ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মানবাধিকার

ত্বকী হত্যার বিচারে বাধা কোথায়

ত্বকী হত্যার বিচারে বাধা কোথায়
×

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

প্রকাশ: ০৬ মার্চ ২০২৬ | ০৭:৪৭ | আপডেট: ০৬ মার্চ ২০২৬ | ০৭:৪৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

অত্যন্ত দুঃখজনক এবং মর্মান্তিক একটি ঘটনা আমরা দীর্ঘদিন ধরে স্মরণ করে আসছি। নারায়ণগঞ্জের মেধাবী কিশোর তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীকে হত্যা করা হয়েছে নিষ্ঠুরভাবে। ২০১৩ সালের ৬ মার্চ। দুঃখজনক হচ্ছে, ১৩ বছর অতিবাহিত হলেও এ হত্যার বিচার আজও হলো না। ত্বকী হত্যার বিচারের দাবিতে আমি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আয়োজনে উপস্থিত থেকেছি, বিচার চেয়েছি, কিন্তু বিচার হচ্ছে না। 
কিছুদিন আগে জাতীয় জাদুঘরে সারাদেশের শিশু-কিশোরদের নিয়ে জাতীয়ভাবে আয়োজিত রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার একটি অনুষ্ঠানে আমি ছিলাম। এই রচনা এবং চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর মধ্য দিয়ে দুটি কাজ হচ্ছে। প্রথমটি হচ্ছে কিশোরদের মধ্যে যে সৃষ্টিশীলতা আছে, সেই সৃষ্টিশীলতাকে তুলে ধরা। ত্বকী সে কিশোরদেরই একজন ছিল। সে সৃষ্টিশীলতাকে ধারণ করত। ত্বকীকে এই সৃষ্টিশীলতার প্রতীক বলা যায়। ত্বকী সাহিত্য চর্চা করত, পাঠাগারে যেত, ছবি আঁকত, কবিতা লিখত, গান করত। তার এই সৃষ্টিশীলতাকে ধারণ করছে প্রতিযোগিতা। দ্বিতীয় তাৎপর্য হচ্ছে, এর মধ্য দিয়ে প্রতিবাদটিও জারি রাখা হচ্ছে। ত্বকীদের বাঁচার যে অধিকার ছিল; তাদের যে সৃষ্টিশীলতা, সেটিকে বিকশিত করার অধিকার ছিল, তা সংরক্ষিত হয়নি। 

ত্বকীকে কেন হত্যা করা হয়েছে, সেটা আমরা জানি। ত্বকীর  কোনো অপরাধ ছিল না। অপরাধ ছিল তার পিতা রফিউর রাব্বির। তিনি দুটি অপরাধ করেছেন। একটা হচ্ছে, তিনি নারায়ণগঞ্জে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, অন্যটি হচ্ছে তিনি সংস্কৃতির চর্চা করতেন। এক সময় নারায়ণগঞ্জ বিখ্যাত ছিল সংস্কৃতিচর্চা ও খেলাধুলার জন্য। সেই নারায়ণগঞ্জকে যারা এই চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসের কেন্দ্রে পরিণত করেছিল, ত্বকীর পিতা তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। এ  দুই অপরাধের শাস্তি দেওয়ার জন্য তাঁর এই কিশোর সন্তানকে হত্যা করা হয়েছে এবং তার বিচার আজও হচ্ছে না।  

