নির্বাচন
ডানপন্থিদের অভূতপূর্ব সাফল্যের কারণ
মোশতাক আহমেদ
মোশতাক আহমেদ
প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৩৮ | আপডেট: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৩৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
সব ভাবনা-চিন্তা আর সংশয়ের অবসান ঘটিয়ে সদ্যসমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি, ২০৯ আসন পেয়ে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। ৬৮ আসন নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
আসন সংখ্যার হিসাবে মনে করা যেতে পারে, বিএনপির তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে জিতেছে জামায়াত। বাস্তবে অনেক আসনেই দুই দলের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে এবং টানটান উত্তেজনার মাঝ দিয়েই বিএনপিকে সেসব আসনে জিততে হয়েছে। যতটুকু জানা যায়, মোট প্রদত্ত ভোটের ৪৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ পেয়েছে বিএনপি। অন্যদিকে ৩১ দশমিক ৭৬ শতাংশ ভোট পেয়েছে জামায়াতে ইসলামী। অথচ ২৫ বছর আগে ২০০১ সালের নির্বাচনে দলটির ভোট ছিল মাত্র ৪.২৮ শতাংশ। ২০০৮ সালে তা ০.৪২ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৪.৭ শতাংশে। সেখান থেকে ১৮ বছরে তাদের ভোট বেড়ে হয়েছে ৩১.৭৬ শতাংশ। অর্থাৎ দলটির ভোট বেড়েছে ২৭ শতাংশের মতো। যে কোনো গণতান্ত্রিক দেশের জন্য এই বৃদ্ধিকে উল্লম্ফন বলা চলে।
স্বাভাবিকভাবেই জামায়াত তথা ধর্মবাদী রাজনৈতিক শক্তির এই উত্থানে অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। কিন্তু এটিই কি স্বাভাবিক ছিল না? কারণ জামায়াত শুধু একটা রাজনৈতিক দল নয়, এটি একটি আদর্শিক অভিযাত্রার নাম। সেই আদর্শিক অবস্থান থেকেই এরা বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিল।
আশা করা হয়েছিল, স্বাধীনতার পর এই ধারাটি বিলীন হয়ে যাবে। কিন্তু তা হয়নি। এমনকি বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা হলেও ধর্মবাদী আদর্শ বিস্তারের ক্ষেত্রটি উন্মুক্তই রাখা হয়েছিল; কোনো কোনো ক্ষেত্রে সার-গোবর দিয়ে তাকে আরও উর্বর করে তোলা হয়েছিল। এই সুযোগে গোষ্ঠীটি বিভিন্ন ছদ্মাবরণে তার আদর্শিক কাজ চালিয়ে গেছে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা
যায়, ২০২৬ সালে এসে যা ঘটেছে তার শুরুটা স্বাধীনতার পরপরই।
নব্বই দশক থেকে দলটি নানা সময়ে নানাভাবে ক্ষমতার অংশীদার হয়েছে। আবার কখনও অংশীদার না হয়েও রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে এই সময়ের দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল– আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ধর্মবাদী শক্তিকে ব্যবহার করেছে। আসলে আওয়ামী লীগ বা বিএনপি এদের ব্যবহার করেনি। উল্টো জামায়াত এবং তাবৎ কট্টর দক্ষিণপন্থি গোষ্ঠীই তাদের ব্যবহার করেছে। ইতিহাস বলে, আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি দুটি দলই একে অপরকে ঘায়েল করার জন্য ধর্মবাদী গোষ্ঠীর শরণাপন্ন হয়েছে। বিএনপি যদি জামায়াতকে কাছে টেনেছে, আওয়ামী লীগ টেনেছে হেফাজতকে। শেখ হাসিনা তো ‘কওমি’ জননী খেতাবও নিয়েছিলেন। তিনি হয়তো ভেবেছিলেন, তাদের মাধ্যমে তিনি জামায়াতে ইসলামীকে ‘সাইজ’ করে রাখবেন। কিন্তু তিনি বুঝতে পারেননি– রসুনের কোয়া ওপর দিকে যতই আলাদা দেখাক, গোড়ার দিকে সব এক।
দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দুর্বলতাও এখানে– ডানপন্থিে উত্থান ও বিকাশ ত্বরান্বিত করেছে। লক্ষণীয়, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি– এ দুটো দল পরস্পর এতই শত্রুভাবাপন্ন যে, তারা রাজনীতির মাঠে প্রতিপক্ষকে কোনো স্পেস দিতে কখনও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেনি। আওয়ামী লীগের আমলে দেখা গেছে বিএনপির নেতাকর্মীরা মিটিং-মিছিল করা তো দূরের কথা, স্বাভাবিকভাবে তাদের বাড়িঘরে পর্যন্ত থাকতে পারেনি। একই অবস্থা ঘটেছে বিএনপির আমলেও– আওয়ামীপন্থিরা ঘরবাড়িছাড়া জীবন কাটিয়েছে বছরের পর বছর। এই সুযোগে ডানপন্থি জামায়াতে ইসলামী নিজের জায়গা করে নিয়েছে। যদি আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি পরস্পর সাধারণ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীসুলভ আচরণ করত তাহলে আজকের এই অবস্থা হয়তো না-ও হতে পারত।
