ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

গণমানুষের সংস্কৃতির বিপন্নতা এবং রাষ্ট্রীয় দায়

গণমানুষের সংস্কৃতির বিপন্নতা এবং রাষ্ট্রীয় দায়
×

শাহেরীন আরাফাত

শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ: ২৬ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:২৫ | আপডেট: ২৬ নভেম্বর ২০২৫ | ১২:৪৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

গত ১৯ নভেম্বর প্রখ্যাত পালাকার ও বয়াতি আবুল সরকারকে কথিত ধর্ম অবমাননার অভিযোগে আটক ও পরদিন গ্রেপ্তার দেখানো হয়। আদালত প্রাঙ্গণে তাঁর ভক্তদের ওপর হামলা করা হয়। পালাগানে তিনি ‘জীব’ ও ‘পরম’ রূপক ব্যবহার করে যে গভীর দার্শনিক বিতর্ক উপস্থাপন করেছিলেন, তা না বুঝেই বা উদ্দেশ্যমূলক খণ্ডিত অংশ প্রচার এবং তাঁকে ‘ইসলামবিদ্বেষী’ আখ্যা দেওয়া হয়। অথচ এই বয়াতিরাই যুগে যুগে আল্লাহ ও রাসুলের (সা.) শানে সর্বোচ্চ ভক্তিপূর্ণ সংগীত ও পালা রচনা করেছেন।

আমরা জানি, জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক দিগন্তের সূচনা করেছিল। ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের মধ্য দিয়ে বাকস্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও ধর্মীয় সম্প্রীতি নিয়ে মানুষের মনে নতুন প্রত্যাশা জেগে উঠেছিল। কিন্তু অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মাজার ও সুফি সাধকদের দরবারে ধারাবাহিক হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ সেই প্রত্যাশায় বড় আঘাত হেনেছে। এগুলো কেবল বিচ্ছিন্ন ধর্মীয় সহিংসতা নয়; বরং বাংলার হাজার বছরের সহনশীল সংস্কৃতি, গণমানুষের আধ্যাত্মিক ভাবচর্চা এবং গুরুত্বপূর্ণ গণপরিসরের ওপর সুগভীর রাজনৈতিক আক্রমণ। সম্প্রতি বয়াতি আবুল সরকারের গ্রেপ্তার এবং প্রতিবাদী বাউলদের ওপর হামলা এতে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে।

বিশ্বাসের বিরোধ, নাকি ফৌজদারি অপরাধ
জুলাই-পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে মাজার ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের মচ্ছব কোনো সাধারণ ধর্মতত্ত্বের বিতর্ক নয়। এটি সুস্পষ্টভাবে ফৌজদারি অপরাধ। এমনকি মানুষের লাশ কবর থেকে তুলে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। এগুলো কেবল ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত নয়; দেশের প্রচলিত আইন ও মানবাধিকারের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন। অথচ অপরাধীদের দমনে কার্যকর ভূমিকা দেখা যায়নি, যা প্রকারান্তরে অপরাধীদের আশকারা দেওয়া। রাষ্ট্রের কাঠামোগত কোনো পরিবর্তন না হওয়ায় ধর্মবাদী গোষ্ঠী শক্তিশালী হয়েছে। যে কারণে তারা এ ধরনের কর্মকাণ্ড ব্যাপক হারে ঘটিয়ে যাচ্ছে। আগে যে কাউকে ‘জঙ্গি’ ট্যাগ দেওয়া হতো; এখন ‘ধর্ম অবমাননাকারী’ ট্যাগ দেওয়া হচ্ছে। এসব অপরাধের পরও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কার্যকর হতে দেখা যাচ্ছে না। পুলিশ বাহিনীকে সংস্কারের কথা বলা হলেও অন্তর্বর্তী সরকার সে পথে দৃঢ়তার সঙ্গে অগ্রসর হয়নি। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, পুলিশ সর্বদা শাসক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করেছে। পুলিশকে দুর্বল রাখার একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে ভবিষ্যতে বৃহৎ বহুজাতিক স্বার্থ বা পরাশক্তির এজেন্ডা বাস্তবায়নে বাহিনীকে ব্যবহারের পরিকল্পনা। 

