ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

শবে বরাত

মধ্য শাবানের ভাগ্যরজনি

মধ্য শাবানের ভাগ্যরজনি
×

মো. শাহজাহান কবীর

প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:০৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

ইসলামী বর্ষপঞ্জির অষ্টম মাস শাবানের মধ্যরাত্রি হলো ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’, যা আমাদের সমাজে ‘শবেবরাত’ নামে পরিচিত। শবেবরাত শব্দটি ফারসি। শব অর্থ রাত এবং বরাত অর্থ মুক্তি বা নাজাত। অর্থাৎ এটি মুক্তির রাত। এই রাতে আল্লাহতায়ালা তাঁর বান্দাদের প্রতি বিশেষ রহমত, মাগফেরাত ও দয়া বর্ষণ করেন বলে হাদিসে বর্ণিত। তাই মুসলিম উম্মাহর কাছে এই রাত অত্যন্ত গুরুত্ব ও ফজিলতপূর্ণ।
অনেক মুফাসসিরের মতে, মহাগ্রন্থ আল কোরআনে বরকতময় রাত দ্বারা শবেবরাতকেও বোঝানো হয়েছে, যেখানে পরবর্তী এক বছরের হায়াত, রিজিক, আমল ও মৃত্যু-সংক্রান্ত বিষয় লিপিবদ্ধ করা হয় (তাকদিরের ফয়সালা লওহে মাহফুজ থেকে ফেরেশতাদের কাছে অর্পণ করা হয়)।

হাদিসে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘শাবানের মধ্যরাতে আল্লাহতায়ালা তাঁর সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।’ (ইবনে মাজাহ)
এই হাদিস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, শবেবরাত হলো ক্ষমা ও আত্মশুদ্ধির রাত। তবে বিদ্বেষ, হিংসা ও শিরকের মতো গুনাহ আল্লাহর রহমত থেকে মানুষকে বঞ্চিত করে।
শবেবরাতের ফজিলত লাভ করতে হলে আমাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমল ও করণীয় রয়েছে—

তাওবা ও ইস্তিগফার: এই রাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো খাঁটি তাওবা। জীবনে করা সব গুনাহর জন্য অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া। বেশি বেশি ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ পড়া অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।
নফল নামাজ আদায়: শবেবরাতে নির্দিষ্ট কোনো নামাজ ফরজ বা ওয়াজিব নয়। তবে সাধারণ নফল নামাজ আদায় করা উত্তম। দুই রাকাত করে নফল নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করা যেতে পারে।
কোরআন তেলাওয়াত: এই বরকতময় রাতে কোরআন তেলাওয়াত করলে অন্তর প্রশান্ত হয় এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায়। সামর্থ্য অনুযায়ী বেশি বা কম তেলাওয়াত করা উচিত।
দোয়া করাএই রাতে দোয়া কবুলের বিশেষ সম্ভাবনা থাকে। নিজ, পরিবার, মৃত আত্মীয়, সমগ্র মুসলিম উম্মাহ ও মানবজাতির কল্যাণের জন্য দোয়া করা উচিত।

হিংসা-বিদ্বেষমুক্ত হওয়া: হাদিস অনুযায়ী, হিংসা ও শত্রুতা পোষণকারীরা এ রাতের ক্ষমা থেকে বঞ্চিত হয়। তাই এই রাতে অন্তর পরিষ্কার করে সবাইকে ক্ষমা করে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
পরদিন রোজা রাখা: রাসুলুল্লাহ (সা.) শাবান মাসে অধিক রোজা রাখতেন। শবেবরাতের পরদিন, অর্থাৎ ১৫ শাবান রোজা রাখা মুস্তাহাব বলে অনেক আলেম মত দিয়েছেন।
শবেবরাতে কিছু কাজ পরিহার্য– আতশবাজি, ফানুস ও অপচয়, কবরস্থানে গিয়ে অনৈসলামিক আচরণ, ভিত্তিহীন বিশ্বাস ও বিদআত গান-বাজনা ও অসংযত আড্ডা ইত্যাদি গুনাহর কাজ পরিহার করা। হালুয়া-রুটিকে শবেবরাতের প্রধান কর্ম মনে করা হয়। শরিয়তে এসব কাজের কোনো ভিত্তি নেই। নারীরা নামাজ, জিকির, কোরআন তেলাওয়াত ইত্যাদি ছেড়ে দিয়ে হালুয়া-রুটি বানানোর জন্য ব্যাকুল হয়ে যান। যেন হালুয়া-রুটি ছাড়া শবেবরাতের ইবাদত কবুলই হবে না। এগুলো কোনোভাবেই 
কাম্য নয়।
শবেবরাত মুসলমানদের কাছে পবিত্র রমজান মাসের আগমনী বার্তারূপেও গণ্য হয়। এ রাতের দুই সপ্তাহ পর শুরু হয় রমজান। ফলে মুসলিম সমাজে শবেবরাতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় সিয়াম সাধনার প্রস্তুতি।
শবেবরাত কেবল একটি আনুষ্ঠানিক রাত নয়; এটি নিজেকে বদলে ফেলার সুযোগ। এই রাতে আল্লাহতায়ালা বান্দাকে ক্ষমা করতে প্রস্তুত থাকেন, শুধু প্রয়োজন খাঁটি নিয়ত ও বিশুদ্ধ অন্তর। তাই আসুন, আমরা শবেবরাতকে গুনাহ মাফের রাত হিসেবে গ্রহণ করি, নিজেদের সংশোধন করি এবং আল্লাহর দিকে ফিরে যাই। আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে এই বরকতময় রাতের পূর্ণ ফজিলত অর্জনের তাওফিক দান করুন।

ড. মো. শাহজাহান কবীর: চেয়ারম্যান, 
ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, 
ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

আরও পড়ুন

×