ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আন্তর্জাতিক

মাদুরোকে অপহরণের পর ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ

মাদুরোকে অপহরণের পর ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ
×

মঞ্জুরে খোদা

মঞ্জুরে খোদা

প্রকাশ: ০৬ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:০৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

রাশিয়া বাদে বিশ্বের শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর প্রায় সবই হয় মার্কিন সামরিক ছাতার নিচে বা তাদের অনুগত শাসকরা পরিচালনা করছেন। ভেনেজুয়েলা তার বাইরে ছিল। শনিবার ভোরে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক নিউইয়র্কে তুলে নিয়ে গিয়ে তার নিয়ন্ত্রণও পেল মার্কিন প্রশাসন। বাকি থাকল শুধু ইরান। সেখানেও শুরু হয়েছে সরকারবিরোধী আন্দোলন। রাশিয়াকে আমেরিকা ইউক্রেনের মাধ্যমে খণ্ড-বিখণ্ড করতে চেয়েছিল, কিন্তু পারেনি। সেটা করতে পারলে বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র হতো নিয়ন্ত্রণহীন এক শক্তি। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনেজুয়েলায় আছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ তেলভান্ডার। তাদের প্রমাণিত তেলের রিজার্ভ প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল, যা রাশিয়া, আমেরিকা, কানাডা ও কুয়েতের সম্মিলিত তেলের মজুতের সমপরিমাণ প্রায়।     

যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই ভেনেজুয়েলার সরকারকে উৎখাতে তৎপর। ২০০২ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজকে উৎখাত করতে সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টাও করেছিল। মাদুরোকেও অনেকবার হত্যা ও অপহরণের চেষ্টা করে এর আগে তারা সফল হয়নি। মাদুরোকে ধরিয়ে দিতে ৫০ মিলিয়ন ডলার পুরস্কারও ঘোষণা করেছিল। 

নিকোলাস মাদুরো ২০০৬ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ক্যান্সারে শাভেজের মৃত্যুর পর ২০১৩ সালে তিনি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। 
শাভেজের সময় থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থানের কারণে তিনি আফগানিস্তান ও ইরাকে আগ্রাসনের বিরোধিতা করেন। ইরানের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতা যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষুব্ধ করে। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার পক্ষে অবস্থান করায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের আরও অবনতি হয়। ২০২৪ সালের নির্বাচনে মাদুরো পুনরায় ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে যুক্তরাষ্ট্র নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে তাঁকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে।   

মার্কিন ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ডিইএ) ২০২৫ সালের ন্যাশনাল ড্রাগ থ্রেট অ্যাসেসমেন্টে ভেনেজুয়েলাকে কোনো কোকেন উৎপাদক দেশ হিসেবে দেখানো হয়নি। মার্কিন পররাষ্ট্র বিভাগ কাল্পনিক ‘কার্টেল দে লস সোলেস’কে একটি ‘বৈদেশিক টেররিস্ট অর্গানাইজেশন’ (এফটিও) হিসেবে অভিযুক্ত করছে। তাদের মতে, এ সংস্থা নাকি মাদুরো পরিচালনা করছেন। কিন্তু ডিইএর নথিতে এর নাম নেই। কারণ বাস্তবে এমন কোনো সংগঠনের অস্তিত্ব নেই। জাতিসংঘের প্রতিবেদনেও এই সংস্থা ও মাদুরো সম্পর্কে কোনো অভিযোগের উল্লেখ নেই। 

বিশ্বের অবৈধ মাদকের সবচেয়ে বড় ভোক্তা ও সংঘবদ্ধ মাদক চক্রের প্রধান কেন্দ্র ও অস্ত্র সরবরাহকারী যুক্তরাষ্ট্র। অথচ তারাই এ নিয়ে ভেনেজুয়েলাকে অভিযুক্ত করছে! জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড ড্রাগ রিপোর্ট ২০২৫ বলছে, ভেনেজুয়েলায় কোনো মাদক উৎপাদন বা প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠান নেই। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বৈশ্বিক মাদক উৎস মূল্যায়নেও ভেনেজুয়েলার নাম নেই।

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র কোনো স্বাধীন দেশের প্রেসিডেন্টকে অপহরণ করতে পারে না। সেটা করলে তা আগ্রাসন হিসেবে বিবেচিত হবে। যুক্তরাষ্ট্র এর আগেও এমন হামলা চালিয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ১৯৮৯ সালে একইভাবে গভীর রাতে পানামায় হামলা চালিয়ে তৎকালীন সামরিক শাসক জেনারেল ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে অপসারণ করে নিয়ে এসেছিল এবং তাঁর বিরুদ্ধে একই অভিযোগ ছিল। 
জাতিসংঘ সনদের ২ (৪) ধারা অনুযায়ী অন্য দেশের ভূখণ্ডে জোরপূর্বক অভিযান চালানো নিষিদ্ধ। নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন বা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) বৈধ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকলেই কেবল তা আন্তর্জাতিকভাবে কার্যকর হয়। এক কথায় শক্তি দিয়ে এই কাজ করা গেলেও আইনের চোখে তা বৈধ নয়।

নিকোলাস মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন দেলসি রদ্রিগেজ। এখন তিনি ভেনেজুয়েলার অস্থায়ী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করছেন। মাদুরো অপহৃত হওয়ায় ভেনেজুয়েলার সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তিনি অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলা ঘিরে মার্কিন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান শিবিরে বিতর্ক এখন তুঙ্গে। ডেমোক্র্যাট সদস্যরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে ‘অসাংবিধানিক’ ও ‘একনায়কতান্ত্রিক’ বলে কঠোর সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে ট্রাম্পের অনুসারীরা একে মাদক পাচার ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক জয় হিসেবে দেখছেন।
ভেনেজুয়েলায় মাদুরোবিরোধী মার্কিনপন্থি শিবিরে যেমন আনন্দ-উৎসব চলছে, তার বিপরীতে দেশজুড়ে সরকারপন্থিদের মার্কিনবিরোধী তুমুল বিক্ষোভ চলছে। মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শুধু কারাকাসে নয়, মার্কিন মুলুক থেকে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই ব্যাপক প্রতিবাদ হচ্ছে। এই প্রতিবাদ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কতটুকু চাপে ফেলতে পারবে, তার ওপর ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছে। মার্কিন প্রশাসন শান্তিপূর্ণ সমঝোতার পথে না গিয়ে যদি বিরোধের পথ বেছে নেয়, তাহলে ভেনেজুয়েলায় গৃহযুদ্ধ অনিবার্য, যা কোনো পক্ষের জন্যই মঙ্গলজনক হবে না।

ড. মঞ্জুরে খোদা: লেখক-গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আরও পড়ুন

×