পর্যালোচনা
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাস: কী হারালাম, কী পেলাম
ঈশিতা দস্তিদার
ঈশিতা দস্তিদার
প্রকাশ: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:১৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনে রাষ্ট্রের নির্লিপ্ততা ও প্রত্যক্ষ প্ররোচনায় ১৮ মাস ধরে সমাজকে বিপর্যস্ত হতে দেখলাম আমরা। পুরোনো সামাজিক সহনশীলতার অবশেষটুকু যেন অতি অল্প সময়ে কেউ জোর করে নাই করে দিল। কেউ যেন স্বাভাবিকতার মোড়কে প্রান্তিক সংস্কৃতি, ধর্ম, আচার, অভ্যাস ও চর্চা, ভাষা, পছন্দ-অপছন্দ, অভিরুচি–সব কিছুকে গলা টিপে ধরে রাখল। নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়গুলোর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রয়োজন অস্বীকার করার পাশাপাশি পদ্ধতিগতভাবে দীর্ঘমেয়াদি বৈষম্য সৃষ্টির লক্ষ্যে সাংস্কৃতিক কাঠামোকে এলোমেলো করে দেওয়া হলো। ফেটে যাওয়া কাচের মতো বিবিধ বিশ্বাস, রীতিনীতি ও চর্চা, নিস্তরঙ্গ সহজ-সরল জীবনযাপন ও জীবনবোধ মিলেমিশে শত সংকটেও খড়কুটোর মতো ভেসেছিল বাংলাদেশ। স্বৈরাচার তাড়াতে গিয়ে সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনের খানিক ভঙ্গুর ভিতটুকু ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল।
জাতীয় ঐক্য ভাঙার দায় কার?
চব্বিশের জুলাইয়ের দিনগুলোতে ঘরে ঘরে মানুষ জেগে উঠেছিল অপশাসন আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে, শিশু-কিশোর থেকে বৃদ্ধ–কে আন্দোলিত হয়নি সে দিনগুলোতে? গান-কবিতা, স্লোগানে স্লোগানে মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয় সংগীত, নজরুল-রজনীকান্তের গানে-সুরে নতুন করে আত্মান্বেষণে নেমেছিল মানুষ। দেয়াললিখন-গ্রাফিতিতে নতুন বাংলাদেশের গল্প বলতে চেয়েছিল নতুন প্রজন্ম। স্বপ্ন দেখছিল দুঃসময় পেরিয়ে নতুন এক ভোরের। কিন্তু মানুষের সেই অঙ্গীকার বা স্বপ্নের কথা কতটা শুনতে পেল শাসকরা কিংবা রাষ্ট্রকাঠামো? কী পেলাম আমরা ১৮ মাসে?
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ‘অরাজনৈতিক’ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে নতুন সরকার গঠিত হলো বটে, তবে আন্দোলনকালে গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্য ভেঙেচুরে বিশেষ বিশেষ দিকে পক্ষপাত প্রবল হয়ে উঠতে থাকল। গণঅভ্যুত্থানের অংশীদার সবারই নিজস্ব দর্শন ছিল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনার পরিপন্থি ছিল না রাজপথের সে লড়াই। অথচ ৫ আগস্টের পর মুক্তিযুদ্ধের স্মারক, ভাস্কর্যের ওপর হামলে পড়ল কিছু লোক। রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিনষ্টের জন্য তাদের শাস্তি না দিয়ে নীরবে উৎসাহিত করা হলো। ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও ধ্বংসযজ্ঞ প্রলম্বিত হতে হতে ঢাকার কারওয়ান বাজার পর্যন্ত পৌঁছাল। কে কার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করল তাহলে?
অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে প্রথম আঘাত আসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর। অভিযোগ জানানোর জন্য প্রশাসনকে পাওয়া গেল না। বলা হলো, পুলিশ প্রশাসন এখনও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। এক-দুটি ঘটনায় গ্রেপ্তার, মামলা হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সরকারি নির্বিকার ভঙ্গি পরবর্তী হামলা ও হত্যাকাণ্ডের সুযোগ তৈরি করে দিল। প্রশাসনের শিথিলতায় ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে এ দেশের সংখ্যালঘু সমাজ গত ১৮ মাস যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেল,
তাকে শুধু নীরব এথনিক ক্লিনজিংয়ের সঙ্গেই তুলনা করা যায়। ৫ আগস্ট ২০২৪-এর সন্ধ্যা থেকে শুরু হওয়া ভারতীয় মিডিয়ার প্রোপাগান্ডাকেই যেন সত্য প্রমাণে উঠেপড়ে লেগেছিল সরকার। নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে প্রার্থীদের অনেকেই স্থানীয় সংখ্যালঘু ভোটের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরলেন, মহোৎসব বা
নামযজ্ঞের উৎসবে পাত পেড়ে প্রসাদ খেলেন। অনেকে তা করে ভোটের বৈতরণিও পার হলেন। কিন্তু ২০০১ সালের নির্বাচন-পরবর্তী নির্যাতন-নিপীড়নের স্মৃতি সংখ্যালঘুদের স্বস্তি দিচ্ছিল কী?