আমরা শুরু থেকেই বলে এসেছি, ত্বকী হত্যার বিচার একদিন না একদিন হবেই। আদালতে হবে। আদালতে যদি না হয়, অন্তত ইতিহাসে হবে। ইতিহাস স্মরণে রাখবে– এই রকম ঘটনা স্বাধীন বাংলাদেশে ঘটেছিল। এটি একটি ঘটনা মাত্র নয়। অসংখ্য ঘটনার একটি প্রতীক হিসেবে ভবিষ্যৎ একে বিবেচনা করবে। আমরা দেখলাম সেই প্রতিযোগিতায় যারা ছবি এঁকেছে তাদের বাছাই করা লেখা ও ছবি নিয়ে ‘ত্বকী’ নামে স্মরণিকা প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে ত্বকীকে নিয়ে আঁকা ছবি রয়েছে। সেই ছবিগুলোর মধ্যে তিনটি অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে। এক. সাহস। সে সাহসের সঙ্গে তাকিয়ে আছে। আরেকটা হচ্ছে চিন্তা। সে চিন্তা করছে এবং অন্যটি ভয়ের। এই যে তিনটি অভিব্যক্তি একদিকে– সে সাহসী, আরেকদিকে চিন্তাশীল, অন্যদিকে ভয়ার্ত। এই চিত্রটি বাংলাদেশের কিশোরদের সম্পর্কে আজকে খুবই প্রযোজ্য। আজকে কিশোররা যে দুর্দশার মধ্যে আছে সেটা তুলনাবিহীন। এই রকম দুর্দশা, দুর্গতি, বিপন্ন অবস্থা কিশোরদের আমরা আগে কখনও দেখিনি। এর মধ্য দিয়ে উন্মোচিত হচ্ছে এই সত্য– স্বাধীন বাংলাদেশে মানুষ কতটা মুক্ত, কতটা মুক্তি পেয়েছে। আমরা তো কেবল স্বাধীনতাই চাইনি। আমরা মুক্তি চেয়েছিলাম; মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছিলাম। কিন্তু সেই মুক্তি যে অর্জিত হয়নি, তারই ছবি এই শিশু-কিশোরদের আঁকা ছবিগুলোর মধ্যে প্রতিফলিত হচ্ছে। 

আমরা দেখলাম, একশবার ত্বকী হত্যা মামলার ধার্য তারিখ অতিবাহিত হলেও আদালতে এর অভিযোগপত্র দাখিল করা হলো না। একইভাবে সাগর-রুনি হত্যার ধার্য তারিখ ১২৩ বার পেছানো হলেও অভিযোগপত্র দেওয়া হলো না। অথচ এই পুলিশ যে তা পারে না, তা নয়। তারা পারে; কিন্তু তারা করছে না। কারণ তাদের করতে দেওয়া হচ্ছে না। এখানেই রাষ্ট্রের একটা চরিত্র উন্মোচিত হচ্ছে। ত্বকীকে হত্যা করা, বিচার বন্ধ করে রাখা– এ সবই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার একটি প্রতিচ্ছবি। 

রাষ্ট্রের উন্নতি হচ্ছে। কিন্তু যত উন্নতি হচ্ছে তত বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে, মানুষের অভাব বাড়ছে, বৈষম্য বাড়ছে, প্রকৃতি বিপন্ন হচ্ছে। এই উন্নয়নের ধারা আজ বিশ্বব্যাপী। সেই ধারার মধ্যেই আছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের আজকে যে দুর্গতি, তা বিশ্ব-দুর্গতিরই একটা অংশ। আমরা হিটলারের কথা, তাঁর নৃশংসতা জানি। কিন্তু আজকে আমরা দেখছি পৃথিবীজুড়ে অসংখ্য হিটলার বিরাজ করছে। আজকে হিটলারের যিনি শিরোমণি, যার নির্লজ্জতা অতুলনীয়, সেই রকম একজন ব্যক্তি ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি যে ধরনের কাজ করে যাচ্ছেন, যে ধরনের কথা অকপটে বলছেন– এটা আমি করব, আজকে এই দেশ দখল করব, ওটা করব, সেই সব কিছুই সহ্য করছে পৃথিবী। আমরা দেখছি, জাতিসংঘ ভেঙে যাচ্ছে, সংঘবদ্ধ উদ্যোগগুলো ভেঙে যাচ্ছে। 

