ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আন্তর্জাতিক

ট্রাম্পের দোদুল্যমানতায় তাইওয়ানকে পেয়ে বসছে চীন

ট্রাম্পের দোদুল্যমানতায় তাইওয়ানকে পেয়ে বসছে চীন
×

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ০১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৯:১০ | আপডেট: ০১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১২:৫৩

কুৎসা রটনা, ঐতিহাসিক পক্ষপাত এবং পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝির কারণে সৃষ্ট নিছক অজ্ঞতা প্রায়ই আন্তর্জাতিক সংঘাতে স্ফুলিঙ্গ হিসেবে ইন্ধন জোগায়। যদি অ্যাডল্‌ফ হিটলার মার্কিন শিল্পশক্তির প্রকৃত পরিধি বুঝতে পারতেন, তাহলে কি তিনি ১৯৪১ সালে ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতেন? যদিও তিনি স্পষ্টত যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলেন।

১৯৭৯ সালে যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান আক্রমণ করে, তখন স্পষ্টতই তাদের কোনো ধারণা ছিল না– তারা কী অবস্থায় পড়তে চলেছে। অপমানজনক পরাজয় তাদের পরবর্তী ভাঙনে বিরাট অবদান রেখেছিল। ১৯৯০ সালে ইরাকের সাদ্দাম হোসেন এই বিশ্বাসে কুয়েত আক্রমণ করেন– তিনি হোয়াইট হাউস থেকে সবুজ সংকেত পেয়েছেন। এসব ক্ষেত্রে বোকামি ভয়াবহ ভুল সিদ্ধান্তের জন্ম দেয়, যা মারাত্মক পরিণতি নিয়ে আসে।

পশ্চিমা গণতন্ত্রের সঙ্গে চীনের ভেঙে পড়া সম্পর্কও একই রকম বিপজ্জনক গুপ্ত সংকটের মুখোমুখি। চীনা শাসনের অধীনে তাইওয়ানের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশ্বস্ত করার উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে ‘এক্সপ্লেইনার’ নিবন্ধের সাম্প্রতিক প্রকাশনায় পারস্পরিক জ্ঞানের এই অভাবকে হাস্যকরভাবে তুলে ধরেছে।

উক্ত নিবন্ধে বলা হয়েছে, চীন যদি সরাসরি দায়িত্ব না নেয় তখন পরীক্ষিত ‘দেশপ্রেমিক’ হংকংয়ের আদলে বেইজিং-অনুমোদিত শাসন ব্যবস্থায় তাইওয়ান পরিচালনা করবে। আবার বলুন? তাইপে ও পশ্চিমের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে হংকং হলো দুঃস্বপ্নের দমন, নৃশংস নিরাপত্তা আইন, সেন্সরশিপ আর ১৯৯৭ সালে ব্রিটেনের কাছ থেকে হস্তান্তরকালে লঙ্ঘন করা চীনা প্রতিশ্রুতির একটি সতর্কতামূলক গল্প।

এমনকি সবচেয়ে অন্ধ কমিউনিস্ট গোষ্ঠীও ভাবতে পারে, তাইওয়ানের নাগরিকরা যারা তাদের গণতন্ত্র এবং কার্যত সার্বভৌম স্বাধীনতাকে লালন করে, স্বেচ্ছায় এই পথ অনুসরণ করবে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে, শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্য বিচ্ছিন্নতাবাদীদের লন্ডভন্ড করা হবে। এটা স্পষ্ট– যদিও বেইজিং এটা বুঝতে পারে না।

ঐতিহ্যগতভাবে মার্কিন সমর্থিত তাইওয়ানের ওপর চীনের অবিরাম অবরোধ এখন জোরালো সামরিক চাপের পাশাপাশি এগিয়ে যাচ্ছে। দ্বীপটিকে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার জন্য এবং তাদের পশ্চিমাপন্থি, নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করার চেষ্টা বেড়েই চলেছে, যেখানে ব্যবহার হচ্ছে গুপ্তচরবৃত্তি, সাইবার-নাশকতা, গণনজরদারি এবং বোকামিপূর্ণ মিথ্যা, ষড়যন্ত্র ও বিভ্রান্তিকর তথ্য। 

