ভূমিকম্প নিয়ে ভ্রান্তি কাটাতে হবে আগে
সানজিদা মূরশেদ
সানজিদা মূরশেদ
প্রকাশ: ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৬:৫৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
নভেম্বরের ২১ তারিখ থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সংঘটিত অন্তত পাঁচটি ক্ষুদ্র থেকে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল বৃহত্তর ঢাকা অঞ্চলে। স্বল্প সময়ের মধ্যে একই অঞ্চলে এতটা ভূমিকম্পের ঘটনা নিঃসন্দেহে সাধারণ মানুষকে শঙ্কিত করছে। কিন্তু ভূমিকম্প বিষয়ে কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন পেশাজীবী বা বিশেষজ্ঞের বদলে অন্যান্য পেশার অনেকেই যেভাবে ভূমিকম্পের উৎস, কারণ ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে নিজের মতো ব্যাখ্যা দিচ্ছেন, সেটা আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে তুলছে। দুঃখজনক, এর বেশির ভাগই নির্ভরযোগ্য সিসমোলজিক্যাল তথ্যের ভিত্তিতে নয়; বরং অনুমাননির্ভর ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণহীন, যা অনেক ক্ষেত্রে বিভ্রান্তিরও জন্ম দিচ্ছে। ভূমিকম্প নিয়ে এই যে বিভিন্ন পেশার মানুষের ব্যাখ্যা ও বিভ্রান্তি, সেটাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে কাঠামোগত বিষয় হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
যেমন, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর (বিএসডি) বর্তমানে ভূমিকম্পের আপডেট প্রকাশ করে। কিন্তু ভূমিকম্প হলো ভূতাত্ত্বিক দুর্যোগ; আবহাওয়াজনিত নয়। তাই ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও তথ্য প্রদানের প্রধান কর্তৃপক্ষ হওয়া উচিত জিওলজিক্যাল সার্ভে অব বাংলাদেশ (জিএসবি)। জিএসবিতে একটি বিশেষায়িত শাখা বা একটি ডেডিকেটেড সেল গঠন করা যেতে পারে, যারা শুধু ভূমিকম্প-সংক্রান্ত বিস্তারিত গবেষণা, তথ্য বিশ্লেষণ ও ঝুঁকি মূল্যায়ন নিয়ে কাজ করবে।
আবার দেখা যায়, ভূমিকম্পের পরপর ভূতত্ত্ববিদদের কদর বাড়লেও গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সিদ্ধান্ত যেমন বিল্ডিং কোড প্রণয়ন বা অবকাঠামোগত স্থায়িত্বের মান নির্ধারণ– এসব ক্ষেত্রে তাদের দক্ষতা প্রায়ই উপেক্ষিত হয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ভূতত্ত্ববিদদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও তাদের অন্তর্ভুক্তি খুবই কম। এ অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন হওয়া দরকার।
আমরা যে গ্রহে বাস করি, তার উপরিভাগ ও ভূগর্ভে চলমান প্রক্রিয়া সম্পর্কে সবারই একটি পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি। তা ছাড়া বাংলাদেশের প্রায় সব বড় দুর্যোগই ভূতাত্ত্বিক অথবা পৃথিবীর প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ভূতত্ত্ব শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত নয়।
ভূমিকম্পের পর সামাজিক মাধ্যমে অকারণ আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। যেমন– ‘এই কয়েক দিনের ভেতরই আরও বড় ভূমিকম্প আসছে’ ধরনের দাবির কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। প্রকৃত পরিস্থিতি না জানার কারণে অনেকেই দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে মানসিক আঘাত ও বিভ্রান্তির শিকার হয়েছেন, যা তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করেছে। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং সামাজিক মাধ্যমে এই জাতীয় ভিত্তিহীন বার্তা প্রচার সমাজের জন্য ক্ষতিকর। এ বিষয়ে কঠোর নজরদারি এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি।
