ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আন্তর্জাতিক

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন ষড়যন্ত্রের পরিণাম যা হতে পারে

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন ষড়যন্ত্রের পরিণাম যা হতে পারে
×

মঞ্জুরে খোদা

মঞ্জুরে খোদা

প্রকাশ: ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৬:৫২

| প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বরাজনীতিতে এখন দুটি আলোচিত বিষয়ের একটি হচ্ছে ভেনেজুয়েলার সমুদ্রসীমায় মার্কিন রণতরীর অবস্থান। প্রথমটি পুরো ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ। এ দুটিরই কেন্দ্রে আছে আমেরিকা। ভেনেজুয়েলার সংঘবদ্ধ মাদক চক্র দমন ও অবৈধ অভিবাসন ঠেকানোর অজুহাত তুলে ‘অপারেশন সাউদার্ন স্পিয়ার’ নামে মার্কিন সামরিক বাহিনী ভেনেজুয়েলার উপকূলে প্রতিদিন ছোট ছোট নৌযানে হামলার মাধ্যমে মানুষ হত্যা করছে। এখন পর্যন্ত শতাধিক নাগরিককে হত্যা করা হয়েছে। তবে এত মানুষ হত্যা ও নৌযান ধ্বংস করে সামান্য মাদকও উদ্ধার করতে পারেনি। পক্ষান্তরে ভেনেজুয়েলা সরকারই ৬৪ টন মাদক জব্দ করেছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভল্কার তুর্ক এসব আক্রমণের নিন্দা করে বলেছেন, ‘ক্রমবর্ধমান মানবিক ক্ষয়ক্ষতি গ্রহণযোগ্য নয়।’ নভেম্বরে অনুষ্ঠিত কলম্বিয়ার পিপলস সোশ্যাল সামিট ওয়াশিংটনকে তাদের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদের কথা জানায়। কারাকাসে ৩৫টি দেশের আইনজ্ঞদের এক বৈঠকে এ হত্যাকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করা হয়। ন্যাশনাল ল ইয়ার্স গিল্ডের মিলিটারি ল টাস্কফোর্স এ ঘটনাকে গুরুতর যুদ্ধাপরাধ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার, সামুদ্রিক এবং সামরিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। এমনকি দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, যারা সাধারণত বিদেশনীতির প্রশ্নে অন্য পাশ্চাত্য মিডিয়ার মতো মার্কিন প্রশাসনকেই সমর্থন জোগায়, তারাও ভেনেজুয়েলায় মার্কিন আক্রমণের এ অজুহাত মানতে রাজি নয় বলে মনে হচ্ছে। প্রসঙ্গত, বিশ্বের অবৈধ মাদকের সবচেয়ে বড় ভোক্তা ও সংঘবদ্ধ মাদক চক্রের প্রধান কেন্দ্র এবং অস্ত্র সরবরাহকারী যুক্তরাষ্ট্র।  জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড ড্রাগ রিপোর্ট ২০২৫-এর প্রতিবেদন বলছে, ভেনেজুয়েলায় কোনো মাদক উৎপাদন বা প্রক্রিয়াকরণ প্রতিষ্ঠান নেই। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বৈশ্বিক মাদক উৎস মূল্যায়নেও ভেনেজুয়েলার নাম নেই।

ট্রাম্পের জন্য আরও অস্বস্তিকর হলো, মার্কিন ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ডিইএ) তার ২০২৫ সালের ন্যাশনাল ড্রাগ থ্রেট অ্যাসেসমেন্টে ভেনেজুয়েলাকে কোকেন উৎপাদক হিসেবে দেখায়নি। বরং অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকেও কোথাও এ বিষয়ে অভিযুক্ত করা হয়নি। 