আজকে ত্বকী হত্যায় যে সত্যটি উন্মোচিত, তা হচ্ছে আমাদের সমাজে বিচার নেই, নিরাপত্তা নেই এবং এখানে কিশোরদের তো বটেই, নারীদেরও নিরাপত্তা নেই। কোনো মানুষের জন্য কোনো রকম নিশ্চয়তা বা নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি নেই। তাহলে প্রতিকারটা কী? আমরা কেবল যে ত্বকী হত্যার বিচারের মধ্য দিয়েই এ ব্যবস্থার প্রতিকার করতে পারব, বিচার পেলেই যে প্রতিকার হয়ে যাবে, তা নয়। উন্নয়নের এ ধারাকে বদলাতে হবে; এই ব্যবস্থাকে বদলাতে হবে। বিশ্বজুড়ে আজ মনুষ্যত্ববিরোধী, মানবতাবিরোধী-ব্যবস্থার দাপট। যেসব গুণের জন্য মানুষ মানুষ হিসেবে পরিচিত, সেই গুণগুলো আজ নির্মূল হয়ে যাচ্ছে। এর প্রতিকারে আজকে আমাদের প্রচলিত উন্নয়নের ধারার বিপরীতে দাঁড়াতে হবে। দরকার হচ্ছে ব্যবস্থার বদল। ব্যক্তিমালিকানায় যে উন্নয়ন ঘটছে সে ব্যক্তিমালিকানার বদলে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা। বৈষম্যের বিপরীতে সাম্য প্রতিষ্ঠা করা, যাকে আমরা প্রকৃত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বলি, যার স্বপ্ন ধরে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি সেই রকম সমাজ এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। আমরা তো সে রাষ্ট্র চাই, যে রাষ্ট্র শুধু ত্বকী নয়; কোনো হত্যার বিচারেই বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।

আজকে আমরা দেখছি, এই ঢাকা শহরে ছায়ানটের প্রতি আক্রমণ হচ্ছে, ভাঙচুর হচ্ছে, লুটপাট হচ্ছে, আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে, উদীচীর কার্যালয়ে আক্রমণ হচ্ছে, বাউলদের আক্রমণ করা হচ্ছে, নির্যাতন করা হচ্ছে, কারাগারে পাঠানো হচ্ছে। এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো সংস্কৃতির ওপর আক্রমণ। এই আক্রমণ আজকে নতুন নয়। পাকিস্তান আমলে আমরা তা দেখেছি, মোনায়েম খানের আমলে দেখেছি। কিন্তু এই রকম নির্মমভাবে তাদের ওপর অত্যাচার আগে কখনও দেখিনি। 

আজকে কিশোররা বিভ্রান্ত হচ্ছে; সংস্কৃতিচর্চা করতে পারছে না। তাদের ঘরের মধ্যে আটকে ফেলা হয়েছে। তারা ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোনের মধ্যে আটকা পড়ে গেছে। সে জন্য এই সমাজকেই বদল করতে হবে এবং সাংস্কৃতিক একটা জাগরণ বাংলাদেশে প্রয়োজন। আর সেই জাগরণের প্রতীক হচ্ছে ত্বকী। আজকে সংস্কৃতিচর্চার ক্ষেত্রকে আরও বিকশিত করতে হবে; সুসংগঠিত, সুবিস্তৃত করতে হবে। আর সেই সংস্কৃতির চর্চা লক্ষ্যবিহীন হবে না, আদর্শবিহীন হবে না। আদর্শটা হবে সমাজকে বদল করা, যেই সমাজে ত্বকীরা নির্ভয়ে এবং নিশ্চিন্তে তাদের মেধাকে বিকশিত করতে পারে; তাদের সৃষ্টিশীলতাকে আরও উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে তার ব্যবস্থা করা। তাহলেই ভবিষ্যৎ ত্বকীরা নিরাপদ হবে।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়   

আরও পড়ুন

×