ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

এনটিএমসির বিলুপ্তি বা পুনর্গঠন

প্রয়োজন ভারসাম্যমূলক পদক্ষেপ

প্রয়োজন ভারসাম্যমূলক পদক্ষেপ
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২৬ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:২১ | আপডেট: ২৬ নভেম্বর ২০২৫ | ১২:৪৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার-এনটিএমসি বিলুপ্তির বিষয়ে সরকারের মধ্যে দুইটি মত ক্রিয়াশীল বলিয়া সোমবার সমকাল যেই সংবাদ দিয়াছে, উহা অস্বাভাবিক নহে। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ চলতি মাসে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ অধ্যাদেশের খসড়ায় বহুল সমালোচিত সংস্থাটি বিলুপ্তির প্রস্তাব করিলেও ‘প্রভাবশালী’ এই প্রতিষ্ঠান-সংশ্লিষ্টরা বিনা বাক্যব্যয়ে উহা মানিয়া লইবার কথা নহে। সমকালের প্রতিবেদনে অনুমিতভাবেই বলা হইয়াছে, বিলুপ্তি প্রস্তাবে এনটিএমসিসহ বিভিন্ন সংস্থাপ্রধানের আপত্তির মুখেই বিষয়টি ঝুলিয়া রহিয়াছে। 

আমরা জানি, ২০১৩ সালে যাত্রা করা এনটিএমসি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল দেশে সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে টেলিযোগাযোগ সম্পর্কিত দিকনির্দেশনা, পর্যবেক্ষণ ও অন্যান্য সরকারি গোয়েন্দা সংস্থাকে সহযোগিতা করা। বাস্তবে বিশেষত বিগত সরকারের শেষ দিন অবধি সংস্থাটি ব্যবহৃত হইয়াছে শুধু সরকারের হইয়া নাগরিকদের ফোনকল ও ইন্টারনেটে বিভিন্ন যোগাযোগ অ্যাপে আড়িপাতা এবং ইন্টারনেট ব্যবস্থা ও ইন্টারনেট অপারেটর নিয়ন্ত্রণকার্যে। উপরন্তু সংস্থাটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন হইলেও উহার কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করিয়াছে বিশেষ একটি গোয়েন্দা সংস্থা, যাহাদের কার্যক্রম সম্পর্কেও সমালোচনা রহিয়াছে। ২০২১ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ফোনালাপ ফাঁস ও নজরদারি প্রসঙ্গে এক রিটের শুনানিতে হাইকোর্ট ব্যক্তিগত বিষয়াদিতে আড়িপাতা ঠিক নহে বলিয়া মন্তব্য করিবার পরও পরিস্থিতির ইতরবিশেষ হয় নাই। এই প্রেক্ষাপটেই সংস্থাটিকে নূতন বিধিমালার অধীনে বেসামরিক কর্তৃপক্ষের আওতায় আনয়নের দাবি উঠিয়াছে।
অন্যদিকে, ১৭ নভেম্বর আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত কোর কমিটির সভায় একটা সংস্থাপ্রধান এনটিএমসি বিলুপ্তির ফলে তাহাদের নজরদারি কার্যক্রম দুর্বল হইবার যেই আশঙ্কা প্রকাশ করিয়াছেন, উহাও উপেক্ষণীয় নহে। দেশবিরোধী কিংবা গুরুতর অপরাধে লিপ্ত সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে আদালতের মাধ্যমে নজরদারি চালাইবার ব্যবস্থা লইতে দীর্ঘসূত্রতার কারণে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ কঠিন হইবে বলিয়া উক্ত সভায় সরকারি বিভিন্ন সংস্থাপ্রধানের বক্তব্যও প্রণিধানযোগ্য। মাদক কারবারিসহ দুর্ধর্ষ অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান সফল করিতে হইলে অপরাধে যুক্ত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর উপর নজরদারির গুরুত্বও অস্বীকার করা যায় না।

আমরা মনে করি, প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রীয় নজরদারি বিষয়ে ভারসাম্যপূর্ণ পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, এই বিষয়ে এমন আইন প্রণয়ন করিতে হইবে, যাহা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, তৎসহিত নাগরিকদের ব্যক্তিগত বিষয়ের সুরক্ষাও নিশ্চিত করিবে। অতঃপর সেই আইনের ভিত্তিতে হয় এনটিএমসির পুনর্বিন্যাস করিতে হইবে, নতুবা তৎস্থলে নূতন প্রতিষ্ঠান গড়িয়া তুলিতে হইবে। যাহাই ঘটুক, সংবিধানে বর্ণিত নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার নীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা বাঞ্ছনীয়।

আমরা জানি, সংবিধানের ৪৩ অনুচ্ছেদে নাগরিকদের ব্যক্তিগত ও অন্যান্য যোগাযোগের ক্ষেত্রে গোপনীয়তার অধিকার নিশ্চিতকরণের কথা বলা হইয়াছে। উক্ত অনুচ্ছেদে স্পষ্টাক্ষরে লিপিবদ্ধ– রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, জনসাধারণের নৈতিকতা বা জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে প্রত্যেক নাগরিকের (ক) প্রবেশ, তল্লাশী ও আটক হইতে স্বীয় গৃহে নিরাপত্তা লাভের অধিকার থাকিবে; এবং (খ) চিঠিপত্রের ও যোগাযোগের অন্যান্য উপায়ের গোপনীয়তা রক্ষার অধিকার থাকিবে। সন্দেহ নাই, সাম্প্রতিক দশকগুলিতে সমগ্র বিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশেও যোগাযোগের ক্ষেত্রে ব্যাপক ডিজিটাইজেশন ঘটিয়াছে, যাহা অপরাধীদেরও অগম্য নহে। সেই হিসাবে সংবিধানের উক্ত অনুচ্ছেদ আক্ষরিক অর্থে অনুসরণ করা কঠিন। কিন্তু আইনের ক্ষেত্রে যদ্রূপ ইহার মর্মবস্তু অনুধাবনই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ, তদ্রূপ এনটিএমসি সম্পর্কিত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও সংবিধানের উক্ত অনুচ্ছেদের মর্মবস্তু অক্ষুণ্ন রাখা বাঞ্ছনীয়। অর্থাৎ কোনো অবস্থাতেই ঢালাওভাবে নাগরিকদের যোগাযোগ প্রক্রিয়ায় আড়িপাতা এবং ইন্টারনেট ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা যাইবে না। অপরিমিত ক্ষমতা এই প্রকার প্রতিষ্ঠানকে কীভাবে দানবীয় করিয়া তুলিয়াছিল; আওয়ামী লীগের গত এক দশকে আমরা দেখিয়াছি। উহার পুনরাবৃত্তি কাম্য নহে। এই ক্ষেত্রে আরও আলোচনা হউক; ইস্যুটি ঝুলিয়া থাকুক। ঘটিলে বিলম্ব ক্ষতি কিবা তাহে, আসুক দারুণ কিছু জনগণ যা চাহে।

আরও পড়ুন

×