ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অর্থনীতি

এসএমই খাত কেন ব্যাংকের আনুকূল্য পাওয়া উচিত

এসএমই খাত কেন ব্যাংকের আনুকূল্য পাওয়া উচিত
×

সাইফুল হোসেন

সাইফুল হোসেন

প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২৬ | ০৬:৫৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত আজ এক অদ্ভুত বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা কেবল উদ্বেগজনকই নয়, বরং এটি একটি কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত বহন করে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক খাতে বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৪৫ শতাংশই ১০ কোটি টাকার নিচে ছোট ও মাঝারি গ্রাহকদের দেওয়া হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, তুলনামূলক উচ্চ সুদের হার থাকা সত্ত্বেও এই ঋণের খেলাপি হার প্রায় ২৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অথচ ৫০ কোটি টাকার বেশি বড় ঋণে খেলাপির হার ভয়াবহ–৫১ শতাংশ। যত বড় ঋণ, খেলাপির ঝুঁকিও তত বড়।

এই পরিসংখ্যান আমাদের সামনে একটি স্পষ্ট সত্য তুলে ধরে–বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রকৃত চালিকাশক্তি এখনও এসএমই বা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। কিন্তু ব্যাংকিং খাতের ঋণ বিতরণ নীতিতে এখনও বড় করপোরেট গ্রাহকদের প্রতি এক ধরনের অযৌক্তিক ঝোঁক বিদ্যমান। ফলে ঝুঁকির ঘনত্বও সেখানে বেশি। গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে মোট ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৭ লাখ ৪১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা, যার মধ্যে ৩৬.৩ শতাংশ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এর ভেতরে এক কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণে খেলাপির হার ছিল মাত্র ১৫.২ শতাংশ, যেখানে এক থেকে ১০ কোটি টাকার ঋণে গড় খেলাপি হার ছিল ২১.৫৫ শতাংশ। অন্যদিকে ১০ কোটি থেকে ২০ কোটি টাকার ঋণে খেলাপি হার ৪৮ শতাংশ এবং ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণে তা ৫১ শতাংশে পৌঁছেছে। এই বৈপরীত্য কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি ব্যাংকিং ব্যবস্থার নীতিগত দুর্বলতা এবং বাস্তব অর্থনৈতিক আচরণের প্রতিফলন।

ছোট উদ্যোক্তারা ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। তাদের কাছে ঋণ মানে শুধু টাকা নয়, এটি তাদের বেঁচে থাকার মাধ্যম। ফলে তারা ঋণ পরিশোধে তুলনামূলক বেশি আন্তরিক থাকে। বড় গ্রাহকদের ক্ষেত্রে চিত্রটি প্রায় উল্টো। তাদের রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ অনেক সময় ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতাকে দুর্বল করে দেয়। অনেক বড় ঋণগ্রহীতা ঋণ নেওয়ার পর সেটিকে ব্যবসার উন্নয়নের জন্য ব্যবহার না করে সম্পদ সঞ্চয়, বিদেশে অর্থ পাচার বা অন্য খাতে স্থানান্তর করেন। ফলে ব্যাংকগুলোর ব্যালান্স শিটে জমতে থাকে শ্রেণীকৃত ঋণের পাহাড়।
শ্রেণীকৃত ঋণের এই ভয়াবহ অবস্থার পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত কারণ রয়েছে। প্রথমত, অনেক বড় ব্যবসা এখনও সুশৃঙ্খল করপোরেট কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয় না। আর্থিক রিপোর্টিং, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, প্রযুক্তিনির্ভর হিসাব ব্যবস্থাপনা–এসব ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান এখনও ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়, যেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন। দ্বিতীয়ত, ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণের পর তার যথাযথ ব্যবহার পর্যবেক্ষণে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয় না। ঋণ অনুমোদনের সময় যে ব্যবসায়িক পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়, তা কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, সেই মনিটরিং ব্যবস্থা প্রায় অনুপস্থিত।

বাংলাদেশের ব্যবসা সংস্কৃতির আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার অভাব। অনেক উদ্যোক্তা ব্যবসা সম্প্রসারণের আগে মানবসম্পদ উন্নয়ন, প্রযুক্তি সংযোজন বা অটোমেশন নিয়ে ভাবেন না। ফলে ঋণের অর্থ উৎপাদনশীলতা বাড়নোর পরিবর্তে অপ্রয়োজনীয় স্থাবর সম্পদ বা অনুৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ হয়। কর্মীদের প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল সিস্টেম স্থাপন বা প্রক্রিয়া উন্নয়নের মতো দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়ার পরিবর্তে তাৎক্ষণিক লাভের দিকে ঝোঁক বেশি থাকে। এর ফলে ব্যবসার আর্থিক স্বাস্থ্য দুর্বল হয় এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমে যায়।
অন্যদিকে এসএমই উদ্যোক্তারা তুলনামূলক ছোট পরিসরে হলেও বাস্তব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তারা উৎপাদন, বিতরণ, সেবা প্রদান–এসবের মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল রাখে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, গ্রামীণ অর্থনীতির গতিশীলতা এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিস্তারে তাদের ভূমিকা অপরিসীম। অথচ ব্যাংকিং নীতিতে তাদের জন্য কাঠামোগত সহায়তা এখনও সীমিত। অনেক সময় উচ্চ সুদের হার এবং কঠোর জামানত শর্ত তাদের প্রবৃদ্ধির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

ব্যাংকগুলোর উচিত এখন ঋণ বিতরণের দর্শন পুনর্বিবেচনা করা। বড় ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকির ঘনত্ব বাড়ায়। এর পরিবর্তে এসএমইকেন্দ্রিক ঋণ বিতরণ কৌশল গ্রহণ করলে ঝুঁকি ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে। ছোট ঋণের সংখ্যা বেশি হলেও প্রতিটির ঝুঁকি কম হওয়ায় সামগ্রিক পোর্টফোলিও স্থিতিশীল থাকে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলো যদি এসএমই গ্রাহকদের জন্য আর্থিক পরামর্শ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং ব্যবসায়িক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করে, তবে ঋণের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

এখানে ব্যাংকের ভূমিকাও বদলাতে হবে। কেবল ঋণদাতা নয়, বরং ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে কাজ করতে হবে। ঋণ বিতরণের পর নিয়মিত মনিটরিং, আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সহায়তা এবং কর্মী প্রশিক্ষণে উৎসাহ দেওয়া–এসব উদ্যোগ এসএমই খাতকে শক্তিশালী করবে। একই সঙ্গে উদ্যোক্তাদেরও বুঝতে হবে যে আধুনিক ব্যবসা কেবল পুঁজি দিয়ে টিকে থাকে না, প্রয়োজন সুশাসন, প্রযুক্তি ও দক্ষ মানবসম্পদ।
বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ টেকসই করতে হলে ব্যাংকিং খাতকে বড় ঋণের মোহ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এসএমইকেন্দ্রিক ঋণ নীতি শুধু খেলাপি কমাবে না, বরং অর্থনীতির ভিত্তিকেও শক্তিশালী করবে। কারণ অর্থনীতির প্রকৃত শক্তি বড় করপোরেট ভবনে নয়, বরং হাজারো ছোট উদ্যোক্তার ঘামঝরা পরিশ্রমে লুকিয়ে আছে। ব্যাংকগুলো যদি এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে এসএমইকে অগ্রাধিকার দেয়, তবে আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তবেই বাংলাদেশ একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে এগোতে পারবে।

সাইফুল হোসেন: লেখক, ফাইন্যান্স অ্যান্ড বিজনেস মেন্টর

আরও পড়ুন

×