ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

দিবস

নিত্যদিনের মানবাধিকারে জনস্বাস্থ্য

নিত্যদিনের মানবাধিকারে জনস্বাস্থ্য
×

গোলাম শওকত হোসেন

প্রকাশ: ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৬:৩৮ | আপডেট: ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৪:০০

| প্রিন্ট সংস্করণ

আজ মানবাধিকার দিবস। এবারের দিবসটির প্রতিপাদ্য– ‘মানবাধিকার, আমাদের নিত্যদিনের অপরিহার্য’। নিত্যদিনের অপরিহার্য বিষয়গুলোর মধ্যে জনস্বাস্থ্য অন্যতম। ১৯৪৬ সালে জনস্বাস্থ্যকে মানবাধিকারের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে পরিগণিত করার লক্ষ্যে চিন্তাভাবনা ও কাজ শুরু হয় এবং ১৯৪৮ সালে তা সর্বজনীন মানবাধিকারের প্রথম স্তম্ভ হিসেবে দাপ্তরিক স্বীকৃতি পায় বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে। ১৯৬৬ সালে ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অব হিউম্যান রাইটসে অন্তর্ভুক্ত হয় অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার। সেখানে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়– সকল মানুষের দৈহিক, মানসিক, সামাজিক ও আবেগের সুস্থতা সুনিশ্চিত করতে হবে। তার সঙ্গে পরবর্তী সময়ে যুক্ত হয় সবার জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাদ্য, স্বাস্থ্যকর পানি। পয়ঃ ও বর্জ্য নিষ্কাশন পদ্ধতি নিশ্চিত করে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলে রোগ থেকে দূরে থাকা যাবে; সুষ্ঠু কাজের পরিবেশ তৈরি হবে; মর্যাদাপূর্ণ জীবন উপভোগ করবে ও সামাজিক হিতৈষী কাজে অংশগ্রহণে সচেষ্ট হবে। 

উন্নত বিশ্ব আজ তাদের দানশীল হাত গুটিয়ে নিচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন, বাস্তুতন্ত্র রক্ষা, অনুন্নত দেশগুলোকে উন্নয়নশীল করা ও জনস্বাস্থ্যবিষয়ক দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন থেকে। ২০১৯-২০ সালে কভিড-১৯ অতিমারি নিয়ে উন্নত বিশ্বের বহুজাতিক কোম্পানিগুলো মেডিকেল এথিক্স ও মানবাধিকারের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য করতেও ছাড়েনি। সেই সঙ্গে আমাদের দেশে মন্ত্রি-এমপিরা হোটেল মালিকদের টাকা মন্ত্রণালয় থেকে উঠিয়ে ভাগ করে নিয়েছেন অথচ জুনিয়র ডাক্তারদের পারিশ্রমিকের টাকা আজও দেওয়া হয়নি। 

গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ২০২৫ থেকে ২০৫০ সালের মাঝে মানুষের শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক ড্রাগ রেজিস্ট্যান্সের ফলে কয়েক লাখ মানুষ মারা যাবে। সুতরাং সার্টিফায়েড চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কেউ অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ খাবেন না। উপযুক্ত সম্মানীর অভাবে মেট্রোপলিটন সিটির বাইরে ২০৩০ সালের মধ্যে ১১ দশমিক ১ মিলিয়ন স্বাস্থ্যসেবা কর্মী কমে যাবে।

বাংলাদেশে প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা কর্মী আছে প্রায় ১০ জন, প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য হাসপাতালে শয্যাসংখ্যা ১ দশমিক ১১টি। হিমোগ্লোবিনের স্বল্পতায় ভুগছেন অর্ধেক সংখ্যক মা; জনসংখ্যার ১২ দশমিক ৯ শতাংশ পুষ্টিহীনতায় ভুগছেন, ধূমপানে করছেন ৩২ দশমিক ২৫ শকাংশ মানুষ। এগুলোর প্রতিকারে প্রয়োজন জনস্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনা তৈরি, সভা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, চারদিকে সরব জনমত তৈরি এবং পাঁচ গুণ যোগ্যতাসম্পন্ন নানা স্তরের স্বাস্থ্যসেবা কর্মী। এসবের জন্য প্রয়োজন প্রচুর অর্থ। কিন্তু আমাদের মতো গরিব দেশের সরকারও গরিব। আমাদের বাজেট ঘাটতি আছে। যাও আছে তাতেও হয় পুকুরচুরি। পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশনরত চিকিৎসকের মাসিক বেতন অনেক কম। অথচ পিয়নের সঞ্চয় নাকি ৪০০ কোটি টাকা, যা কোনো অধ্যাপকেরই থাকার কথা নয়। 

তার মধ্যে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা বিদেশি সাহায্য প্রায় বন্ধ। ভুয়া পরিসংখ্যান বানিয়ে বাড়িয়ে বলার ফলে মধ্যম আয়ের দেশ বানিয়ে ওষুধের দাম না বাড়তেই ঊর্ধ্বমুখী। প্রতিবছর আমাদের দেশে লাখ লাখ মানুষ ভেজাল খাবার খেয়ে নানা রোগে ভুগে এ পর্যন্ত মারা গেছে। ২০১৩ ফুড সেফটি আইনকে সংশোধন করে মৃত্যুদণ্ডে পরিণত করা উচিত, যদি মানুষকে আমরা বাঁচাতে চাই; জনস্বাস্থ্যকে সুরক্ষা করতে চাই। যদি হিউম্যান রাইটসের কোর প্রিন্সিপালগুলোকে প্রতিষ্ঠা করতে চাই তাহলে দ্রুত আইনে বিচার করতে হবে। তাতে ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট বা মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকতে হবে। তাহলে মানবাধিকার ও জনস্বাস্থ্য দুটোই 
সুরক্ষিত থাকবে।

মানবাধিকার যখন নিত্যদিনের অপরিহার্য তখন সরকারকে স্বাস্থ্যশিক্ষা কিংবা খাদ্যের মতো অপরিহার্য বিষয়ে নজর দিতেই হবে। মানুষের ভালো থাকার জন্য এগুলোর বিকল্প নেই। এর মাধ্যমে মানবাধিকার সমুন্নত হতে পারে।
 
ডা. গোলাম শওকত হোসেন: চিকিৎসক, গবেষক ও লেখক

আরও পড়ুন

×