ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সহজিয়া

হারানো বিশ্বাস পুনরুদ্ধার ছাড়া দেশ বদলাবে না

হারানো বিশ্বাস পুনরুদ্ধার ছাড়া দেশ বদলাবে না
×

আনুশেহ আনাদিল

আনুশেহ আনাদিল

প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:১০

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশকে প্রায়ই ‘সংকটের দেশ’ আখ্যা দেওয়া হয়– রাজনৈতিক বিভাজন, নৈতিক অবক্ষয়, সামাজিক অবিশ্বাস। আমরা বারবার কথা বলি দুর্নীতি, শাসনব্যবস্থা, অর্থনীতি আর নেতৃত্ব নিয়ে। কিন্তু একটি গভীর প্রশ্ন প্রায় কখনোই ছোঁয়া হয় না: আমাদের ভেতরের চিন্তা ও বিশ্বাসের কাঠামো কীভাবে আমাদের সমাজকে গড়ে তুলছে।

এই প্রশ্নের কেন্দ্রে আছে ধর্ম। আরও ভেঙে বললে সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীর ধর্ম ইসলাম। মূল বিষয় এই নয় যে, সমাজে ধর্মবিশ্বাসের ইতিবাচক প্রভাব নেই। বরং সত্য হলো, আমরা অনেক আগেই ধর্মের মূল আত্মাকে হারিয়েছি। আজ যা প্রচলিত, তা সেই শক্তিশালী মূল শিক্ষার ছায়ামাত্র।

বস্তুত হারানোটা খুব আগেই শুরু হয়েছিল। নবী (সা.) ও খোলাফায়ে রাশেদিন-পরবর্তী যুগেই আমরা ধীরে ধীরে ধর্মের জীবন্ত পথ হারাতে শুরু করি। এর পরের ইতিহাসে মূল লড়াইটা ছিল অর্থ, ক্ষমতা আর কর্তৃত্ব নিয়ে। ইসলামের যে শিক্ষা মানুষের ভেতর পরিবর্তন আনার কথা ছিল, তা ধীরে ধীরে একটি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় রূপ নেয়।

মূল বার্তাটি ছিল ভেতরমুখী। তা মানুষকে মুক্ত করতে চেয়েছিল– গোত্র, ভয়, লোভ, অহংকার আর অন্যায়ের দাসত্ব থেকে। এটি ক্ষমতাকে প্রশ্ন করেছিল, নৈতিকতার সামনে রাজাকে দাঁড় করিয়েছিল এবং বলেছিল– পবিত্রতা বংশ বা প্রতিষ্ঠানের নয়, নৈতিকতার। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধর্ম জীবন্ত নৈতিক পথ না হয়ে একটি কাঠামো হয়ে ওঠে। বোঝাপড়ার জায়গা নেয় অন্ধ আনুগত্য। ভেতরের জাগরণ চাপা পড়ে যায় বাইরের নিয়মের নিচে। তখন বিশ্বাস তার ভেতরের কেন্দ্রবিন্দু হারাতে থাকে।

আজ আমাদের সমাজে ইসলামকে অনেক সময় এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন এটি শুধু মানতে হয়; বোঝা বা রূপান্তরিত হওয়ার কিছু নয়। খোদাকে দেখা হয় ভয় পাওয়ার শক্তি হিসেবে; নৈতিক বিবেক জাগ্রত করার উপস্থিতি হিসেবে নয়। এর ফল ভয়াবহ।

ভয়ের ওপর দাঁড়ানো বিশ্বাস মানুষকে সৎ করে না, শুধু অনুগত করে। বাহ্যিক কর্তৃত্বনির্ভর ধর্ম স্বাধীন মানুষ তৈরি করে না, তৈরি করে অনুসারী। আর এমন সমাজ ধীরে ধীরে আত্মিক দাসত্বে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে– প্রথমে ধর্মীয়ভাবে, পরে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে। এভাবেই মানসিক দাসত্ব জন্ম নেয়।
প্রশ্ন করতে নিষেধ করলে অন্যায় ধর্মের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে। ধর্ম যখন শুধু প্রদর্শনী হয়, নৈতিকতা হয়ে ওঠে আপসযোগ্য। যে কারণে কাবায় তাওয়াফের গভীরতর অর্থ রয়েছে। এটি মানবজাতির কেন্দ্রবিন্দুর প্রতীক, যেখানে মানুষের ভেতরের দিকনির্দেশ স্থির হয়। এর মূল শিক্ষাটি স্পষ্ট: আসল পবিত্র স্থান মানুষের অন্তর। প্রকৃত তাওয়াফ হলো নিজের ভেতরে– সত্য, নম্রতা আর নৈতিক জাগরণের দিকে যাত্রা।