প্রসঙ্গত, একটা কথা আমাদের মনে রাখা দরকার, জামায়াত বা ডানপন্থি রাজনৈতিক শক্তির উত্থানে গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা। গত প্রায় চার দশকে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে শুধু গবেষণাই চলেছে; কোনো সরকারই একটা গণমুখী এবং সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা কায়েমের চেষ্টা করেনি। এ সুযোগই নিয়েছে ধর্মবাদী গোষ্ঠী। শিক্ষাক্ষেত্রে বর্তমানে অন্তত তিনটি ধারা বিদ্যমান– সাধারণ ধারা, কওমি ধারা এবং ইংরেজি ধারা। এর মাঝে শেষোক্ত দুটি ধারার সঙ্গে দেশ বা সমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সম্পর্ক সামান্যই। দুটিরই ভাবাদর্শগত দিশা পশ্চিমমুখী। কারও বা ইউরোপ-আমেরিকা, কারও বা মধ্যপ্রাচ্য। শিক্ষা ব্যবস্থার এই শিকড়-বিচ্ছিন্নতা অনেকাংশেই ডানপন্থার উত্থানকে ত্বরান্বিত করেছে।

অনেকেই বলেন, স্বাধীনতার পর দেশে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের প্রয়োজন ছিল। মুক্তিযুদ্ধের অর্জনকে সংহত করার জন্যই এর প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেটা হয়নি। হয়নি বললে ভুল হবে; তদানীন্তন শাসকগোষ্ঠী তা হতে দেয়নি। এই না দেওয়াটাও স্বাভাবিক ছিল। কারণ সে সময়কার শাসক দল আওয়ামী লীগ কোনো বিপ্লবী দল ছিল না। তারা ছিল জাতীয়তাবাদী। জাতীয়তাবাদীরা বিপ্লব পছন্দ করে না। খুব ব্যতিক্রম ছাড়া তারা হয় জনতুষ্টিবাদী। জনতুষ্টিবাদের মোহে পড়েই আওয়ামী লীগ স্বাধীনতার পর সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পথে এগোয়নি। ফলে স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠী দেশে আমাদের চিরায়ত ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতির বিপরীতে একটি ধর্মবাদী সংস্কৃতির আবাদ শুরু করে। তারা এমনভাবে কাজটি করে, যাতে এর আবরণে যে একটা রাজনৈতিক অভিসন্ধি ছিল, তা কেউ বুঝতে পারেননি। ফলে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ, বিশেষ করে রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষীরা তাদের ফাঁদে পা দেয়; নানাভাবে তাদের সাহায্য করে। এভাবেই গত ৪০ বছরে দেশে একটা নীরব সাংস্কৃতিক বিপ্লব ঘটে গেছে। বলা চলে রাজনৈতিক বিপ্লবের আগেই ঘটে গেছে সাংস্কৃতিক প্রতিবিপ্লব।
এই প্রতিবিপ্লবের দায় অনেকেরই আছে। যারা প্রগতির কথা বলেন; বলেন ধর্মনিরপেক্ষতার কথা, তাদেরও। নিজের দায় যথাযথভাবে পালন না করার দায়ও আছে অনেকের। বামপন্থিরাও বাদ যান না। এ কথা বলা অত্যুক্তি হবে না যে, গত চার দশকে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি দেশের ডানপন্থি শক্তিকে শক্তিশালী করেছে। আর কিছু প্রগতিশীল সুশীল, যার মাঝে বামপন্থিরাও রয়েছেন, সেটিকে স্বাভাবিকীকরণ করেছেন। তারই অনিবার্য ফসল ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ডানপন্থিদের স্মরণকালের ভালো ফল।
সর্বশেষ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরও বাম এবং প্রগতিশীল দলগুলোর যে ভূমিকা রাখার কথা ছিল, তা করতে তারা চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। দৃষ্টিকটুভাবে তারা ডানপন্থিদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে তাদের সমস্ত শক্তি ব্যয় করেছে। এমনকি গণঅভ্যুত্থানের ছয় মাস পর যখন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়িটি ভাঙচুর করা হলো; গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো মুক্তিযুদ্ধের স্মারক; মুক্তিযোদ্ধাদের গলায় জুতার মালা পরিয়ে ঘোরানো হলো– বিএনপির ফজলুর রহমান, রুমিন ফারহানা প্রমুখ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সোচ্চার হলেন। বাম দলগুলো তখনও অলি-গলিতে ফ্যাসিস্ট খোঁজায় ব্যস্ত। পরিণতি যা হবার তাই হয়েছে। এখন সামনে কী হবে, ভবিতব্যই কেবল বলতে পারে।
মোশতাক আহমেদ: অবসরপ্রাপ্ত জাতিসংঘ
কর্মকর্তা ও কলাম লেখক
- বিষয় :
- মোশতাক আহমেদ
