ঢাকা সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

রাজনীতি

ঐতিহাসিক এই নির্বাচন কী উত্তরাধিকার রেখে যাচ্ছে

ঐতিহাসিক এই নির্বাচন কী উত্তরাধিকার রেখে যাচ্ছে
×

ফারাহ্ কবির

ফারাহ্ কবির

প্রকাশ: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৬:৪১ | আপডেট: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৬:৪২

| প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট– গণতান্ত্রিক পালাবদলের দুটি বিশাল কর্মযজ্ঞ একই দিনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আজ। তপশিল ঘোষণার পর থেকেই রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ছে; পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বাগাড়ম্বর। চিরাচরিত কাদা ছোড়াছুড়িও চলছে পুরোদমে; সঙ্গে সহিংসতাও। এবারের সহিংসতা আগের চেয়ে কম না বেশি, সেই তর্কের চেয়েও এখন যেটা বেশি জরুরি তা হলো, নাগরিকদের গ্রাস করা বিভ্রান্তির মাত্রা, যা ক্রমশ জটিল ও ভয়ংকর হয়ে উঠছে। এই বিভ্রান্তি কিন্তু আকস্মিক নয়; পদ্ধতিগত।

সারাদেশে ভোটাররা ধোঁয়াশায় আছেন– গণভোটে আসলে তাদের কাছে কী জানতে চাওয়া হচ্ছে? ‘জুলাই সনদ’কে একটি একক প্রস্তাবনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে কেবল ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’– এই দ্বিমুখী রায় দেওয়ার সুযোগ থাকছে। কিন্তু গণতান্ত্রিক সম্মতি কি এমন নিরঙ্কুশ বা চূড়ান্ত হতে পারে? যদি একজন ভোটার সনদের কিছু দফার সঙ্গে একমত হন কিন্তু মৌলিকভাবে অন্যগুলোর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন, তার করণীয় কী? এ নিয়ে কোনো অর্থবহ ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। স্বচ্ছতার এই প্রকট অভাব গণভোটকে কি ‘সচেতন পছন্দ’-এর বদলে ‘জোরপূর্বক সম্মতি’ আদায় প্রক্রিয়ায় পরিণত করার ঝুঁকি তৈরি করছে না?

অনিশ্চয়তা আরও ঘনীভূত হয়েছে ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে চলমান গুঞ্জনে। নির্বাচন আর নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের মাঝখানে ১৮০ দিনের একটি দীর্ঘ বিরতি থাকতে পারে– এমন কথা বাতাসে ভাসলেও তা নিশ্চিত বা কঠোরভাবে নাকচ– কোনোটিই করা হয়নি। যদি এমন কোনো পরিকল্পনা থাকে, তবে তা জানার অধিকার নাগরিকদের আছে। আর যদি না থাকে, তবে স্পষ্টভাবে তা উড়িয়ে না দেওয়াটা চরম দায়িত্বহীনতা। দীর্ঘদিনের বিতর্কিত ম্যান্ডেট আর আস্থার সংকটে ভোগা একটি দেশে অস্পষ্টতা কেবল সন্দেহকেই উস্কে দেয়।
একই দিনে দুটি ভোট গ্রহণের সিদ্ধান্ত উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। একাধিক ব্যালট পেপার, ভোটারদের বোঝার জটিলতা, কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা এবং গণনা প্রক্রিয়ার সততা– সব মিলিয়ে বিশৃঙ্খলার শঙ্কা প্রবল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ফলাফলের ঘোষণা নিয়ে জল্পনা। শোনা যাচ্ছে, ফলাফল আসতে দেরি হতে পারে। রাজনৈতিক মেরূকরণের এই সময়ে ফলাফল প্রকাশে বিলম্ব কেবল ‘পদ্ধতিগত অসুবিধা’ নয়; এটি বড় গণতান্ত্রিক ঝুঁকি। অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কর্তৃপক্ষের উচিত এ বিষয়ে পরিষ্কার ব্যাখ্যা দেওয়া।

নাগরিকরা যখন এসব মৌলিক প্রশ্ন নিয়ে বিভ্রান্ত, তখন জনপরিসরের আলোচনাকে কৌশলে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে ভিন্ন খাতে।
নির্বাচনের প্রাক্কালে অনলাইনে রাজনৈতিক বিতর্কের ভাষা হয়ে উঠেছে কদর্য ও অসহিষ্ণু। স্ল্যামিং, শেমিং আর ব্যক্তিগত আক্রমণ, যার বড় একটি অংশই জেন্ডার-অসংবেদনশীল। রাজনীতি, সাংবাদিকতা বা সমাজকর্মী– জনপরিসরে সক্রিয় নারীদের লক্ষ্য করে নোংরা, অসহনশীল ও জেন্ডারবিদ্বেষী আক্রমণ চালানো হচ্ছে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। রাজনৈতিক পালাবদলের এই সন্ধিক্ষণে এটি পিতৃতন্ত্রের ধারায় ফিরে আসা বা নিজের অবস্থান জানান দেওয়ার সেই চিরচেনা কৌশল।