এটা পরিষ্কার যে, ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণের উদ্দেশ্য ভেনেজুয়েলার সরকার পরিবর্তন। সেটি করতে পারলে তারা দেশটির মাটির নিচে থাকা বিশ্বের বৃহত্তম তেলের ভান্ডারের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে। আমেরিকার জ্বালানি-বিষয়ক তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ইআইএর হিসাবমতে, ভেনেজুয়েলায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেলের অপরিশোধিত তেলের বিশাল ভান্ডার রয়েছে, যা ইরাকের চেয়েও বেশি এবং বিশ্বের মজুতকৃত তেলের ৫ ভাগের ১ ভাগ। যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা মোট তেলের দশম উৎস ছিল ভেনেজুয়েলা। 

২০০৫ সাল থেকে ভেনেজুয়েলার ওপর যুক্তরাষ্ট্র সরকার নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে। তখন থেকেই ভেনেজুয়েলা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে তেল আমদানি বন্ধ। বর্তমান বিশ্বে ডিজেলের জোগান কমে আসছে। এর বড় কারণ হলো ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা। 
ভেনেজুয়েলায় তেল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে রাশিয়ার ক্রেতাদের ভেনেজুয়েলামুখী করে রুশ অর্থনীতিকে দুর্বল ও চাপে রাখা যাবে। কেননা, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার পরও চীন-ভারতের রাশিয়া থেকে তেল কেনার বিষয় আমেরিকার জন্য মোটেই স্বস্তিকর নয়। সেই কারণে জেনেজুয়েলার তেলের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এ প্রয়াস। 

এদিকে এমন উত্তেজনার মধ্যেই ট্রাম্প ও মাদুরো সম্প্রতি ফোনালাপ করেছেন। রয়টার্সের এক সংবাদ বলছে, মাদুরো নাকি ট্রাম্পকে বলেছেন, তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে থাকা সব মামলায় ক্ষমা পেলে তিনি ভেনেজুয়েলা ছেড়ে যেতে প্রস্তুত। কিন্তু সিএনএনের সংবাদ বলছে ভিন্ন কথা। তারা বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে দেশ ছাড়ার আহ্বান জানালে মাদুরো তা কড়া ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছেন। 

অর্থনীতিবিদ মার্ক ওয়েইসব্রট ও জেফ্রি স্যাকস দেখিয়েছেন, ২০১৭-১৮ সালের মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক সংকটকে ভয়াবহ করে তোলে। যে কারণে আনুমানিক ৪০ হাজার অতিরিক্ত মানুষের মৃত্যু হয়। তবে ২০২০ সালে জাতিসংঘের সাবেক বিশেষ দূত আলফ্রেড দে জায়াসের মতে, মৃতের সংখ্যা লক্ষাধিক হবে বলে তাঁর ধারণা। ভেনেজুয়েলার সরকার নিষেধাজ্ঞা সহ্য করে টিকে থাকার শক্তি দেখিয়েছে বলেই ওয়াশিংটন নিষেধাজ্ঞা বজায় রেখেই আক্রমণ করতে চাচ্ছে।  
বিশ্লেষকরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের সামরিক হামলার আগে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে চায়। অন্যদিকে ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদরিমো বলছেন, তারাও মার্কিন হামলা মোকাবিলায় প্রস্তুত। তাদের সব ধরনের সামরিক ইউনিট সচল। দেশজুড়ে নিরাপত্তা বাহিনী, মিলিশিয়া ও পুলিশের অংশগ্রহণে মহড়া চলছে।  

সামরিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ভূগর্ভস্থ সামরিক কৌশল, দেশীয় মিলিশিয়া ও রাশিয়া-চীনের সহায়তার উপস্থিতি যে কোনো ধরনের সামরিক তৎপরতা পরিস্থিতিকে জটিল ও ব্যয়বহুল করে তুলবে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্রাইসিস গ্রুপ, সিএসআইএস, সিএফআরের মতো প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামরিক পথ এ ক্ষেত্রে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে। সামরিক পদক্ষেপ এই অঞ্চলজুড়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া, কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রকে আঞ্চলিকভাবে আলাদা করে ফেলতে পারে। 

ড. মঞ্জুরে খোদা: লেখক-গবেষক ও 
রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আরও পড়ুন

×