ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সহজিয়া

এখন আমরা কেমন বাংলাদেশ চাই?

এখন আমরা কেমন বাংলাদেশ চাই?
×

আনুশেহ আনাদিল

আনুশেহ আনাদিল

প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৩২

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন কেবল একজন নেতার উত্থান বা একটি দলের বিজয়ের গল্প নয়। এটি আরও গভীর কিছু। এটি জনগণের সম্মিলিত ঘোষণা– উগ্রতা আমাদের পরিচয় নয়; ভয় আমাদের শাসক নয়। আর ধর্মীয় গোঁড়ামি আমাদের বহুবর্ণ উত্তরাধিকারকে সংকুচিত করতে পারবে না। এটি প্রমাণ করে– বাংলাদেশ এখনও বহুত্ববাদ, সাহস ও বিবেকের ওপর বিশ্বাস রাখে।

অনেক বছর মানুষ মনে করেছিল, ভোট যেন একটি আনুষ্ঠানিকতা– ফলাফল পূর্বনির্ধারিত, অংশগ্রহণ অর্থহীন। কিন্তু এবার মানুষ ঘর থেকে বেরিয়েছে। লাইনে দাঁড়িয়েছে। ভোট দিয়েছে। এই একটি মাত্র দৃশ্যই আশার ভাষা। এটি প্রমাণ করে যে, জনগণ আবার বিশ্বাস করতে শুরু করেছে– তাদের কণ্ঠস্বরের মূল্য আছে।

নেতৃত্ব মানে শুধু ক্ষমতা নয়; দায়িত্বও। এখন প্রয়োজন কেবল প্রশাসন নয়; রূপান্তর। অনিয়ন্ত্রিত দুর্নীতি, লুটপাট, জনগণের সম্পদকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি মনে করার মানসিকতা– সেই অধ্যায়ে আর ফিরে যাওয়া যাবে না। অতীতের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলো–উভয়েই এই দেশের প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করেছে; মানুষের আস্থাকে ক্ষয় করেছে; স্বজনপ্রীতিকে স্বাভাবিক করে তুলেছে। সামনে এগোতে হলে আমাদের সৎ আত্মসমালোচনা দরকার। কিন্তু জবাবদিহিই শেষ কথা নয়। 

প্রশ্নটি আরও বড়– আমরা কেমন বাংলাদেশ চাই? আমাদের শুরু করতে হবে পরিবেশ দিয়ে। বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম উর্বর, নদীমাতৃক ভূমি। অথচ আমাদের বনভূমির পরিমাণ এখনও পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য যথেষ্ট নয়। পরিবেশবিদরা বলেন, একটি দেশের ২৫-৩০ শতাংশ ভূমি বন বা সংরক্ষিত এলাকায় থাকা প্রয়োজন। বাংলাদেশ সেই সীমা থেকে অনেক দূরে। এটি কেবল পরিসংখ্যান নয়– সতর্কবার্তা। বনহীন দেশ শুধু গাছ হারায় না; অক্সিজেন হারায়। বন্যপ্রাণীর আশ্রয় হারায়। বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক ঢাল হারায়। সে নীরবতা হারায়। বিস্ময় হারায়।
পুনঃবনায়ন আমাদের জাতীয় অঙ্গীকার হতে হবে। শহর ও বনভূমির মাঝে বাফার জোন থাকতে হবে, যাতে নগরায়ণ বন্যপ্রাণীর শ্বাসরোধ না করে। আমাদের চাই স্মার্ট গ্রাম; শুধু স্মার্ট সিটি নয়। এমন একটি মডেল, যেখানে থাকবে শহর, তারপর টেকসই গ্রাম, তারপর সংরক্ষিত বনাঞ্চল। প্রতিটি অঞ্চল আলাদা, মর্যাদাপূর্ণ, সুরক্ষিত।

আমাদের নদীগুলোকে দূষণমুক্ত করতে হবে। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা– এগুলো শিল্পবর্জ্যের নর্দমা নয়; আমাদের জীবনের ধমনী। নদী পুনরুদ্ধার মানে অতীতচর্চা নয়। এটি বেঁচে থাকার সংগ্রাম।
জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনতে হবে সচেতন পরিকল্পনায়। প্রতিটি বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীর পুনরুদ্ধার আমাদের পরিবেশ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে। যে জাতি তার হাতি, বাঘ, পরিযায়ী পাখিকে রক্ষা করে; সে নিজেকেই রক্ষা করে। কিন্তু পরিবেশের পুনর্জাগরণ সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ ছাড়া অসম্পূর্ণ।

বাংলাদেশের শক্তি কখনও একরৈখিক নয়, বরং বৈচিত্র্য। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান– আমরা একই মাটিতে উৎসব করেছি; একই ঋতুতে গান গেয়েছি। 