ইসলাম মানুষকে দাস বানাতে আসেনি। এসেছিল মানুষকে সব দাসত্ব থেকে মুক্ত করতে। ভয়, লোভ, অহংকার আর জুলুম থেকে মুক্তি দিতে। 
আসল আত্মসমর্পণ মানুষকে দুর্বল করে না; শক্ত করে। কিন্তু আজ ধর্ম অনেক সময় মানুষকে প্রশ্ন না করতে শেখায়; কষ্টকে মেনে নিতে বলে; ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ না করতে বলে। এভাবে ধৈর্য শেখানো হয়, কিন্তু প্রজ্ঞা নয়। আনুগত্য শেখানো হয়, কিন্তু ন্যায়বোধ নয়। বিশ্বাস শেখানো হয়, কিন্তু আত্মপরীক্ষা নয়। ফলে মানুষ সহ্য করতে শেখে; বদলাতে নয়।
ধর্মবিশ্বাসী সমাজে যখন ধর্ম তার মর্মার্থ হারিয়ে ফেলে, তখন রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোগত সংস্কারও ব্যর্থ হয়। বাংলাদেশে আমরা দেখি, আইন বদলাচ্ছে, প্রতিষ্ঠান গড়া হচ্ছে, নির্বাচন হচ্ছে, উন্নয়ন হচ্ছে; তবু মূল সমস্যাগুলো থেকেই গেছে। দুর্নীতি রূপ বদলায়, ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়, বৈষম্য বাড়ে। কারণ কাঠামো চালায় মানুষ। আর মানুষ চালিত হয় বিশ্বাস দিয়ে।

ভেতরের নৈতিক দিকনির্দেশ না থাকলে কোনো আইন কাজ করে না। বিবেক ছাড়া নজরদারি অর্থহীন। আত্মসংযম না থাকলে সব ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। এটি শুধু রাজনৈতিক সমস্যা নয়। এটি গভীর নৈতিক ও আত্মিক সংকট। ইসলামের মর্মার্থ তাই পুনরুদ্ধার দরকার। ধর্ম থেকে দূরে সরে যাওয়া নয়। সমাধান হলো ভয়, অজ্ঞতা আর ক্ষমতার অপব্যবহারমূলক পরিস্থিতি থেকে ধর্মকে পুনরুদ্ধার করা। 
ইসলাম পুনরুদ্ধার মানে তার মূল উদ্দেশ্যে ফেরা– মানুষকে পরিশুদ্ধ করা। আইন ও প্রজ্ঞার ভারসাম্য ফেরানো। আচার ও অন্তর্নিহিত অর্থকে এক করা। আত্মসমর্পণকে মুক্তির পথে ফেরানো।
এর মানে এই বোঝা– পথনির্দেশনা বিবেকের জায়গা নিতে আসেনি, বরং তাকে জাগাতে এসেছে। শিক্ষক বা পথপ্রদর্শক শাসন করতে নয়; আলো দেখাতে এসেছেন। বিশ্বাস এসেছে সাহস তৈরি করতে; নীরবতা নয়। আমাদের সামনে সেই কাজটি অপেক্ষমাণ।

স্বীকার করতে হবে, এই পুনরুদ্ধার সহজ নয়। এতে সৎ চিন্তা, আত্মিক সাহস আর পুরোনো ধারণা ছাড়ার ক্ষমতা দরকার। ঈশ্বরের বাণীকে ইতিহাসের ক্ষমতার রাজনীতি থেকে আলাদা করতে হবে। মানুষের ভেতরের কাবাকে জাগ্রত করতে হবে। এ কাজ ছাড়া বাংলাদেশ বারবার একই জায়গায় ঘুরবে। অগ্রগতি মনে করলেও আসলে জায়গা বদলাবে না।
কোনো দেশ বা সমাজ তার অন্তর্গত বিশ্বাসের চেয়ে বড় হতে পারে না। আর যে বিশ্বাস মানুষকে বদলায় না, সে বিশ্বাস সমাজকেও বদলাতে পারে না। বাংলাদেশ বদলাতে হলে আমাদের বিশ্বাসকে পুনরুদ্ধার করতে হবে– নিয়ন্ত্রণের অস্ত্র হিসেবে নয়, আত্মিক মুক্তির পথ হিসেবে। ভেতরের পবিত্র স্থান জাগ্রত না হলে বাইরের সমাজ কখনোই ন্যায়, মর্যাদা আর সত্যের প্রতিফলন ঘটাতে পারবে না।

আনুশেহ আনাদিল: সংগীতশিল্পী ও সমাজকর্মী

আরও পড়ুন

×