এই ভাষা কেবল ব্যক্তিকে আঘাত করে না, এটি নারীদের জনপরিসর থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং গণতান্ত্রিক পরিসর সংকুচিত করার পদ্ধতিগত হাতিয়ার। এই জেন্ডারবিদ্বেষ কেবল সাংস্কৃতিক নয়, পুরোদস্তুর রাজনৈতিক। এটি ভীতি প্রদর্শন করে, মনোযোগ সরায় এবং নারীদের কণ্ঠ রোধ করে। যার আড়ালে জবাবদিহি, নীতিনির্ধারণী আলোচনা আর ক্ষমতার প্রশ্নগুলো সুবিধাজনকভাবে ধামাচাপা পড়ে যায়। চারদিকে যখন হট্টগোল, ভোটারদের তখন কঠিন প্রশ্নগুলো করা থেকে বিরত রাখা হচ্ছে।

দেশের অন্যতম শীর্ষ রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও জামায়াতে ইসলামী তাদের ইশতেহার ঘোষণা করেছে। তবে এখন বড় প্রশ্ন হলো, এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের রোডম্যাপ কী? প্রতিটি খাতে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা থাকা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম ১০০ দিনের অগ্রাধিকার, বিনিয়োগ ও বাজেট বরাদ্দের স্বচ্ছ পরিকল্পনা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপের বিষয়টিও স্পষ্ট করতে হবে। নারী ও তরুণ ভোটারদের কেবল ভোটের অঙ্ক মেলানোর অনুষঙ্গ না ভেবে তাদের চিন্তা ও আকাঙ্ক্ষাকেই করতে হবে আগামীর রাষ্ট্র গঠনের মূল ভিত্তি।

স্লোগানের বাইরে রাজনৈতিক দলগুলো বাংলাদেশের মানুষকে আসলে কী দিচ্ছে? দুর্নীতি দমন, বৈষম্য বিলোপ, অর্থনীতি শক্তিশালী করা বা তরুণদের সুযোগ দেওয়ার চেনা বুলি আমরা শুনছি। কিন্তু স্লোগান বা স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা তো দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নয়। আর সদিচ্ছা মানেই নীতি নয়।


বাংলাদেশের জনমিতিক বাস্তবতায় এই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাব উদ্বেগজনক। ১৭ কোটি ৭০ লাখ মানুষের এই দেশে প্রায় ২৮ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় পাঁচ কোটি তরুণ। আরও ২৮ শতাংশ ১৩ বছরের কম বয়সী শিশু। অর্থাৎ এ দেশের ভবিষ্যৎ এখনই এখানে উপস্থিত। অথচ বেকারত্ব, ছদ্ম-বেকারত্ব আর দক্ষতার অমিল শিকড় গেড়ে বসেছে। বিপুল এই তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান হবে কীভাবে? দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার দক্ষতা তারা কোথায় পাবে? দেশে আইনের শাসন, সুশাসন আর জবাবদিহি নিশ্চিত করার রূপরেখা কী হবে?

অর্থনীতির চিত্রও খুব আশাব্যঞ্জক নয়। বাজেটে সামগ্রিক বরাদ্দ বাড়লেও স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় ব্যয় প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। জেন্ডার-রেসপন্সিভ বা নারীবান্ধব বাজেট এখনও সামাজিক সুরক্ষা ও আইনি কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অর্থনৈতিক কাঠামোগত বাধা দূর করার দিকে নজর নেই বললেই চলে। ওদিকে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন বা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ সামনে। অথচ ২০২৫ সালে দেশে উল্লেখযোগ্য কোনো বিদেশি বিনিয়োগ আসেনি। রেমিট্যান্স আর তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতিনির্ভরতা আমাদের বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতার ঝুঁকিতে রেখেছে। জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি বাড়ছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরের কোনো সমন্বিত গল্প বা ন্যারেটিভ আমরা শুনতে পাচ্ছি না।
আমরা বিশ্বাস করতে চাই, এই নির্বাচন এবং পরবর্তী ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া সুষ্ঠু হবে। আমরা আশা করতে চাই, যারা নেতৃত্বে আসবেন তারা পুরোনো অভ্যাস আর কায়েমি স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে পারবেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, কেবল আশা জবাবদিহির বিকল্প হতে পারে না।

বাংলাদেশ এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। যারা এখন ক্ষমতায় আসবেন, তাদের সিদ্ধান্ত আগামী কয়েক দশকের জন্য দেশের গতিপথ নির্ধারণ করবে। দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসন, ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠান, তীব্র রাজনৈতিক মেরূকরণ আর অমীমাংসিত ক্ষোভের উত্তরাধিকার তাদের বহন করতে হবে এবং তা করতে হবে এক জটিল ও নির্মম ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে।
ক্ষমতার পালাবদল ঘটছে। প্রশ্ন হলো, নতুন নেতৃত্ব কি এই মুহূর্তের গুরুত্ব এবং ভার অনুধাবন করতে পারছে? তারা কি নাগরিকদের স্বচ্ছতা, মর্যাদা এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার একটি বিশ্বাসযোগ্য পথ দেখাতে পারবে? বিভ্রান্তি যেন এই নির্বাচনের একমাত্র উত্তরাধিকার না হয়– সেটা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।

ফারাহ্ কবির: কান্ট্রি ডিরেক্টর, একশনএইড বাংলাদেশ

আরও পড়ুন

×