গত সপ্তাহে প্রতিরক্ষা ব্যয় ৪০ বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়ে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, সংযুক্তির হুমকি ‘তীব্রতর হচ্ছে’। ইউক্রেনের মতো তারাও রাশিয়ার অনুরূপ চাপের মুখোমুখি এবং একইভাবে মার্কিন সমর্থনের বিষয়ে অনিশ্চিত। লাই বলেন, সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি হলো, ভীতসন্ত্রস্ত তাইওয়ানিরা কেবল হাল ছেড়ে দেবে।

বিশ্লেষক হ্যাল ব্র্যান্ডস লিখেছেন, “চীনা নেতা শি জিনপিংয়ের প্রথম পছন্দ হলো একটি ধ্বংসাত্মক, অপ্রত্যাশিত যুদ্ধ ছাড়াই জয়লাভ করা। ‘তার পদ্ধতি হলো বলপ্রয়োগ বৃদ্ধি। এটি এক ধরনের ক্ল্যাসিক ‘অ্যানাকোন্ডা কৌশল’, যা তাইওয়ানের আত্মসমর্পণ না হওয়া পর্যন্ত ক্রমশ কঠোর হতে থাকবে। বিচ্ছিন্নতা এবং নৈতিক অবক্ষয় শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণের জন্ম দেবে; আর এ চিন্তাভাবনা দেখা যাচ্ছে।”

ব্র্যান্ডস ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, জবরদস্তি ব্যর্থ হলে শি তারপরও সামরিক শক্তি ব্যবহার করবেন। কিন্তু চীনের মূল লক্ষ্য ছিল ‘তাইওয়ানে এই ধারণা তৈরি করা– চীনা শক্তি অপ্রতিরোধ্য। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে এই বিশ্বাস গড়ে তোলা, হস্তক্ষেপ অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এর মাধ্যমে তাইওয়ানের জনগণকে একদিন বিশ্বাস করানো– তাদের সর্বোত্তম বিকল্প হলো লড়াই না করেই হাল ছেড়ে দেওয়া।’

ঐতিহাসিক শত্রুতার মূলে থাকা রাজনৈতিক বোকামি গত এক দশকের মধ্যে চীন-জাপান সম্পর্কের সবচেয়ে উত্তপ্ত সংকটের ইন্ধন জোগাচ্ছে। জাপানের নবনির্বাচিত ডানপন্থি প্রধানমন্ত্রী সানে তাকাইচি সংসদে এক এলোমেলো প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে এটি বিস্ফোরিত হয়। তিনি বলেন, সামরিক উপায়ে চীনা আক্রমণ থেকে তাইওয়ান এবং নিকটবর্তী বাণিজ্য পথগুলোকে রক্ষা করা একটি অস্তিত্বগত সমস্যা, যা ‘জাপানের অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ’।

উগ্রপন্থি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবের শিষ্য তাকাইচি, যিনি কেবল সেই কথাই বলছিলেন, যা তিনি এবং অনেক জাপানি দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বাস করে আসছেন; কিন্তু রেকর্ডে তা জোরেশোরে আনুষ্ঠানিকভাবে উঠে এসেছিল। উত্তপ্ত চীন দ্রুত নিষেধাজ্ঞা এবং বয়কট আরোপ করে। উভয় পক্ষই বিতর্কিত দ্বীপপুঞ্জের দিকে সামরিক সরঞ্জাম এগিয়ে নেয়। ওসাকায় চীনের কনসাল জেনারেল একটি টুইটে তাকাইচির ‘শিরশ্ছেদ’ করার দাবি করেছিলেন, যা পরে মুছে ফেলা হয়েছিল।

এটা ছিল ব্যতিক্রমী বোকামি। মূলত স্পষ্ট বক্তব্যের প্রতি চীনের উন্মত্ত প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত বাড়াবাড়ি, যা তাদের তাইওয়াননীতি কোথায় নিয়ে যেতে পারে তার ইঙ্গিতবহ। জরিপগুলো দেখায়, তাকাইচির বিতর্কিত আইন জনসাধারণের সমর্থন পেয়েছে, যদিও এটি প্রায় দৈব ঘটনা। কিন্তু অজ্ঞতা সুখকর কিছু নয়, মূলত সংঘাতের ঝুঁকিই খুব বেশি।

সাইমন টিসডাল: গার্ডিয়ানের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমেন্টেটর; দ্য গার্ডিয়ান থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম 

আরও পড়ুন

×