রাজনীতি
সড়ক নিরাপত্তায় ইশতেহারে চাই স্পষ্ট অঙ্গীকার
এ কে এম ওবায়দুর রহমান
প্রকাশ: ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৬:৫৫ | আপডেট: ২১ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৪২
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিশৃঙ্খল সড়কে শৃঙ্খলা কেন আনা যায়নি এই প্রশ্নটি সামনে আসলে আরেকটি প্রশ্নও চলে আসে- সেটি হলো এজন্য অতীতে রাজনৈতিক দলগুলোর কী অঙ্গীকার ছিল। দলগুলোর সদিচ্ছা কতটুকু ছিল। উত্তর সবার জানা। রাস্তা বন্ধ করে রাজনৈতিক কর্মসূচি, গাড়িবহর নিয়ে নেতাদের শোভাযাত্রা, ফুটপাত দখল বাণিজ্য কিংবা সড়কের উপর হাটবাজার বসানোর মতো কাজে জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততা সড়ক নিরাপত্তায় বরং বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে।
বিভিন্ন সময় নিরাপদ সড়কের দাবিতে যখন আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে তখন সরকার কিংবা রাজনৈতিক দলগুলোর সাময়িক টনক নড়ে, সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে নানা উদ্বেগ, উদ্যোগ ও অঙ্গীকারের কথা শুনিয়ে থাকে। তবে আন্দোলন স্তমিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভুলে যায় প্রতিশ্রুতি। রাজনৈতিক নেতৃত্বের এই মানসিকতা দীর্ঘদিনের। সড়কের সমস্যা ও করণীয়গুলো চিহিৃত হওয়ার পরও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব ও আমলাতন্ত্রের উপর নির্ভরতার কারণে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না বরং তা আরও উদ্বেগজনক মাত্রার দিকে যাচ্ছে। এর অন্যতম মূল কারণ হলো- রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার না থাকা। এ কারণে সরকারে গিয়ে সড়ক নিরাপত্তার নীতি নির্ধারণেও দুর্বলতা দেখা যায়। কার্যকর আইন প্রণয়নেও শিথিলতা প্রকট হয়ে ওঠে।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিগত ৩২ বছরে নিরাপদ সড়কের আন্দোলনে সর্বদা অঙ্গীকারবদ্ধ থেকেছে নিসচা। এই দীর্ঘ যাত্রায় বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত থেকে সাংগঠনিকভাবে নিসচার একটি দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে যে, দুর্ঘটনামুক্ত সড়ক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে সড়ক নিরাপত্তার নীতি নির্ধারণে রাজনৈতিক নেতৃত্বের জোরালো অঙ্গীকার অত্যন্ত জরুরি। রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমর্থন, প্রতিশ্রুতি, নেতৃত্ব ও সমন্বয় ছাড়া এ দুরূহ কাজ কোনোমতেই সম্ভব নয়। দলগুলো যদি তাদের ইশতেহারে বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা গ্রহণ করে এবং কার্যকর উদ্যোগ নেয়, তবে দেশের সড়ক খাতের এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট অবশ্যই কাটবে।
আক্ষেপের বিষয় হচ্ছে, অতীতে বিভিন্ন সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে নিরাপদ সড়কের বিষয়ে বিষদ না হলেও যৎসামান্য যে অঙ্গীকার করেছিল ক্ষমতায় গিয়ে তা বাস্তবায়নে তেমন অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। প্রতিবছর সড়কে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। অথচ এই খাতকে গুরুত্ব দিয়ে কোনো রাজনৈতিক দলই বিশদ পরিকল্পনা নিচ্ছে না। সড়ক নিরাপত্তাকে ‘জাতীয় অগ্রাধিকার’বিবেচনা করে এ নিয়ে রাজনৈতিকভাবে স্থায়ী অঙ্গীকার তাই এখন সময়ের দাবি।
আমরা চাই- আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোট তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে সড়ক নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিক। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে তাদের কী কী পরিকল্পনা ইশতেহারের মাধ্যমে তা জাতির সামনে তুলে ধরুক। সরকারে গেলে এ ব্যাপারে কী কী করবে- সে ব্যাপারেও সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি সামনে আনুক। প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় সড়ক নিরাপত্তায় কী করবেন- দলীয় ইশতেহারের আলোকে তা নির্বাচনী গণসংযোগের সময় ভোটারদের কাছে তুলে ধরুক। তাহলে ক্ষমতায় গেলে জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতির জবাবদিহি যেমন করতে হবে তেমনি নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কার্যকর আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করাও সহজ হবে। দেশের সড়ক নিরাপদ তখনই হবে যখন রাজনৈতিক সদিচ্ছা অটল থাকবে। বাংলাদেশ বহু সংকট থেকে উত্তরণ দেখেছে রাজনৈতিক সদিচ্ছার কারণে। সড়ক নিরাপত্তাও সেই তালিকায় যুক্ত হতে পারে, যদি নেতৃত্ব সত্যিকার অর্থেই সড়ককে মৃত্যুফাঁদ থেকে মুক্ত করার ঘোষণা দেয়। সময় এসেছে রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছ থেকে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট বার্তা পাওয়ার।
ইশতেহারে কী কী থাকা দরকার
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে জাতীয় অ্যাকশন প্ল্যান প্রণয়ন, গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন, ট্রাফিক আইন বাস্তবায়নে কঠোরতা, শহরাঞ্চলে যানবাহনের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং পার্কিং ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, চালক প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, সড়ক নির্মাণে পরিকল্পিত ও বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতি অনুসরণের বিষয়গুলো থাকা জরুরি।