এক ফ্যাসিস্টের পতন, আরেক ফ্যাসিস্টের উত্থান
দেশে মাজার ভাঙার প্রবণতাকে রাজনৈতিক পালাবদলের প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে। দেড় দশকের ফ্যাসিস্ট শাসনামলে মাজারকেও রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। সেই জাতিবাদী ফ্যাসিবাদের পতনের পর সৃষ্ট শূন্যতায় ধর্মবাদী ফ্যাসিস্ট শক্তি নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তারা মূলত একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। সরকারের উচিত ছিল এই অনিবার্য প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সচেতন ও প্রস্তুত থাকা; কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছে।

গণতান্ত্রিক ‘গণপরিসর’ মাজার
মাজারকে কেবল ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে ভুল হবে। এগুলো নির্দিষ্ট কোনো ধর্মাবলম্বীর উপাসনালয় নয়। মাজার হলো বাংলার এক অনন্য ‘গণপরিসর’। এখানে রয়েছে ধর্ম-বর্ণ-গোত্র এবং আস্তিক-নাস্তিক নির্বিশেষে সকল মানুষের অবাধ যাতায়াত। এটি এমন একটি জায়গা, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের কঠোর অনুশাসনের বাইরে গিয়ে মানুষ তার আধ্যাত্মিক তৃষ্ণা মেটায়। জীবনের গূঢ় প্রশ্নগুলো নিয়ে ভাবচর্চা করে। এটি আমাদের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির এক মূর্ত রূপ। এসব গণপরিসর ধ্বংস করার অর্থ হলো দেশের গণতন্ত্রের সামাজিক ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেওয়া। মাজারের এই সর্বজনীন চরিত্রটিই উগ্র ধর্মবাদী গোষ্ঠীর চক্ষুশূলের কারণ।

সাংস্কৃতিক সংগ্রাম ও বিদেশি এজেন্ডা
দেশের সাম্প্রতিক সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের পেছনে বিভিন্ন বিদেশি শক্তির এজেন্ডাও থাকতে পারে। এই শক্তিগুলো ইসলামকে সংস্কৃতিবিমুখ ধর্ম হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়। তারা প্রমাণ করতে চায়– ইসলামে ইহজাগতিকতা, শিল্প-সাহিত্য বা দর্শনের স্থান নেই। এর উদ্দেশ্য হলো, ইসলামকে বৈপ্লবিক সত্তা থেকে বিচ্যুত করে কেবল পরকালবাদী আচারসর্বস্ব ধর্ম হিসেবে চিত্রিত করা। এটি শেষ পর্যন্ত লুটেরা-মাফিয়া শ্রেণি এবং বৈশ্বিক পুঁজিবাদের স্বার্থই রক্ষা করে। কারণ আচারসর্বস্ব ইসলাম কখনোই জুলুম ও শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় না।

করণীয় ও ভবিষ্যৎ
মাজার ভাঙা এবং ভক্ত-ফকির-পাগলদের ওপর এই আক্রমণ কেবল নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সমস্যা নয়; আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সংকট। এই মুহূর্তে সরকারের প্রধান দায়িত্ব হলো, অবিলম্বে সমস্ত মাজার ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে জড়িত অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত মাজারগুলো সরকারি উদ্যোগে পুনর্নির্মাণ করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকেও তাদের সুবিধাবাদী ভোটের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট নীতিগত অবস্থান নিতে হবে।

সর্বোপরি, জনগণকে অনুধাবন করতে হবে– ইসলাম আচারসর্বস্ব, ইহজাগতিকতাবিরোধী ধর্ম নয়। রাসুল (সা.) নিজে জালিমের বিরুদ্ধে লড়াই করে ইনসাফের সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছেন। ইসলামের এই বিপ্লবী ও মানবিক রূপ ধারণ করতে হবে এবং বাংলার হাজার বছরের সহনশীল সুফি ঐতিহ্য ও গণতান্ত্রিক গণপরিসরগুলো রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায় এক ফ্যাসিবাদের কবল থেকে মুক্তি পেয়ে আমরা আরেক ফ্যাসিবাদের শিকলে বন্দি হয়ে পড়ব। 

শাহেরীন আরাফাত: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, সমকাল

আরও পড়ুন

×