প্রশ্ন হচ্ছে, করণীয় কী? বাংলাদেশে অধিকতর ভূতাত্ত্বিক গবেষণা, বিশেষ করে দেশের সক্রিয় ফল্ট ম্যাপিং অত্যন্ত জরুর, যাতে ভূমিকম্প সৃষ্টির প্রকৃত প্রক্রিয়া বোঝা যায়। ভবিষ্যৎ ভূমিকম্পের সম্ভাব্য মাত্রা নির্ধারণের ক্ষেত্রেও এই গবেষণা অপরিহার্য। পাশাপাশি ভূমিকম্প ঝুঁকির অঞ্চলভিত্তিক ম্যাপিং প্রয়োজন, যা প্রমাণভিত্তিক নগর পরিকল্পনা ও ঝুঁকি হ্রাসে সহায়ক হবে। সে জন্য ভূতত্ত্ব খাতে গবেষণা বরাদ্দ বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশে এখনও সিসমিক যন্ত্রপাতি ও রিয়েল টাইম তথ্য সংগ্রহের সক্ষমতা সীমিত। আমাদের ভূমিকম্প-সম্পর্কিত তথ্যের জন্য এখনও মূলত ইউএসজিএসের ওপর নির্ভর করতে হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী যথাযথ বা পর্যাপ্ত হয় না। আমাদের টেকটোনিক আচরণ সঠিকভাবে বুঝতে হলে আরও ঘন সিসমিক নেটওয়ার্ক, উন্নতমানের সেন্সর এবং রিয়েল টাইম মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। ভূমিকম্প বিষয়ে সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এসব ক্ষেত্রে সরকারকে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
দুর্যোগ ঝুঁকি মূলত দুটি উপাদানের ওপর নির্ভর করে– ১. ঝুঁকির উৎস ও ২. ঝুঁকিপ্রবণতা। যেহেতু আমরা ঝুঁকির উৎসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না, তাই আমাদের জোর দিতে হবে ঝুঁকিপ্রবণতা কমানোর ওপর। জাপান ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশে এটি সফলভাবে প্রমাণিত।
দুর্ভাগ্যজনক, আমাদের শহরগুলো অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে গড়ে উঠছে। অবকাঠামো নির্মাণে ভূতাত্ত্বিক পরামর্শকে উপেক্ষা এবং বিল্ডিং কোড যথাযথ অনুসরণ না করার ফলে একটি বড় ভূমিকম্প হলে ক্ষতির মাত্রা হবে বিপর্যয়কর। এসব বিষয়ের ওপর কঠোর আইন প্রণয়ন এবং তার কার্যকর প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি। তা ছাড়া সময়োপযোগী ঝুঁকি মূল্যায়নের জন্য বিল্ডিং কোড নিয়মিত আপডেট করাও আবশ্যক।
অতীত ও সাম্প্রতিক ভূমিকম্পে দেখা গেছে, শুধু ভবনধস নয়; দুর্যোগকালীন করণীয় বিষয়ে সঠিক জ্ঞান ও সচেতনতার অভাব থেকেও অনেক মৃত্যু ও আহতের ঘটনা ঘটে। তাই যথাযথ দিকনির্দেশনা অপরিহার্য। তার জন্য প্রয়োজন কমিউনিটি লেভেল গবেষণা। মানুষ আসলে ভূমিকম্প বিষয়ে কী জানে বা ভাবে, তা আগে বুঝতে হবে। তারপর তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী ড্রিল, প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি সাজাতে হবে, যাতে এগুলো অধিকতর কার্যকর হয়।
বাংলাদেশের জাতীয় পাঠ্যক্রমে ভূতত্ত্ব ও দুর্যোগ সম্পর্কিত জ্ঞানকে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সর্বস্তরে বাধ্যতামূলক অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। প্রারম্ভিক স্তর থেকেই ভূতত্ত্ব শেখানো হলে শিক্ষার্থীরা ভূ-পরিবেশ, ঝুঁকি এবং নিরাপত্তা সংস্কৃতি সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ধারণা পাবে; যথাযথ সিদ্ধান্ত নিতে পারবে এবং একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
ড. সানজিদা মূরশেদ: অধ্যাপক, ভূতত্ত বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- দুর্যোগ