বৈশ্বিক পদক্ষেপেও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা জরুরি
রাষ্ট্র পরিচালনার একমাত্র অংশীদার রাজনৈতিক দলগুলোই। তাই সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক যাবতীয় প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি জটিল বিষয়, এর সঙ্গে বহুপক্ষ জড়িত। সে কারণে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বহুপক্ষীয় উদ্যোগ দরকার যার কেন্দ্রে থাকবে রাজনৈতিক নেতৃত্ব। এমনকি বৈশ্বিক সহযোগিতা ও পদক্ষেপে সমর্থন-সম্পৃক্ততাও জরুরি। আন্তর্জাতিক পরিসরে সড়ক নিরাপত্তা সংক্রান্ত নানাবিধ কার্যক্রমে বাংলাদেশের যুক্ত থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চলতি বছর মরক্কোতে সড়ক নিরাপত্তা সংক্রান্ত মারাকেশ ঘোষণাপত্র দেওয়া হয়। এটি ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে গৃহীত একটি বিশ্বব্যাপী প্রতিশ্রুতি যা ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু এবং আহতের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে অগ্রগতি ত্বরান্বিত করবে। এই ঘোষণাপত্র বিশ্বের ১০০টি দেশের মন্ত্রীদের দ্বারা অনুমোদিত যেখানে বাংলাদেশের শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান এবং নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) এর প্রতিষ্ঠাতা চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন উপস্থিত ছিলেন। ঘোষণাপত্রটি বিশ্বের বিভিন্ন সরকারকে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক অগ্রাধিকার, আরও তহবিল সংগ্রহ এবং গতিসীমা ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ, অবকাঠামোগত উন্নতি এবং প্রযুক্তির মতো পদক্ষেপ বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে।
এছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) রোডক্র্যাশকে প্রতিরোধযোগ্য একটি অসংক্রামক রোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি ৩.৬) অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী রোডক্র্যাশজনিত মৃত্যু ৫০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এজন্য এখনই দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে বাংলাদেশকে। সড়ক ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত স্বতন্ত্র সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কঠোর মনোযোগী হতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকে। তবে এটিও সত্য যে, শুধু আইন বা প্রকল্প দিয়ে সড়ক নিরাপদ হবে না। সকল মত পক্ষ, শ্রেণি ও রাজনৈতিক দলগুলোকে একযোগে একসুরে জাতির কাছে অঙ্গীকার করতে হবে।
আগামী সংসদে সকল দল মিলে সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় একমত থেকে আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। বিদ্যমান সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ সড়ক নিরাপত্তায় উল্লেখযোগ্য একটি অগ্রগতি, তবে তা যথেষ্ট নয়। এখন পৃথক সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন নিয়েও ভাবতে হবে। এছাড়া সড়ক নিরাপত্তায় প্রশিক্ষণ, চালকদের দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ, স্কুল ও কলেজ শিক্ষার্থীদের জন্য সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ, ট্রাফিক আইন মানতে রোড ক্যাম্পেইন প্রভৃতি কার্যক্রম যেমন বাস্তবায়ন করতে হবে তেমনি উন্নত দেশগুলোর মতো নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে ‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ গ্রহণ করতে হবে। শুধুমাত্র প্রশাসনিক আমলাতন্ত্র দিয়ে এসব কাজে অগ্রগতি আশা করা সম্ভব হবে না। দলমত নির্বিশেষে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সক্রিয় অংশগ্রহণ সবচাইতে জরুরি।
রাজনৈতিক সরকারের ভূমিকা কেমন চাই
সড়ক খাতে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ থেকে যুগোপযোগী সংস্কারের প্রত্যাশা ছিল দেশবাসীর। তবে বড় ধরনের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। তাই নির্বাচিত সরকারের ওপরে জনপ্রত্যাশা অনেক বেশি। সড়ক ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন, চালকদের প্রশিক্ষণ ও আইনের কঠোর প্রয়োগ জরুরি হয়ে পড়েছে। আইন কঠোরভাবে প্রয়োগে কেন্দ্রীয় টাস্কফোর্স গঠন করতে পারে সরকার। একটি শক্তিশালী সড়ক নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের অধীনে পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ, বিআরটিএ, সিটি করপোরেশনের সমন্বয় জরুরি। শিক্ষা, সচেতনতা ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। স্কুল-কলেজে সড়ক নিরাপত্তা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, স্মার্ট ট্র্যাফিক সিস্টেম, সিসিটিভি ও ডিজিটাল মনিটরিং বাড়ানো দরকার। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে একটি সমন্বিত ও কার্যকর নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থাপনার কথা ভাবতে হবে আগামী সরকারকে। গণপরিবহনের আধুনিকায়ন ও বাস রুট র্যা শনালাইজেশন চালু এবং বেপরোয়া প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে রুটভিত্তিক শৃঙ্খলা ও একীভূত টিকিটিং ব্যবস্থা কার্যকরের পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নের আশায় জাতি।
এ কে এম ওবায়দুর রহমান: সাংবাদিক ও প্রচার সম্পাদক, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)
- বিষয় :
- রাজনীতি
- সড়ক নিরাপত্তা
- সড়ক সংস্কার