আমাদের ইসলাম শতাব্দীর সুফি সাধনা, কবিতা ও আউলিয়াদের উপস্থিতিতে গড়ে উঠেছে; এই ইসলাম ভালোবাসার ঐতিহ্য; ভয়ের নয়। এখানে আধ্যাত্মিকতা গাওয়া হয়েছে; চাপিয়ে দেওয়া হয়নি। কবিতায় বিতর্ক হয়েছে, হুমকিতে নয়। বিপদ তখনই আসে, যখন ধর্ম ভয়ের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। যখন আচার অর্থহীন হয়ে কেবল বিভাজনের অস্ত্র হয়ে দাঁড়ায়।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অপরিহার্য। তার সঙ্গে দায়িত্বও জরুরি। যে ভাষণ ঘৃণা উস্কে দেয়; মানুষকে সন্দেহে ভরিয়ে তোলে; সহনাগরিককে শত্রু বানায়, তা জাতির আত্মাকে ক্ষয় করে। বৃহৎ ধর্মীয় সমাবেশ মানুষকে উত্তেজিত নয়, উন্নত করুক। বিশ্বাসের উদ্দেশ্য হোক মানবিকতার বিস্তৃতি; সংকোচন নয়।

বাংলাদেশকে বেছে নিতে হবে আধ্যাত্মিকতা; গোঁড়ামি নয়। নীতি; প্রদর্শন নয়। গভীরতা; প্রতীকী অভিনয় নয়। নতুন প্রজন্ম ইতোমধ্যে তা বোঝে। তারা জলবায়ু সংকটের গুরুত্ব জানে। তারা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া বিদ্বেষের চেয়ে ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিয়ে বেশি ভাবিত। তারা চায় পার্ক, নির্মল বাতাস, পুনরুদ্ধার করা জলাভূমি, সাংস্কৃতিক উৎসব, সৃজনশীল স্বাধীনতা। তারা চায় অর্থপূর্ণ জীবন। অর্থপূর্ণতাই উগ্রতার প্রতিষেধক।

অর্থহীন আচার কেবল পুনরাবৃত্তি। আত্মসমালোচনাহীন জাতি কেবল যন্ত্র। আমরা যখন প্রকৃতি– নদী, গাছ, প্রাণী, মানুষ; সবকিছুর মধ্যে ঐশ্বরিকতা দেখতে ভুলে যাই, তখনই বিশৃঙ্খলা জন্মায়। কিন্তু যখন আমরা বুঝি যে, সৃষ্টির প্রতিটি সত্তায় পবিত্রতা আছে, তখন নীতি ও অগ্রাধিকার বদলে যায়।
কল্পনা করুন এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে পরিবেশ শিক্ষা বাধ্যতামূলক; যেখানে বৃক্ষরোপণ নাগরিক দীক্ষা; যেখানে সাংস্কৃতিক উৎসব ভয়হীন বৈচিত্র্য উদযাপন; যেখানে গ্রাম নবায়নযোগ্য শক্তিতে স্বনির্ভর; যেখানে শিশুরা দেশীয় গাছ-গাছালি ও পাখ-পাখালির নাম জানে। এটি কল্পনা নয়; এটি কৌশল।

যে দেশ তার পরিবেশ রক্ষা করে, সে দুর্যোগের খরচ কমায়। যে দেশ সাংস্কৃতিক বহুত্ব লালন করে, সে সংঘাত কমায়। যে দেশ প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করে, সে আস্থা ফিরিয়ে আনে।
আমরা দুর্বল জাতি নই। আমরা জলোচ্ছ্বাসে গড়া এক বদ্বীপ সভ্যতা। আমাদের মধ্যে এক ‘জলালি’ আত্মা আছে– নীরব শক্তি, অদম্য মর্যাদা। গ্রামে গ্রামে তার প্রমাণ আছে, যেখানে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ একসঙ্গে উৎসব পালন করে। ঝড়ের পর ঘর-সংসার মেরামত করা; মায়েদের মধ্যে তা আছে। ভবিষ্যৎ রক্ষায় ভোট দিতে আসা তরুণদের মধ্যে তা আছে। পরবর্তী অধ্যায় সেই আত্মাকে সম্মান জানাক।
উন্নয়ন মানে কেবল জিডিপি বা সেতু নয়। উন্নয়ন মানে শ্বাসযোগ্য বাতাস, পানযোগ্য জল, সবুজ উন্মুক্ত স্থান, সাংস্কৃতিক সহাবস্থান, জবাবদিহিমূলক শাসন। উন্নয়ন মানে শিশুরা গাছের ছায়ায় খেলবে। শিল্পীরা নির্ভয়ে সৃষ্টি করবে। ধর্মীয় নেতারা নিয়ন্ত্রণ নয়; করুণা শেখাবেন।

বাংলাদেশ বিশ্বকে দেখাতে পারে– জনবহুল মুসলিম-অধ্যুষিত দেশ হয়েও পরিবেশে অগ্রণী; আধ্যাত্মিকতায় উদার; সংস্কৃতিতে প্রাণবন্ত; রাজনীতিতে জবাবদিহিমূলক হওয়া সম্ভব। স্বপ্ন অসম্ভব নয়। সে অপেক্ষায় আছে; এবং বিশ্ব তাকিয়ে।

আনুশেহ আনাদিল: সংগীতশিল্পী ও সমাজকর্মী

আরও পড়ুন

×