপাত বাড়াতে হবে; কারণ এটি সাধারণ মানুষের খরচ-শ্রেণির বড় অংশ। দ্বিতীয়ত, শহর-গ্রাম, আয়ের শ্রেণি (উচ্চ, মধ্য, নিম্ন) অনুযায়ী পৃথক ইনফ্লেশন সূচক তৈরি করা যেতে পারে; যাতে বাস্তবতা আরও ভালো হয়। তৃতীয়ত, গণনায় ‘কোর ইনফ্লেশন’ বা খাবার-জ্বালানি বাদে দামের প্রবণতা দেখার মতো উপায় চালু করা দরকার; যাতে দামের দ্রুত ওঠানামা ও মুদ্রানীতিগত কারণগুলো চিহ্নিত হয়।

সবশেষে বলা যায়, ইনফ্লেশন শুধু একটি সংখ্যা নয়; এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের খরচপ্রবাহ এবং টাকার মূল্যমানের প্রতিফলন। আমাদের দরকার একটি গণনা পদ্ধতি; যা কেবল সংখ্যায় নয়, সাধারণ মানুষের অনুষঙ্গিক জীবনের খরচ-উপাদান এবং অনুভূত বাস্তবতা প্রতিফলিত করবে। তখন ইনফ্লেশন হার হবে কেবল কাগজের জন্য নয় বরং বাস্তব জীবনের এক প্রকৃত প্রতিবিম্ব।

সাইফুল হোসেন: ফাইন্যান্স ও বিজনেস স্ট্র্যাটেজিস্ট; দ্য আর্ট অব পার্সোনাল ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্ট, আমি কি এক কাপ কফিও খাবো না, দ্য সাকসেস ব্লুপ্রিন্ট ইত্যাদি বইয়ের লেখক
 [email protected]

আরও পড়ুন

×