ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

প্রতিবেশী

নেপালে নির্বাচন সামনে রেখে ভূ-রাজনীতির খেলা

নেপালে নির্বাচন সামনে রেখে ভূ-রাজনীতির খেলা
×

বিশ্বাস বড়াল

প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:১৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

২০২৫ সালের জেন-জি আন্দোলনকালে বিক্ষোভগুলো ছিল ‘আমেরিকান এনজিও’ সমর্থিত– এমন ষড়যন্ত্রতত্ত্ব অনলাইনে ছেয়ে গিয়েছিল। অন্যরা সেপ্টেম্বরের গোড়ার দিকের এ অস্থিতিশীলতার জন্য ভারতকে দায়ী করেছিলেন, যে দেশটি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কেপি ওলিকে কখনোই পছন্দ করেনি। শেষ পর্যন্ত অলি রীতিমতো অপদস্থ হয়ে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। ভারত ও চীনের দ্বন্দ্বে চাপের মধ্যে থাকা একটি দেশে ‘তৃতীয় প্রতিবেশী’ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

ভারত দিয়েই শুরু করা যাক। এটা নিশ্চিত, তারা অলিকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পুনরায় দেখতে চায় না। আবার, জেন-জি আন্দোলনের পর অলির খ্যাতি ম্লান হয়ে যাচ্ছে এবং তাঁর সিপিএন-ইউএমএল নির্বাচনে অনেক আসন পাবে বলে মনে হচ্ছে না। তাঁর আসন সংখ্যাগরিষ্ঠতার নিচে থাকবে, এটা নিশ্চিত। যদি তা-ই হয়, তাহলে প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য নেপালি কংগ্রেসের গগন থাপা এবং রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির বলেন্দ্র শাহের মধ্যে সরাসরি লড়াই হবে।

থাপা এমন একটি দলের নেতা, যাদের ঐতিহাসিকভাবে নয়াদিল্লির সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্ক রয়েছে। বছরের পর বছর কংগ্রেস নেপালি কমিউনিস্ট দলগুলোর চীনা ঝুঁকির প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করছে। কংগ্রেস নেপাল-চীন বাণিজ্যিক সম্পর্ক, বিশেষ করে বিআরআই প্রকল্পের জন্য ঋণ বিষয়ে সংশয় পোষণ করে, যা ভারতের জন্য ইতিবাচক। একই বৈশিষ্ট্য দলটিকে মার্কিন ও অন্যান্য পশ্চিমা শক্তির কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলে।

দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিতে থাকার কারণে থাপা সবার কাছেই পরিচিত। কূটনীতিতে ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারাটা অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ। তার তুলনায় অস্থিরমতি বলেন্দ্র শাহের সঙ্গে কাজ করা আরও কঠিন হতে পারে। 

ভারতের জন্য মন খারাপের বিষয় হলো, কাঠমান্ডুর মেয়র থাকাকালীন বলেন্দ্র শাহ একবার তাঁর অফিসে ‘বৃহত্তর নেপাল’-এর মানচিত্র প্রদর্শন করেছিলেন। নেপালি পর্দায় কিছু ভারতীয় ছবি নিষিদ্ধ করার প্রচেষ্টাও তিনি চালিয়েছিলেন। কিন্তু একই শাহ চীন সফরের আমন্ত্রণও প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। কারণ চীন তার জাতীয় মানচিত্র আপডেট করার সময় নেপালি সংবেদনশীলতাকে পাত্তা দেয়নি। এটিও শাহের উদ্দেশ্য অর্জনের পথে সাহায্য করতে পারে যে, তিনি নিজের একটি ‘কর্মী’র ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছেন, যিনি আদর্শিক বিশুদ্ধতা বজায় রাখার চেয়ে ফল অর্জনের দিকে বেশি মনোযোগী। এর ফলে সরকারের বৈদেশিক কর্মকাণ্ড ব্যবসায়িক দিক থেকে তুলে ধরা তুলনামূলক তাঁর পক্ষে সহজ হতে পারে।

তবুও এই প্রচেষ্টা এমন একটি অঞ্চলে, যেখানে বৃহৎ শক্তিগুলোর পাস্পরিক ঝগড়া ক্রমবর্ধমান এবং প্রত্যেকেই চায় একান্ত সম্পর্ক তৈরি করতে; কতটুকু সফল হবে তা নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। উদাহরণস্বরূপ, যদি শাহ ভারতীয়দের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে চান, তাহলে ভারত চাইবে তিনি বেইজিং থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখবেন। অন্যদিকে, চীন বাণিজ্যিকভাবে এটিকে যুক্ত করার জন্য ‘ব্যবসায়িক’ শাহের দিকে ঝুঁকবে। এদিকে আমেরিকানরা চীনা ‘শিকারি ঋণ’ থেকে দূরে থাকার জন্য তার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।

দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের ভূমিকা সম্পর্কে ভারত ও আমেরিকার অবস্থান একই রকম বলে মনে হচ্ছে। দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক নতুন মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী সামির পল কাপুর সম্প্রতি নেপাল ও বাংলাদেশের নির্বাচন সম্পর্কে মার্কিন হাউস সাব-কমিটিকে ব্রিফ করার সময় বলেছিলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি... চীন বা যে কোনো একক আধিপত্যবাদীকে এই অঞ্চলে ক্ষমতা দখল করা বা জোরপূর্বক প্রভাব চাপিয়ে দেওয়া থেকে বিরত রাখতে।’ 

তবে এটাও কৌতূহলের বিষয়, ক্ষমতা থেকে জোরপূর্বক অপসারণের আগে অলি ভারতের আস্থা ফিরে পেতে সমন্বিত প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। তাঁর সরকারের প্রতি ভারতের সমর্থনের গুরুত্ব বুঝতে পেরে তিনি চীন থেকে নিজেকে দূরে রাখতেও প্রস্তুত ছিলেন, তবুও ভারতীয়রা তাঁকে আর বিশ্বাস করবে না। তাই নেপালে কমিউনিস্টদের ক্ষমতায় ফিরে আসা চীনের সঙ্গে ভালো সম্পর্কের কোনো নিশ্চয়তা দেয় না।
নেপালের পরবর্তী নির্বাচিত সরকারে যে-ই নেতৃত্ব দিক না কেন, তার ওপর পুরোনো আঙিনায় বহিরাগত প্রভাব সম্পর্কে ভারতের উদ্বেগ ঠেকানো, মার্কিন ‘ঘেরাও কর্মসূচি’ সম্পর্কে চীনের সন্দেহ দূর এবং যুক্তরাষ্ট্রকে আশ্বস্ত করা যে, কাঠমান্ডু বেইজিংয়ের কক্ষপথে প্রবেশ করবে না– এসব কঠিন দায়িত্ব হিসেবে থেকে যাবে।  

বিশ্বাস বড়াল: দ্য কাঠমান্ডু পোস্টের সম্পাদক; দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম

আরও পড়ুন

×