গত সেপ্টেম্বর মাসে খাগড়াছড়ির গুইমারায় যা হয়েছে, তার কতটা আমরা এখন পর্যন্ত জানতে পেরেছি? অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ঢাকা শহরেই আদিবাসীদের ওপর যে হামলা হয়, তার কোনো বিচার হয়েছে কী? বান্দরবানে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) মতো নতুন সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান দমনের প্রক্রিয়ায় আদিবাসীরা নতুন করে বাস্তুচ্যুত হলেন। হাজতে বেশ কয়েকজন মারা যাওয়ার পরও মুক্তি পায়নি রৌসাং লিয়ান বমসহ গণগ্রেপ্তার হয়ে বিনা বিচারে দুই বছরের বেশি সময় কারাবন্দি থাকা বেথেলপাড়ার বম নারী ও পুরুষের অনেকে।
নির্বাচন কী কাঙ্ক্ষিত মোড় ঘোরাবে?
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে চব্বিশের জুলাই পর্যন্ত সব আন্দোলন-
সংগ্রামে নারীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে, নেতৃত্বও দিয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানে যে মেয়েরা ছিল সম্মুখসারিতে, অভ্যুত্থান-পরবর্তী গত ১৮ মাসে তাদের কোনো ক্ষেত্রেই সক্রিয়
অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হলো না। উমামা ফাতেমার মতো সাহসী নারী কর্মীরা অন্তরালে চলে গেলেন। অথচ নারীবিদ্বেষী দুর্জনেরা আসর জমিয়ে বসেছে। অশোভন আচরণকারী ও প্রকাশ্যে নারীকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছনাকারী পুরুষদের ফুলমালায় শোভিত করা, নারী কমিশনের বিরুদ্ধে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দাঁড়িয়ে কুৎসিত ভাষায় গালাগাল করা, অনলাইনে গণহারে স্লাটশেমিং ইত্যাদি অন্তর্ভুক্তিমূলক যাবতীয় বক্তব্যকে ম্লান করে দিল। ‘ইনক্লুসিভ বাংলাদেশে’র কথা বলা মানুষগুলো বিগত মাসগুলোতে পুরোদমে সম্ভাব্য সকল প্রকারে নারীদের বাদ দেওয়ার রাজনীতি করে গেলেন। নারীবিরোধী উগ্রতাকে দেখেও না দেখার ভান করে বৈধতা দিয়ে গেছে সরকার। নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো মবরূপী ‘প্রেশার গ্রুপ’ আতঙ্কে থাকে নিয়মিত এখন।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের অবস্থান বোঝা গেল না। মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকায় হরহামেশা জেলেদের ধরে নিয়ে আটক করা হচ্ছে, অথচ বাংলাদেশ সরকারের আরাকান আর্মি ও রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে সুনর্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপ দেখা গেল না। ভারতীয় সীমান্তে হত্যাকাণ্ডও বন্ধ হলো না। আকস্মিক বন্যায় প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশ বিপর্যয় রোধে আন্তঃদেশীয় আলাপচারিতার ও সমঝোতার খবর নেই। অথচ সারাক্ষণ ভারতবিরোধী যুদ্ধংদেহী বাগাড়ম্বর চালিয়ে যাওয়া হলো। সাড়ে ৩০০-এর বেশি কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে গত ১৮ মাসে। কর্মহীন কয়েক লাখ শ্রমিকের পেটের ভাত, কৃষকের ন্যায্যমূল্যের দাবির প্রতি মনোযোগের চেয়ে গুরুত্ব দিয়ে আওয়াজ তোলা হলো তরুণদের সামরিক প্রশিক্ষণের।
বোঝা দুরূহ নয়, এসব ছিল লোকরঞ্জনবাদী ফ্যাশনের শাসন ব্যবস্থায় মানুষকে জুলাইয়ের প্রত্যাশা থেকে সরিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অভিমুখে নেওয়ার সচেতন প্রয়াস। প্রশ্ন হলো, নির্বাচনের ভেতর দিয়ে আমরা বিগত ১৮ মাসের ভুল যাত্রায় মোড় বদল ঘটাতে পারব কিনা?
ড. ঈশিতা দস্তিদার: নৃবিজ্ঞানী ও লেখক
- বিষয় :
- ঈশিতা দস্তিদার
